আজকের আলোচনার বিষয় “নৌ-বীমাপত্রের বিশেষ শব্দাবলী ও ধারাসমূহ ” যা নৌ বা সামুদ্রিক বীমা অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।অন্যান্য বীমা এবং কারবারী জগতের সব কিছুরই কমবেশী পরিবর্তন সাধিত হয়েছে সময়ের বিবর্তনের সাথে সাথে। নৌ-বীমার ক্ষেত্রেও সে পরিবর্তন যে আসেনি তা নয়। তবে, নৌ-বীমা একটি প্রাচীন বিশেষত্বকে আজও ধরে রেখেছে তেমন বিশেষ কোন পরিবর্তন ছাড়াই। সেটি হলো তার বীমাপত্রের ছাঁচ বা নমুনা।
Table of Contents
নৌ-বীমাপত্রের বিশেষ শব্দাবলী ও ধারাসমূহ

যদিও, নৌ-বীমাকারী বা দায়গ্রাহকগণ প্রয়োজনীয় ও বিস্তারিত বিষয়াদি সন্নিবিষ্ট বা সমন্বিত যে কোন ধরন বা নমুনার বীমাপত্রই স্বাধীনভাবে ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু, প্রয়োগ ক্ষেত্রে দেখা যায় অধিকাংশ দায়গ্রাহক বা নৌ-বীমা প্রতিষ্ঠানই ঐ বিশেষ ধরনের বীমাপত্রের নমুনাই ব্যবহার করে থাকেন। কেননা, গত প্রায় তিন শতাব্দী ধরে। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন কোর্টের রায় সিদ্ধান্ত দ্বারা এই বীমাপত্রের নমুনা তথা তার শব্দমালা ও ধারাসমূহ প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছে।
তাই, এ বীমপত্রটি আদর্শ নমুনা। (Standard Form) নামে আখ্যায়িত। এ বীমাপত্রের একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত রয়েছে। এটি ইংরেজী ১৫২৩ সালে ইংল্যাণ্ডে প্রথম ব্যবহৃত হয়। তারপর, ১৭৭৬ সালে লণ্ডনের লয়েডস্ সমিতি এটিকে গ্রহণ ও ব্যবহার করে। ১৯০৬ সালের ইংরেজী নৌ-বীমা আইন (The English Marine Act of 1906 ) -এ উক্ত বীমাপত্রের ফরম বা নমুনাটি স্বীকৃতি পায়।
এ বীমাপত্রের সেকেলে বাক্যবিধি এবং বিষয়াবলীর অনেক সমালোচনা রয়েছে বটে; কিন্তু, আজ পর্যন্ত এর চেয়ে শ্রেয়তর কোন নমুনা দাঁড়াতে পারেনি বলে আজও তা সর্বাধিক জনপ্রিয়তায় পরিগৃহীত ও ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এ বীমাপত্রে মোট ১৫ ধরনের ঝুঁকির উল্লেখ রয়েছে যার মধ্যে এগারটিই হচ্ছে যুদ্ধ সংক্রান্ত এবং বাকী ৪টি সামুদ্রিক বিপদ ও অগ্নিকাণ্ড সংক্রান্ত।
যদিও এ বীমাপত্রের যথেষ্ট সমালোচনা রয়েছে। কেননা, এটি প্রাচীন একটি ছাঁচ— এতে এমন সব ঝুঁকি ও বিষয়াদি রয়েছে যার অস্তিত্ব এখন আর নেই, আবার, বর্তমান সময়ে যেসব ঝুঁকি বা বিষয়াদি সম্পর্কে ধারা উল্লেখিত থাকা উচিৎ ছিল তাও এতে নেই। একারণেই, আধুনিক, নৌ-বীমাকারীগণ উক্ত আদর্শ নমুনার বীমাপত্রটির সাথে সামঞ্জস্য রেখেই তাদের প্রত্যেকের ফরম বা বীমাপত্র প্রস্তুত করে নিয়েছেন। সব বীমাপত্রেই নৌ-বীমার যাবতীয় শর্তাবলী/শব্দাবলী ও ধারাসমূহ থাকতে হবে এবং নিম্নোক্ত বিষয়াবলী অবশ্যই থাকতে হবে—
(১) বীমাকৃত ব্যক্তি বা যিনি বীমা গ্রহণ করছেন তার নাম
(২) বীমাকৃত বিষয়বস্তু এবং বীমাকৃত ঝুঁকির উল্লেখ
(৩) সমুদ্র যাত্রা বা অভিযাত্রাকাল অথবা উভয়ের উল্লেখ—যার জন্যে বীমা গ্রহণ-করা হয়েছে;
(৪) বীমাকৃত অর্থের পরিমাণ এবং
(৫) বীমাকারী বা বীমাকারীগণের নাম।
যাই হোক, উক্ত আদর্শ মৌ-বীমাপত্রের আলোকে বিভিন্ন বীমাকারীগণ তাদের নিজস্ব নৌবীমাপত্রের প্রবর্তন করে নিয়েছেন। ঐসব বীমাপত্রের তথা আদর্শ নৌ- রীমাপত্রে যেসব বিশেষ শব্দ ও ধারা সন্নিবিষ্ট থাকে, সেগুলিকে নিয়ে লিপিবদ্ধ করা হলে-
১. বীমাপত্রের প্রারম্ভিক শব্দাবলী ( The Opening words of the Policy) :
বীমাপত্রের প্রারম্ভে ব্যবহৃত শব্দাবলী বানিজ্যিক বা অর্থনৈতিক কোন তাৎপর্য বহন করেনা বটে। তবে, একটি আনুষ্ঠানিক শুভারম্ভ ঘোষনার অভিলক্ষ্যে এবং শুভকামনায় প্রার্থনাসূচক কথা বামপত্রের শিরোভাগে সন্নিবেশিত হয়। যেমন:- “ইহা জ্ঞাত হোক যে …. ( Be it known that …)।
