দেশের বীমা খাতে স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) প্রবর্তন করেছে ‘ইন্স্যুরেন্স এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’। তবে এই পুরস্কার প্রদানের মানদণ্ড নিয়ে খোদ বীমা খাতের সংশ্লিষ্টদের মধ্যেই নানা প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। বিশেষ করে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি-র মতো প্রতিষ্ঠানের নাম এই তালিকায় আসায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বাজার বিশ্লেষকরা। কোম্পানিটির গত কয়েক বছরের বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রিমিয়াম সংগ্রহ থেকে শুরু করে বিনিয়োগ ও সলভেন্সি মার্জিন—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সূচকই নিম্নমুখী।
আর্থিক সূচকের নেতিবাচক চিত্র
গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের ২০২৪ সালের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানিটির ব্যবসায়িক গ্রাফ ক্রমাগত নিচের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ২০২৩ সালে যেখানে কোম্পানিটির গ্রস প্রিমিয়াম সংগ্রহ ছিল ৪৫৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪১০ কোটি ৮০ লাখ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রিমিয়াম সংগ্রহের হার কমেছে ৯.৬১ শতাংশ। কেবল প্রিমিয়াম নয়, কোম্পানিটির আন্ডাররাইটিং প্রোফিট বা বীমা ব্যবসার মূল মুনাফাতেও বড় ধরনের ধস নেমেছে। ২০২১ সালে যেখানে মুনাফার হার ছিল ৩১.৩০ শতাংশ, ২০২৪ সালে তা নেমে এসেছে ২৩.৫৯ শতাংশে।
নিম্নের সারণিতে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের কয়েক বছরের আর্থিক তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| আর্থিক সূচক | ২০২৩ সাল (কোটি টাকা) | ২০২৪ সাল (কোটি টাকা) | পরিবর্তনের হার (%) |
| গ্রস প্রিমিয়াম সংগ্রহ | ৪৫৪.৫০ | ৪১০.৮০ | -৯.৬১% |
| আন্ডাররাইটিং প্রফিট | (২০২১: ১২০.৩০) | ৯৬.৯০ | -৭.৭১% (৩ বছরে) |
| মোট বিনিয়োগ | ৪১৬.৭০ | ৩৬৫.৮০ | -১২.২২% |
| সংরক্ষিত তহবিল (রিজার্ভ) | ৪১৬.৭০ | ৩৬৫.৮০ | -১২.২২% |
| সলভেন্সি মার্জিন (AS) | ২০৬.৫০ | ১৪৯.২০ | -২৭.৭৫% |
অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসাব ও সলভেন্সি সংকট
আর্থিক প্রতিবেদনে একটি বড় অসংগতি লক্ষ্য করা গেছে কোম্পানিটির দাবি পরিশোধ ও মুনাফার হিসেবে। সাধারণত বীমা দাবি পরিশোধের হার বাড়লে মুনাফা কমে যায়। কিন্তু গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, বীমা দাবি পরিশোধের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম থাকা সত্ত্বেও আন্ডাররাইটিং প্রোফিট ক্রমাগত কমছে। এটি কোম্পানিটির আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ত্রুটি বা অসামঞ্জস্যতার ইঙ্গিত দেয়।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো কোম্পানিটির ‘এভেইলেবল সলভেন্সি’ বা দায় পরিশোধের সক্ষমতা। ২০২৪ সালে সলভেন্সি মার্জিন প্রায় ২৮ শতাংশ কমে গেছে, যা একটি বীমা প্রতিষ্ঠানের জন্য দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক ঝুঁকির লক্ষণ। বিনিয়োগ ও সংরক্ষিত তহবিল (রিজার্ভ) উভয় ক্ষেত্রেই ৫০ কোটি টাকারও বেশি ঘাটতি দেখা দিয়েছে এক বছরের ব্যবধানে।
পুরস্কার ঘোষণা ও জনমনে প্রশ্ন
আর্থিক সূচকের এমন নাজুক পরিস্থিতি সত্ত্বেও আইডিআরএ গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সকে ‘অসাধারণ পারফরম্যান্স’ ও ‘সুশাসনের’ জন্য এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত করেছে। ২৯ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুরস্কার প্রদানের কথা রয়েছে। আইডিআরএ-র তালিকায় নন-লাইফ খাতে গ্রীন ডেল্টা চতুর্থ স্থানে থাকলেও, তাদের চেয়ে ভালো অবস্থানে থাকা অনেক কোম্পানি এই মূল্যায়নে পিছিয়ে রয়েছে।
জনসাধারণের আস্থা বৃদ্ধি ও ইতিবাচক ইমেজ তৈরির লক্ষ্যে এই পুরস্কারের প্রবর্তন করা হলেও, দুর্বল পারফরম্যান্সের কোম্পানিকে পুরস্কৃত করায় উল্টো আস্থার সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ এবং গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। বীমা খাতের বিশ্লেষকরা মনে করেন, পুরস্কারের মানদণ্ড যদি কেবল কাগুজে তথ্যের ওপর ভিত্তি করে হয়, তবে প্রকৃত পেশাদারিত্ব ও আর্থিক সক্ষমতার সঠিক মূল্যায়ন বাধাগ্রস্ত হবে।
