সিঙ্গাপুরভিত্তিক বীমা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘ইগলু’ (Igloo) ইন্দোনেশিয়ার বাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) চালিত একটি অভিনব ট্রাভেল ইন্স্যুরেন্স অ্যাসিস্ট্যান্ট বা বিক্রয় মাধ্যম চালু করেছে। এই আধুনিক প্রযুক্তির বিশেষত্ব হলো, এটি গ্রাহকের অনুসন্ধান থেকে শুরু করে পলিসি বা বীমাপত্র ইস্যু করা পর্যন্ত সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি একটিমাত্র কথোপকথন বা কনভার্সেশনাল ইন্টারফেসের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে সক্ষম। প্রচলিত জটিল ও দীর্ঘ প্রক্রিয়াকে সহজতর করে গ্রাহকসেবাকে স্বয়ংক্রিয় করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
একক প্ল্যাটফর্মে সম্পূর্ণ ক্রয় প্রক্রিয়া ও পরিচালনা
ইগলুর নিজস্ব কনজিউমার প্ল্যাটফর্ম ‘igloo.co.id’-এর সাথে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত নতুন ডিজিটাল সহকারীকে যুক্ত করা হয়েছে, যার প্রাতিষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইগি’ (Igi)। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, এই এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট বা সহকারীটি এমনভাবে ডিজাইন বা প্রস্তুত করা হয়েছে যা গ্রাহকের সাথে একটিমাত্র নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগের মাধ্যমে উপযুক্ত বীমা পণ্য খুঁজে বের করা, বিভিন্ন পলিসির মধ্যে তুলনামূলক মূল্যায়ন করা, সঠিক পরিকল্পনার সুপারিশ বা রিকমেন্ডেশন প্রদান, প্রিমিয়ামের অর্থ পরিশোধ এবং চূড়ান্তভাবে বীমাপত্র বা পলিসি ইস্যু করার মতো সমস্ত কাজ সম্পন্ন করতে পারে।
সাধারণ চ্যাটবটগুলোর তুলনায় ‘ইগি’র কার্যক্ষমতা অনেক উন্নত ও ভিন্নতর। সাধারণ চ্যাটবট যেখানে কেবল নির্দিষ্ট কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, সেখানে ইগি সরাসরি একজন দক্ষ বিক্রয় প্রতিনিধির মতো কাজ করে এবং পুরো ক্রয় প্রক্রিয়াটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিজে নিজেই পরিচালনা করতে পারে। এই সেবাটি গ্রাহকদের জন্য সপ্তাহে ৭ দিন এবং ২৪ ঘণ্টাই উন্মুক্ত থাকে। এর ফলে ট্রাভেল ইন্স্যুরেন্স বা ভ্রমণ বীমা বিক্রির ক্ষেত্রে যে সনাতন ও প্রচলিত ‘টেলিসেলস মডেল’ বা ফোনে যোগাযোগের মাধ্যম রয়েছে, তার প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে আসবে। তবে কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে যদি কোনো গ্রাহকের অতিরিক্ত বা জটিল সহায়তার প্রয়োজন হয়, তবে এই সিস্টেমের মাধ্যমে সরাসরি হোয়াটসঅ্যাপের (WhatsApp) সাহায্যে মানব এজেন্টের কাছে বিষয়টি স্থানান্তর বা এস্কেলেশন করার সুযোগও রাখা হয়েছে।
বাজার পরিস্থিতি, ব্যবসায়িক লক্ষ্য ও কার্যকারিতার পরিসংখ্যান
ইন্দোনেশিয়ার বর্তমান অর্থনৈতিক বাজারে বীমার অনুপ্রবেশ বা বিস্তৃতির হার মাত্র ২.৭ শতাংশ। এই তুলনামূলক কম বাজার চাহিদার মধ্যে ভ্রমণ বীমা ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নানা জটিলতা ও বাধা দূর করার লক্ষ্য নিয়েই ইগলু তাদের এই নতুন সেবাটি চালু করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, সাধারণ গ্রাহকরা সাধারণত ভ্রমণ বীমা কেনার সময় পণ্যের জটিলতা, বিভিন্ন বীমা প্রদানকারী সংস্থার মধ্যে তুলনা করার ঝামেলা এবং সাধারণ ব্যবসায়িক কর্মঘণ্টার বাইরে বীমা ক্রয়ের সীমিত সুযোগের মতো সমস্যার মুখোমুখি হন। ‘ইগি’ ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় থেকে এবং অত্যন্ত সহজ ভাষায় পরামর্শ দিয়ে এই সমস্ত প্রতিবন্ধকতা দূর করতে ভূমিকা রাখছে।
ইগলুর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রনক মেহতা এই প্রযুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, এই ব্যবস্থাটি মূলত এমন একটি আধুনিক অবকাঠামো যা সরাসরি গ্রাহকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এটি সার্বক্ষণিকভাবে গ্রাহকের পাশে থেকে তাদের ভ্রমণের ধরণ ও পরিকল্পনা বুঝতে চেষ্টা করে। সেই অনুযায়ী তাদের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ও সঠিক বীমা পরিকল্পনার সুপারিশ করে এবং মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে যেকোনো সময়ে বিক্রয় প্রক্রিয়াটি সফলভাবে সম্পন্ন করে।
প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ ডেটা বা পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই এআই প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যবসায়িক সাফল্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সাধারণ ওয়ান-স্টপ ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বীমা কেনার চেয়ে যারা ‘ইগি’র সাথে যুক্ত হয়ে তথ্য আদান-প্রদান করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে বীমা ক্রয়ের প্রক্রিয়াটি সফলভাবে সম্পন্ন করার হার বা সম্ভাবনা প্রায় ৪৪ শতাংশ বেশি দেখা গেছে। এর পাশাপাশি, যারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মানব এজেন্টের সমন্বয়ে তৈরি একটি মিশ্র বা হাইব্রিড процессов মধ্য দিয়ে গেছেন, তাদের ক্ষেত্রে ক্রয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে রূপান্তর বা কনভার্সন রেট সাধারণের চেয়ে ১.৭ গুণেরও বেশি প্রমাণিত হয়েছে।
ইগলুর ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির ব্যবহার
ইন্দোনেশিয়ায় এই প্রযুক্তির সফল যাত্রার পর ইগলু তাদের এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত সহকারী ‘ইগি’-কে জনপ্রিয় মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম হোয়াটসঅ্যাপে বিস্তৃত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর মাধ্যমে গ্রাহকরা আরও সহজে ও দৈনন্দিন যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহার করেই বীমা সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। শুধু ভ্রমণ বীমাতেই সীমাবদ্ধ না থেকে প্রতিষ্ঠানটি এই কনভার্সেশনাল এআই বা কথোপকথনযোগ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তিগত ক্ষমতাকে অন্যান্য বীমা পণ্যের ক্ষেত্রেও সম্প্রসারণ করতে চায়। এর মধ্যে মোটর যান বীমা (Motor Insurance) এবং ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা বীমা (Personal Accident Coverage) অন্যতম।
মূলত ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সামগ্রিক আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে ইগলু এই পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি তাদের ব্যবসায়িক কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে যেমন—আন্ডাররাইটিং বা ঝুঁকি মূল্যায়ন, জালিয়াতি বা প্রতারণা সনাক্তকরণ (Fraud Detection), বীমা দাবির নিষ্পত্তি বা ক্লেইম প্রসেসিং এবং সরাসরি বিক্রয় কার্যক্রমের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে আরও ব্যাপকভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মোতায়েন ও ব্যবহারের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