কোন কোন নৌ-বীমাপত্রে আবার লেখা হয় “সৃষ্টিকর্তার নামে শুরু করছি, আমিন [ In the Name of God, Amen) ।
২. বীমাকৃত ব্যক্তি বা বীমাগ্রহীতার নাম ( N e of the insured or Policy-holder):
প্রারম্ভিক শব্দাবলীর অব্যাবাহত, নীচেই একটি শূন্য স্থান থাকে যেখানে বীমাগ্রহীতার অথবা তার প্রতিনিধির নাম অবশ্যই লিখতে হয়। কেননা, ঐ শূন্য স্থানটি পূর্ণ করা না হলে তা কোন বীমাপত্র হিসেবেই গণ্য হবে না।
৩. স্বত্তার বা স্বত্ব নিয়োগ ধারা (Assignment Clause) :
এই ধারাটিতে বীমাপত্রের স্বত্ব হস্তান্তরের অধিকার প্রদান করা হয়েছে। এ ধারার তাৎপর্য হলো এই যে, নৌ-বীমাপত্রের স্বত্বার্পন বা স্বত্ব নিয়োগের ক্ষেত্রে কোন ধাধা বা জটিলতা নেই, সমুদ্রযাত্রা চলাকালীন বীমাপত্র যতবার ইচ্ছা হস্তান্তর করা যেতে পারে। শুধু বীমাপত্রের পৃষ্ঠদেশে স্বাক্ষর বা পৃষ্ঠাঙ্কন দ্বারাই অথবা পৃষ্ঠাঙ্কন ছাড়াই স্বত্বাপণ করা যায়। আর, এ ব্যাপারে দায়গ্রাহক বা বীমাকারীকে অবহিত করে তার সায় নিয়ে নিতে হয়। তবে, স্বত্বনিয়োগের সময় বীমার বিষয় বস্তুতে বীমাগ্রহীতা বা স্বত্বার্পণকারীর বীমাযোগ্য স্বার্থ বিদ্যমান থাকতে হয়। ক্ষতি সংঘটনকালীন বীমাযোগ্য স্বার্থ থাকার প্রয়োজন নেই। কেননা, বীমাপত্রের মেয়াদের মধ্যে বিষয়বস্তু বহু হাত বদল হতে পারে।
৪. হারানো বা না হারানো (Lost or Not Lost ) :
বীমাকারীগণ বীমাগ্রহীতাদের নানা সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে থাকেন। এই ধারাটিতে বীমাগ্রহীতাকে তেমন একটি সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। অনেক সময়, বীমাপত্র গ্রহণকালীন বীমাগ্রহীতা হয়ত জানেন না যে,বীমাগ্রহণের সময় তার প্রেরিত বা বীমার বিষয়বস্তুটি হারানো গিয়েছে বা যায়নি। প্রাচীনকালে দূর-দুরান্তে খবরাখবর পৌঁছানো প্রকৃতপক্ষেই খুব কষ্টসাধ্য ও সময় সাপেক্ষ ব্যাপার ছিল এবং বীমার বিষয়বস্তু একটু দূরবর্তী স্থানে থাকলেই এমন সমস্যার উদ্ভব হতো। বীমাগ্রহীতার এরশ অবস্থার কথা বিবেচনা করে বীমাকারীগণ ‘হারানো বা না হারানো বিষয়বস্তুতে বীমা করার সুযোগ প্রদান করেন। অর্থাৎ, বীমার বিষয়বস্তু হারানো গিয়েছে বা যায়নি এরূপ অনবগতিতেও বীমাগ্রহীতা বীমাগ্রহণ করতে পারেন। তবে, এ ধারার সুযোগ নিয়ে যদি, বিষয়বস্তু হারিয়ে দিয়েছে, নিশ্চিতভাবে জেনেও বীমাগ্রহীতা বীমাপত্র গ্রহণ করেন তা অবৈধ বলে গণ্য হবে। আবার, ‘বিপরীতভাবে, বীমাণ বীমার বিষয়বস্তুর বিদ্যমানতা বা অবস্থান সম্পর্কে কোন কারণে পূর্বাহেই বা চুক্তি গঠন কালীন নিশ্চিতভাবে অবহিত থাকেন তাহলেও এ ধারার বরখেলাপ হয়। অর্থাৎ, ধারার অধীন চুক্তিকালীন সংশ্লিষ্ট কোন পক্ষই বিষয় বস্তুর হারানোর বা না হারানোর ব্যাপারে নিশ্চিত অবগত থাকলে এরূপ বীমাপত্র বা চুক্তি অবৈধ বলে গণ্য হবে।
৫. নৌ-অভিযাত্রা বা সমুদ্রযাত্রার বিবরণ (Description of the Voyage) :
এই ধারাটি প্রসঙ্গে দু’টি বিষয় উল্লেখ্য। যথা : At and From the Port এবং শুধু From the Port-এর কোন্ কথাটি বীমাপত্রে সন্নিবেশিত রয়েছে। যদি দেখা যায় যে, At and from the Port উল্লেখিত রয়েছে— তাহলে সমুদ্রযাত্রা শুরুর বন্দরে অবস্থানকালীন এবং যাত্রা শুরু থেকে বীমাকৃত বিষয়বস্তুর দায়গ্রহণ করা হলো। পক্ষান্তরে, যদি শুধু From the Port উল্লেখ থাকে, তাহলে বোঝা যায়, বন্দরে অবস্থান কালীন কোন দায় বা ঝুঁকি গ্রহণ করা হয় না, বরং যাত্রা শুরু থেকে দায় গ্রহণ করা হলো বলে বোঝা যায়। উদাহরণ স্বরূপ ধরা যাক, একটি জাহাজ চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে অবস্থান করছিল। যাত্রা শুরুর আগেই অর্থাৎ, বন্দরে অবস্থানকালীন কোন দুর্ঘটনায় জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্থ হলো। এখন, এ জাহাজটির জন্যে যদি At & From the Port” ধারা সম্বলিত বীমাপত্র গ্রহণ করা থাকে, তাহলে ক্ষতিপুরণ প্রাপ্য হবে, আর যদি শুধু From the Port ধারা সম্বলিত বীমাপত্র গ্রহণ করা থাকে, তাহলে ক্ষতিপূরণ পাওয়া যাবে না কারণ, অবস্থানকালীন ঝুঁকিতো গ্রহণ করা হয়নি।
