বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রত্যাশা যতই বাড়ুক না কেন, বিমা খাত এখনো এ প্রযুক্তিকে পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করতে বেশ সতর্ক। বিশ্লেষণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইডিসির এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অধিকাংশ বিমা কোম্পানি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সম্ভাবনাময় মনে করলেও বাস্তব প্রয়োগে তারা এখনো রক্ষণশীল অবস্থানে রয়েছে। বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান এসএএসের কমিশনে প্রস্তুত করা এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠানই কেবল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে রূপান্তরমূলক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছে।
‘ডাটা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব: আস্থার অনিবার্যতা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মাত্র ৭ শতাংশ বিমা প্রতিষ্ঠান তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সক্ষমতাকে ‘রূপান্তরমূলক’ বলে বিবেচনা করে। অন্যদিকে, ১৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এখনো বিচ্ছিন্ন ও খণ্ডিত তথ্যভিত্তিক অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল, যা নতুন উদ্ভাবন ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যদিও খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ধীরে ধীরে বাড়ছে, তথাপি তথ্য ব্যবস্থাপনার পরিপক্বতা, সুশাসন কাঠামো এবং সাংগঠনিক আস্থার ঘাটতি ব্যবসায়িক উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আস্থা। জরিপে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, প্রচলিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার তুলনায় তারা উৎপাদনক্ষম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর তুলনামূলক বেশি আস্থা রাখে। তবে এই আস্থা অনেক ক্ষেত্রেই দৃঢ় শাসনব্যবস্থা, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ কিংবা মানসম্পন্ন তথ্য ব্যবস্থাপনার ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। ফলে বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো একদিকে কার্যকর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থাকে সন্দেহের কারণে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না, অন্যদিকে পর্যাপ্ত যাচাই ছাড়া নতুন প্রযুক্তির ওপর অতিনির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
বিনিয়োগ প্রবণতাও এই সতর্ক মানসিকতার প্রতিফলন। মাত্র ৮ শতাংশ বিমা প্রতিষ্ঠান আগামী এক বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে ব্যয় ২০ শতাংশ বা তার বেশি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। প্রায় ৬০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ব্যয় বৃদ্ধিকে ৪ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার কথা বলেছে। আবার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রতিষ্ঠান ব্যয় ৩ শতাংশ বা তার কম বাড়ানোর কিংবা ব্যয় কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। এর অর্থ, অধিকাংশ কোম্পানি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়েই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কার্যকারিতা যাচাই করছে।
আস্থা ও সক্ষমতার মধ্যকার ব্যবধানও স্পষ্ট। মাত্র ৯ শতাংশ বিমা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর উচ্চ আস্থা রয়েছে এবং একই সঙ্গে তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ সক্ষমতাও বিদ্যমান। বিপরীতে, ৪০ শতাংশের বেশি প্রতিষ্ঠান এমন অবস্থানে রয়েছে, যেখানে আস্থা ও সক্ষমতার মধ্যে অসামঞ্জস্য দেখা যায়। এটি শাসনব্যবস্থা, দক্ষ জনবল ও নজরদারির দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
তথ্যসংক্রান্ত সমস্যাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে। অর্ধেকের বেশি প্রতিষ্ঠান দুর্বল তথ্য শাসনব্যবস্থা ও খণ্ডিত তথ্যভিত্তিক কাঠামোকে প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পাশাপাশি ৪৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠান দক্ষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞের অভাবকে গুরুতর সমস্যা বলে উল্লেখ করেছে। আইডিসির গবেষণা পরিচালক ক্যাথি ল্যাং মন্তব্য করেছেন, অন্যান্য শিল্পখাতের তুলনায় বিমা খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাস্তব প্রয়োগে পরিপক্বতা সবচেয়ে কম, যা বড় পরিসরে প্রযুক্তি বিস্তারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
প্রতিবেদনটির নির্বাচিত তথ্যসূচক নিচের সারণিতে উপস্থাপন করা হলো—
| সূচক | বিমা প্রতিষ্ঠানের হার |
|---|---|
| কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে রূপান্তরমূলক মনে করে | ৭ শতাংশ |
| খণ্ডিত তথ্য অবকাঠামোতে পরিচালিত | ১৪ শতাংশ |
| কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যয় ২০ শতাংশ বা বেশি বাড়াবে | ৮ শতাংশ |
| উচ্চ আস্থা ও শক্তিশালী সক্ষমতা রয়েছে | ৯ শতাংশ |
| দুর্বল তথ্য শাসনকে বড় বাধা বলে মনে করে | ৫০ শতাংশের বেশি |
| দক্ষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জনবলের অভাব উল্লেখ করেছে | ৪৪ শতাংশ |
প্রতিবেদনটির উপসংহারে বলা হয়েছে, বিমা খাত এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়বদলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়লেও তথ্যের মান, সুশাসন ও দক্ষতা উন্নয়ন ছাড়া এই খাত প্রতিযোগী শিল্পগুলোর তুলনায় আরও পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