৬. জাহাজ বা বাণিজ্যতরীর নাম ( Name of the Ship or Vessel):
বীমাপত্রে জাহাজ বা বাণিজ্যপোত্তের নাম উল্লেখ করার জন্যে আইনগত কোন বাধ্যবাধকতা নেই। তবে, সাধারণতঃ নিদ্দিষ্ট শূন্য স্থানে নাম উল্লেখিত হয়ে থাকে। [ জাহাজ বা বাণিজ্যপোতের নাম উল্লেখের জন্যে আদর্শ বীমাপত্রে নিম্নরূপ পুরনীয় স্থান থাকে—
Upon any kind of goods and merchandises in the good ship or vessel called the
যাই হোক, যদি জাহাজ বা বানিজ্যপোতের নাম বীমাপত্রে উল্লেখ করা হয় তাহলে আর, পণ্যবহনের জন্যে ইচ্ছামত অপেক্ষাকৃত ভাল জাহাজ বেছে নেয়া যায় না। আর, যার উল্লেখ না থাকে, তা হলে পূর্বানুমতি ছাড়া সুবিধামত জাহাজ বেছে নেয়ার সুযোগ থাকে। তবে, নাম উল্লেখ থাকলেও বিশেষ বা জরুরী পরিস্থিতিতে জাহাজ পরিবর্তন করা যায়।
৭. কাপ্তান বা জাহাজ অধ্যক্ষের নাম ( Name of the Master) :
এই ধারায় জাহাজের কাপ্তানের নাম উল্লেখ করতে হয়। পূর্বে এ ধারাটি বেশ গুরুত্বপূর্ন ধারা হিসেবে গণ্য হতো। কেননা, তখন এত উন্নত কলা-কৌশল ও যানবাহন ছিলনা। তখন, জাহাজের নিরাপত্তা অনেকাংশে নির্ভর করত জাহাজের যোগ্য কাপ্তানের উপর।
তাইতো, বীমাপত্রে এ ধারার সন্নিবেশন ছিল নিম্নরূপ-
whereof is Master, under God, for .or whosever else shall go the present Voyage for Master the said ship.or the Master whereof, is or shall be named or called
তাই, অভিজ্ঞ ও যোগ্য কাপ্তানের নাম উল্লেখ করতে হতো। কিন্তু, আধুনিক উন্নত যানবাহন ও পরিবহণ ব্যবস্থার যুগে একমাত্র বিপদজনক কোন সমুদ্রযাত্রা ছাড়া জাহাজের কাপ্তানের নাম উল্লেখের তেমন কোন প্রয়োজন হয় না।
৮. ঝুঁকির আরম্ভ ও পরিসমাপ্তি । Commencement and termination of the Risk) :
এই ধারায় যাত্রা শুরু এবং শেষ তথা ঝুঁকি গ্রহণের শুরু ও সমাপ্তি সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়। সাধারণতঃ যাত্রা শুরুর বন্দর থেকে ঝুঁকি গ্রহণ শুরু এবং গন্তব্য বন্দরে পৌঁছার পর ঝুঁকি বহনের পরিসমাপ্তি ঘটে তবে, যদি At and From the Port ধারা উল্লেখে চুক্তি হয়, তাহলে যাত্রা শুরুর বন্দরে অবস্থানকালীনই ঝুঁকি গ্রহণ শুরু হয়। আর শেষ হয় সাধারণতঃ গন্তব্য বন্দরে পৌছার ২৪ ঘন্টা অবস্থানকাল নাগাদ। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে পণ্য খালাস-এর জন্যে গন্তব্য বন্দরে পৌছার পর থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত সময়ের ঝুঁকি গ্রহণ করা হয়।
৯. ভেড়ানো ও অবস্থান ( Touch and stay) :
এ ধারাটিতে জাহাজের অনুমোদিত গতিপথের কোন স্থানে ভেড়ানো বা অবস্থান সম্পর্কিত বিবরণ সন্নিবেশিত করতে হয়। এ ধারায় বলা রয়েছে জাহাজ তার অনুমোদিত যাত্রাপথের বন্দরসমূহে ভেড়াতে ও সঙ্গত সময় অবস্থান করতে পারবে। ভেড়ানোর বন্দরসমূহের উল্লেখ না থাকলেও যাত্রাপথের যে কোন বন্দরে জাহাজ রীতিগতভাবে ভীড়তে পারে। আদর্শ বীমাপত্রে এ ধারাটি যেমন করে সন্নিবিষ্ট রয়েছে – * and it shall be lawful for said ship, etc., in this voyage to proceed and said to and touch and stay at any port and places whatsoever without prejudice to this insurance.”
শুধু গতিপথের বন্দরগুলিতেই নয়, জরুরী অবস্থায় বা প্রয়োজনে জাহাজ পথে স্বাভাবিক কারণেই জরুরী পরিস্থিতি ছাড়া কোন অননুমোদিত বন্দর বা স্থানে ভিড়তে বা অযৌক্তিকভাবে দীর্ঘসময়ের জন্যে অবস্থান করতে পারেনা। এজন্যে এ ধারায় ৩টি সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। যথা :-
(ক) জাহাজ যেসব বন্দরে ভেড়ানো হবে, সেসব বন্দর অবশ্যই সমুদ্র যাত্রার জন্যে নির্ধারিত স্বাভাবিক গতিপথের মধ্যেই থাকতে হবে এবং অননুমোদিত পথ দিয়ে জাহাজ গন্তব্যে পৌঁছুতে পারবেনা।
(খ) বীমাপত্রে উল্লেখিত যাত্রাপথের ভৌগলিক ক্রমানুযায়ী যে সব বন্দরে জাহাজ স্পর্শ করার কথা সেসব বন্দর স্পর্শ করেই জাহাজ অগ্রগামী হতে থাকবে। এবং গন্তব্যে পৌঁছুবে।
(গ) বীমাকৃত যাত্রার সাথে সম্পর্কযুক্ত কোন উদ্দেশ্যেই কেবল জাহাজ থামবে। উদ্দেশ্যহীনভাবে কোন বন্দরে জাহাজ থামতে ও অবস্থান করতে পারবে না।
১০. গতিচ্যুতি (Deviation):
উপরোক্ত ধারার সম্পৃক্ততায় গতিচ্যুতি বিষয়টি উল্লেখ্য। বীমাপত্রে নির্ধারিত যাত্রাপথ থেকে ভিন্ন পথে চললেই তাকে গতিচ্যুতি বলা হয়। যুক্তিসঙ্গত কোন কারণ ছাড়া কোন গতিচ্যুতি করলে বীমাকারী বা দায়গ্রাহক তার দায় থেকে অব্যাহতি পেয়ে যান। তবে, কোন কোন ক্ষেত্রে গতিচ্যুতি অনুমতি সাপেক্ষ এবং এরূপ গতিচ্যুতির জন্যে বীমাচুক্তি বাতিল হয় না। যথা :-
(ক) বীমাপত্রে বিশেষ কোন শর্তের দ্বারা শিথিলতা অনুমোদিত হয়ে থাকলে গতিচ্যুতির জন্যে বীমাচুক্তি বাতিল হয়না। যেমন : যদি কোন জাহাজ ভাড়াকারী মাসুল বীমাপত্র ক্রয় করে থাকেন, তাহলে তার প্রকৃতপক্ষে গতিচ্যুতির ও ধারা পরিবর্তনের ব্যাপারে জাহাজ মালিকের সাথে একমত হওয়া ছাড়া কোন উপায় থাকেনা। এরূপ ক্ষেত্রে গতিচ্যুতি ইচ্ছাকৃত নয় এবং তার জন্যে বীমাঢুকি বাতিল হয়না।
(খ) জাহাজ মালিক বা ফাখানের ক্ষমতার বাইরে, কোন পরিস্থিতিতে গতিচ্যুতি। চুক্তি বাতিল করে না। যেমনঃ ঝড়-ঝঞ্চা, শত্রুতা, দস্যুতা, নাবিকদের অসহযোগিতা ইত্যাদি কারণে গতিচ্যুতি।
(গ) উক্ত বা অনুক্ত কোন যুক্তিসঙ্গত শর্ত পালনের জন্যে গতিচ্যুতি দোষণীয় নয়। যেমন : জাহাজটিকে চলাচলযোগ্য করার জন্যে গতিচ্যুতি।
(ঘ) জাহাজ বা জাহাজন্বিত পণ্যসামগ্রী রক্ষা করার জন্যে গতিচ্যূতি অন্যায় নয়। যেমন:— জাহাজ মেরামতের জন্যে গতিচ্যুতি।
(ঙ) দুর্ঘটনা কবলিত কোন জাহজের বিপদাপন্ন মানুষ এবং অনবিধ কারণে বিপদগ্রস্ত মানুষের জীবন রক্ষার জন্যে গতিচ্যূতি অবশ্যই অন্যায় নয়।
(চ) জাহাজস্থিত কোন মানুষের জন্যে ওষুধ বা জরুরী চিকিৎসার জন্যে গতিচ্যুতি চুক্তি বাতিল করেনা।
(ছ) জাহাজের কাপ্তান ও নাবিকগণ প্রতারণার মাধ্যমে জাহাজস্থিত পণ্য সামগ্রী চুরি বা নষ্ট করলে এবং তজ্জনিত কারণে কোন গতিচ্যুতি ঘটলে, পণ্যের বীমাগ্রহীতা তার জন্যে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন না; বরং এরূপ কোন প্রতারণার বিরুদ্ধে বীমাকৃত থাকলে বীমাগ্রহীতা অবশ্যই ক্ষতিপুরণ পাবেন।
১১। যাত্রার পরিবর্তন (Change of Voyage) :
নৌ-বীমাপত্রে বীমাকৃত জাহাজের গন্তব্যবন্দর এবং উদ্দিষ্ট বন্দরে পৌঁছার পথ সংক্রান্ত বর্ণনা থাকে থাকে চুক্তি নির্ধারিত যাত্রা —– সংশ্লিষ্ট ঝুঁকির বর্ণনা। কিন্তু, জাহাজটি যদি বীমাপত্রে উল্লেখিত গন্তব্য পরিবর্তন করে ভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে, তাহলেই তাকে যাত্রার পরিবর্তন বলা হয়। স্বেচ্ছামূলকভাবে এরূপ যাত্রা পরিবর্তন করা হলে, দায়গ্রাহক বা বীমাকারী দায় থেকে অব্যাহতি পেয়ে যান।
আবার সমুদ্রযাত্রা পরিত্যাগ করলে অর্থাৎ, গন্তব্য বন্দরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে কোন কারণ ছাড়াই যদি জাহাজ পুনরায় যাত্রাবন্দরে ফিরে আসে, তাহলেও বীমাকারী দায় থেকে অব্যাহতি পেয়ে যান। উভয় ক্ষেত্রেই ঝুঁকির হ্রাস-বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয় বা বীমাকারীর জন্যে বিবেচ্য বিষয় নয়। 4
১২. বিলম্ব (Delay) :
নৌ-বীমাপত্র গ্রহণের পর যথাসময়ে সমুদ্রযাত্রা শুরু করা বিধেয়। অর্থাৎ, যাত্রারন্তে অহেতুক অযৌক্তিক বিলম্ব করা সঙ্গত নয়। কেননা, বিলম্ব বেশী হয়ে গেলে বীমাকারী বা দায়গ্রাহক কোন পরিণতির জন্যে দায়ী থাকেন না এবং তদ্জনিত কারণে ক্ষতি সংঘটিত হলে বীমাকারী দাবীপুরণে বাধ্য থাকেন না। তাই,সমুদ্র যাত্রা অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে আরম্ভ করা দরকার। কেননা, অতিরিক্ত বিলম্বের জন্যেই হয়ত জাহাজ ঝড়, তুষারপাত, হারিকেন ইত্যাদি কবলিত হয়ে পড়তে পারে। এমনকি, বিলম্বের কারণে ঝুঁকি হ্রাস পেলেও অতিরিক্ত বিলম্ব ন্যায়সঙ্গত নয়। একইভাবে, আবার সমুদ্রযাত্রা শুরু করে তা যথাসময়ে শেষ করতে হয়। শুধু, গন্তব্য বন্দরের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হওয়া ও পৌছা নয়, জাহাজের পণ্য-সামগ্রী খালাস করে যথাসময়ে যাত্রার সমাপ্তি করাই প্রয়োজন। কেননা, যাত্রা শুরু ও যাত্রা শেষ তথা পণ্যাদি খালাসে কোন অযৌক্তিক বিলম্বের জন্যেই বীমাকারী দাবীপুরণে অস্বীকার করতে পারেন।
১৩. ব্যয়-দাবী ও শ্রম ধারা (Sue and Labour Clause) :
বীমাকৃত সম্পদ-সম্পত্তি বীমাকৃত হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ জ্ঞানবুদ্ধি প্রয়োগে আপন সম্পদ- সম্পত্তি হিসেবে দেখাশুনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা স্বাভাবিক নিয়ম। তা সত্ত্বেও ধারাটির প্রয়োগে বীমাকারী কর্তৃক বীমাগ্রহীতাকে বিশেষভাবে অনুমতি প্রদান করা হয় সম্ভাব্য ক্ষতি এড়ানো বা কমানোর জন্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্যে। তাই, বীমাগ্রহীতা বা তার প্রতিনিধি কর্তৃক এরূপ ব্যবস্থা বা প্রচেষ্টা গ্রহণের জন্যে ব্যয়িত প্রকৃত অর্থ দাবীর প্রেক্ষিতে বীমাকারী তা পরিশোধ করতে বাধ্য থাকেন। পরিস্থিতি ও অবস্থাভেদে এসব ব্যয় বিভিন্ন রকম হতে পারে। যথা : বিশেষ পরিস্থিতিতে পণ্যসামগ্রী নামানো, জাহাজ মেরামত, গুদামজাতকরণ ইত্যাদির ব্যয়। তবে, সেই সাথে এধারায় নিম্নে বর্ণিত শর্তসমূহও প্রযুক্ত থাকে –
(ক) বীমাকৃত ব্যক্তির পক্ষে ক্ষতি এড়ানো বা কমানোর লক্ষ্যে যাবতীয় প্রচেষ্টা গ্রহণ,
(খ) বীমাকৃত বিপদ সংঘটনে ক্ষতি হতে থাকলে তা এড়ানো বা কমানোর তাৎক্ষনিক প্রচেষ্টা গ্রহণ এবং
(গ) বীমাগ্রহীতা বা তার প্রতিনিধি কর্তৃক গৃহীত ব্যবস্থা যেন সাধারণ জ্ঞান-বুদ্ধি প্রসূত ও যুক্তিসঙ্গত হয়।
সামগ্রিক ক্ষতি হলে দায়গ্রাহক বা বীমাকারী বীমাগ্রহীতাকে ক্ষতি এড়ানো বা কমানোর প্রচেষ্টায় ব্যয়িত যাবতীয় অর্থ (দাবী ও শ্রম ব্যয়) সহ সামগ্রিক ক্ষতিপূরণ প্রদান করবেন। আর, আংশিক ক্ষতি সঙ্ঘটিত হলে দাবী ও শ্রম ব্যয়সহ আনুপাতিক হারে ক্ষতিপূরণ প্রদান তথা ব্যয় বহন করবেন।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে পরিদৃষ্ট যে, বীমাগ্রহীতা ক্ষতি কমানো বা এড়ানোর জন্যে এমন ভাবে ব্যবস্থা ও প্রচেষ্টা গ্রহণ করবেন যেন মনে হয় এর জন্যে কোন বীমা গ্রহণ করা হয়নি (as if uninsured)। সেই সাথে এও স্বাভাবিকভাবে লক্ষ্যযোগ্য যে, বীমাকৃত বিষয়বস্তুর নিরাপত্তা, উদ্ধার ও রক্ষার জন্যে বীমাগ্রহীতা কোন মামলা-মোকদ্দমা করতে গিয়ে খরচ করলেও তা বীমাকারীর কাছ থেকে আদায় করে নিতে পারবেন।
১৪. বীমাকৃত বিষয়বস্তু ও তার মূল্যায়ন ( The Subject matter insured and the Valuation) :
এ ধারায় বীমাকৃত বিষয়বস্তুর মূল্য সন্নিবেশিত হয়। আদর্শ বীমাপত্রে এ ধারাটির সন্নিবেশন নিম্নরূপ —
“ The said ship. etc.. good and merchandises, etc. for so much as concerns the assurer by agreement between the assured and assurer in this policy, are and shall be valued ……………”
মূল্যায়িত বীমাপত্রে বীমাকৃত বিষয়বস্তুর মূল্য উল্লেখিত থাকে বিধায় তাকে বীমাকৃত মূল্য বলা হয়। আর, এই বীমাকৃত মূল্যই হলো ক্ষতিপূরণের ভিত্তি। পক্ষান্তরে, অমূল্যয়িত বীমাপত্রে বীমাকৃত বিষয়বস্তুর মূল্য উল্লেখিত থাকে না বলে ক্ষতি সংঘটনের সময় বীমাকৃত বিষয়-বস্তুর নির্ণেয় মূল্যই হয় ক্ষতিপূরণের ভিত্তি।
বলা বাহুল্য বীমাকারী ও বীমাগ্রহীতার পারস্পরিক সায় তথা সম্মতির প্রেক্ষিতেই বিষয়-বস্তুর বীমাকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় এবং যুক্তিসঙ্গত অংশ সংযোগ করেই উক্ত বীমাকৃত মূল্য নির্ধারণ করা হয়। বিষয় বস্তুর বীমাযোগ্য মূল্য নিম্নে বর্ণিত পন্থায় নির্ণয় করা হয়—
(ক) জাহাজী বীমার ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরম্ভকালীন জাহাজের মূল্যের সাথে জাহাজের সাজ সরঞ্জাম কর্মচারীদের মজুদ খাবার, কর্মচারীদের প্রদত্ত অগ্রিম বেতন ইত্যাদির মূল্য এবং বীমাখরচ যুক্ত করে বীমাকৃত মূল্য নির্ণিত হয়।
(খ) পণ্যবীমার ক্ষেত্রে পণ্য-সামগ্রীর মূল্যের সাথে জাহাজ ও বীমা সংক্রান্ত ব্যয় যোগ করে বীমাকৃত মূল্য নির্ধারিত হয়।
(গ) মাসুল বীমায় জাহাজ ভাড়ার সাথে বীমা-খরচ যুক্ত করে বীমাকৃত মূল্য নির্ণিত হয় এবং
(ঘ) অন্য কোন বিষয়-বস্তুর বেলায় বিষয়বস্তুর মূল্যের সাথে বীমাখরচ যুক্ত হয়ে বীমাকৃত বা বীমাযোগ্য মূল্য অভিনির্ণিত হয়।
১৫. ব্যতিহার বা পরিহরণ ধারা ( Waiver Clause) :
এই ধারাটি পূর্ববর্তী ‘দাবী ও শ্রম ধারা । Sue and labour clause)” র সম্পূরক (Supplemental) ধারা হিসেবে বিবেচিত। কেননা, পূর্ববর্তী ধারায় বীমাগ্রহীতাকেই অনুমতি দেয়া থাকে বীমাকৃত বিষয়বস্তুর ক্ষতি এড়ানো বা কমানোর উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় সব কিছু করার জন্যে; আর, এ ধারা মোতাবেক বীমাকৃত বিষয় বস্তু তথা পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা অথবা ক্ষতি এড়ানো বা কমানোর জন্যে পারস্পরিকভাবে প্রচেষ্টা নিয়োজিত করার সুযোগ রাখা হয় যা দ্বারা তাদের কোন প্রকার অধিকার ক্ষুণ্ন হয় না। এ ধারাটি আদর্শ নৌ-বীমাপত্রে। in Standard Marine Policy)-র ছকে যেমন করে সন্নিবেশিত রয়েছে তার আংশিক নিম্নরূপ
“and it is especially declared and agreed that no acts of the insurer or the insured in recovering, saving or preserving the property of the insured shall be considered as a waiver or acceptance of abondonement”
১৬. বীমাকৃত সামুদ্রিক বিপদসমূহ ( The Marine Perils insured against) :
এ ধারাটিতে সামুদ্রিক বিপদ-বিপত্তি তথা ঝুঁকিসমূহের মধ্যে কোন্ কোন্টি বীমাকৃত হলো সে বিষয়ে উল্লেখ করা হয়। তবে, যে যে বিপদ- বিপর্যয় বীমাযোগ্য তারও সন্নিবেশন থাকে এ ধারায়। আদর্শ বীমাপত্রে এ ধারার উল্লেখ যেমন ছিল, নিম্নে তার আংশিক সন্নিবেশিত হলো—
“Touching the adventures and perils which we, the assurers, are contended to bear and do take upon as in this voyage. they are. of the seas, man of war, fire, enemies, Pirates.rovers, thieves, jettisons, letters of mart and countermart, surprisals, takings at sea. arrests, restraints and detainments of all kinds, Princes and people, of what nation, condition and quality soever. barratry of the master and mariners and of all other perils. losses and misfortunes that have or shall come to the hurt, detriment or damage of the said goods and merchandises and ship. etc.. or in part therof”
এ ধারাটির নিরিখে পরিদৃষ্ট যে রণতরী ( Man of War) অগ্নি, শত্রু, জলদস্যু (Pirates), ডাকাত, চোর, পণ্য নিক্ষেপ ( Jettison), অতর্কিতে অবরোধ [ Surprisals), সমুদ্র মৃত্যু-পাক, গ্রেপ্তার, আটক ( Restraints). সংঘর্ষ, সকল ধরনের বিলম্ব, বিভিন্ন দেশীয় যুবরাজ ও জনসাধারণ, পোতাধ্যক্ষ বা নাবিকগণ কর্তৃক জাহাজ মালিককে প্রতারণার | Barratry of the master and mariners) এবং অন্যান্য যাবতীয় সামুদ্রিক বিপদ-আপদ, ও দুর্দৈবের বিরুদ্ধে বীমা গ্রহণ-প্রদানের যে কোন চুক্তি বীমাকারী বা দায়গ্রাহক ও বীমাগ্রহীতা করতে পারেন।
১৭. প্রতিদান বা সেলামী ধারা (Consideration or Premium Clause):
প্রতিটি চুক্তি গঠনের জন্যে প্রতিদান হলো অন্যতম অপরিহার্য উপাদান। বীমাচুক্তির বেলায়ও তার কোন ব্যত্যয় নেই। বীমা চুক্তিতে পারস্পরিক প্রতিশ্রুতি তথা চুক্তি মোতাবেক বীমাকারী কর্তৃক ক্ষতিপুরণ বা বীমাদাবী প্রদানের প্রতিদান হিসেবে বীমাগ্রহীতা বীমাকিত্তি প্রদান করে থাকেন এবং বীমাপত্রে এই বীমাসেলামী বা কিস্তির হার এবং তার প্রাপ্তি স্বীকার উল্লেখিত থাকে [ প্রামান্য বা আদর্শ বীমাপত্রের ছকে এ ধারাটি যেমন সন্নিবেশিত থাকে তা নিম্নরূপ—
“And so we, the assurers are contended. and do hereby promise and find ourselves, each one for his own part, our heirs, executors, and goods to the asured, their executors, administrators and assigns. for the true performance of the promises, confessing ourselves paid the consideration due unto us for this assurance, at and after the rate of ……………”
১৮। স্মারকলিপি ধারা (Memorandum Clause) :
এই ধারাটি বীমাপত্রের পাদদেশে বিশেষ দ্রষ্টব্য হিসেবে সন্নিবেশিত থাকে। এই ধারার মাধ্যমে- বীমাগ্রহীতার অনেক ছোট ছোট দাবী থেকে বীমাকারীকে রেহাই দেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এই ধারাটি ১৭৪৯ সাল থেকে প্রবর্তিত হয়েছে। বীমাকৃত বিষয়-বস্তুর স্বাভাবিক নশ্বরতা অনুযায়ী বীমাকৃত বিষয় বস্তুগুলিকে নিম্নে বর্ণিত তিন প্রকরণে চিহ্নিত করা হয়েছে
(ক) শস্য, মাছ, লবন, ফল, ময়দা এবং বীজের আংশিক ক্ষতির জন্যে দাগ্রাহক বা বীমাকারী দায়বদ্ধ হবেন না।
(খ) চিনি, তামাক, শণ, তত্ত্ব, চামড়া, ইত্যাদির ৫ ভাগের কম আংশিক ক্ষতির জন্যে বীমাকারী দায়বদ্ধ থাকবেন না।
(গ) জাহাজ ও ভাড়াসহ অন্যান্য সব পণ্যের ৩২ ভাগের কম আংশিক ক্ষতির জন্যে ক্ষতিপূরণ দানে দায়বদ্ধ হবেন না।
তবে, বীমাকারী উল্লিখিত দায় থেকে অব্যাহতি পেলেও নিম্নোক্ত দু’টি ক্ষেত্রে অব্যাহতি পাবেন না—
(ক) আংশিক ক্ষতি যদি সাধারণ আংশিক ক্ষতি হয়ে থাকে এবং
(খ) জাহাজ যদি কোন চড়ায় বেঁধে অথবা অন্য কোনভাবে আটকা পড়ে যায় এবং সে অবস্থায় পরিত্যক্ত হয়।
১৯. পণ্যগার থেকে পণ্যাগার ধারা ( Warehouse to Warehouse Clause) :
এ ধারাটি সমুদ্রযাত্রার সাথে সম্পৃক্ত স্থলভাগে বিদ্যমান ঝুঁকির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ধীমাপত্রে উল্লেখিত স্বপ্নভূমি থেকে প্রেরিত পণ্য প্রাপকের কাছে বা গন্তব্য বন্দরের পণ্যাগারে পৌঁছা পর্যন্ত যে স্কুলঝুঁকি বিদ্যমান থাকে তা বীমাপত্রের এই ধারার আওতায় পড়ে। গন্তব্য বন্দরের পণ্যাগারে বীমাকৃত পণ্যসামগ্রী পৌঁছে গেলে অথবা জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের ১৫ দিন বন্দর থেকে অনেক দূরবর্তী স্থানে পণ্য পৌঁছার প্রশ্ন হলে বন্দরে পৌছার ৩০ দিন) অতিবাহিত হয়ে গেলে এই ধারার কার্যকারিতা শেষ হয়ে যায়।
২০. যুদ্ধ-বিগ্রহের ধারা (War-Clause) :
বহির্বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট দেশসমূহের মধ্যে অথবা সমুদ্রযাত্রার পথিমধ্যের দেশসমূহ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল বা যাতায়াত পথ বিপদাপন্ন ও অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। এরূপ পরিস্থিতিতে সমুদ্রযাত্রা হয় বিপদ সংকুল এবং অতিরিক্ত ঝুঁকিপ্রদ। আর, স্বভাবতঃই ঝুঁকি বেশী হলে বীমা সেলামীও বেশী হয়। তাই এ সময়ে সমুদ্রযাত্রা করতে হলে বীমাকারী বা দায়গ্রাহকের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়। দায়গ্রাহকের পুর্বানুমতি ছাড়া এরূপ যুদ্ধ-বিগ্রহের পরিস্থিতির মধ্যে সমুদ্রযাত্রা করলে এবং দুর্ঘটনা কবলিত হলে, তার কোন ক্ষতিপূরণ প্রদানে দায়গ্রাহক দায়বদ্ধ হন না।
২১. ব্যর্থতার ধারা ( Frustration Clause) :
অনেক সময় তৃতীয় পক্ষের কারণে সমুদ্রযাত্রা ব্যর্থ হয়ে যায়। ফলে, বীমাগ্রহীতা ক্ষতিগ্রস্ত হন। এ ধরনের ক্ষতি বীমাকারী পুরণ করে দেন। কেননা, তা বীমাগ্রহীতার দোষের জন্যে নয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে – বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন একসময় বৃটিশ বাণিজ্য জাহাজগুলি শত্রুদেশ বা যুদ্ধ লিপ্ত পক্ষসমূহের কারণে সমুদ্রযাত্রা শুরু করতে ব্যর্থ হয়। ফলে, পণ্য খালাস করে বিক্রি করে দিতে হয় এবং বীমাগ্রহীতা সওদাগরগণ ক্ষতিগ্রস্ত হন। এমতাবস্থায়, দায়গ্রাহকগণ বিক্রয়কৃত অর্থ বাদ দিয়ে বীমাগ্রহীতাদের যা ক্ষতি হয় তা পূরণ করে দেন।
২২. জাহাজ ও পণ্য বন্ধকীতে ঋণগ্রহণ ( Bottomry and Respondentia) :
পথিমধ্যে জাহাজের কলকব্জা বিকল হয়ে গেলে তা মেরামতের জন্যে এবং প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী সংগ্রহের জন্যে কাপ্তান জাহাজ বা পণ্য বন্ধক দিয়ে ঋণ গ্রহণ করতে পারেন। জাহাজ বন্ধক দিয়ে যে ঋণ গ্রহণ করেন। তা জাহাজ বন্ধকী ঋণ (Bottomry) এবং পণ্য বন্ধক দিয়ে যে ঋণ গ্রহণ করা হয়তা পণ্য বন্ধকী ঋণ গ্রহণ (Respondentia) নামে অভিহিত। এই ঋণ পরিশোষ না করা পর্যন্ত ঋণ দাতার জাহাজ ও বন্ধক প্রদত্ত পণ্যের উপর অধিকার থাকে।
২৩. মেয়াদ বৃদ্ধি ধারা (Continuation Clause) :
বিভিন্ন কারণে অনেক সময় জাহাজ গন্তব্যে পৌছার আগেই বীমাপত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এমতাবস্থায়, বীমাগ্রহীতা দায়গ্রাহকের কাছে উপযুক্ত বিজ্ঞপ্তি দিয়ে অতিরিক্ত বীমা সেলামী প্রদান করলে বীমাপত্রের মেয়াদ বৃদ্ধি করা যায়। সময় ভিত্তিক বীমাপত্রের বেলায়ই এ ধারার প্রয়োগ সঙ্গত কারণেই বেশী হয়।
২৪। সংযোজিত বিশেষ কতিপয় ধারা ( Some Special Attached Clauses) :
নতুন নতুন প্রয়োজনের তাগিদে কালক্রমে বিশেষ বিশেষ কতকগুলি ধারা আদর্শ বা প্রামান্য নৌ-বীমাপত্রের ধারাসমূহের সাথে সংযোজিত করা হয়। এ ধারাসমূহ বীমাচুক্তির শর্ত, সীমা ও ঝুঁকিকে প্রসারিত করে এবং আধুনিক ব্যবসা-বাণিজের ক্ষেত্রে উদ্ভুত কতকগুলি অন্তরায় বা সমস্যা দুরীভূত করে।

The Institute of London Underwriters উক্ত বিশেষ ধারাসমূহ সংযোজন ও প্রচলন করেন। তারা উক্ত ধারাসমূহকে ৩ ভাগে বিন্যস্ত করেছেন। যথাঃ- (১) সময় ধারা, (২) পণ্য ধারা ও (৩) মাসুল ধারা। উক্ত ধারাসমূহ যথাক্রমে জাহাজ, পণ্য ও ভাড়া সংক্রান্ত স্বার্থ রক্ষার্থে ব্যবহৃত হয়। এ জাতীয় ধারাসমূহের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সম্পর্কে নিম্নে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রদান করা হলো :-
