বাংলাদেশের সাধারণ বীমা খাতে ‘এজেন্ট কমিশন’ দীর্ঘকাল ধরে অনিয়ম ও নীতিগত দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আইডিআরএ একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যার ফলে ২০২৬ সাল থেকে ব্যক্তিগত এজেন্টের মাধ্যমে ব্যবসা সংগ্রহের পথ বন্ধ হতে যাচ্ছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ বাজারে একটি সুস্থ প্রতিযোগিতা এবং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং বীমা খাতের আন্তর্জাতিক রীতির সাথে এই সিদ্ধান্তের সাংঘর্ষিক অবস্থান নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।
অনিয়মের শিকড় অনেক গভীরে। ২০১২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত কমিশনের উচ্চ হার এবং প্রিমিয়াম ডাম্পিংয়ের কারণে কোম্পানিগুলোর আর্থিক ভিত দুর্বল হয়ে পড়েছিল। কাগজে ১৫ শতাংশ কমিশনের নিয়ম থাকলেও গোপনে এর কয়েক গুণ বেশি অর্থ লেনদেন হতো। ২০২১ সালে একবার কমিশন বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হলেও আইনি জটিলতায় তা কার্যকর করা যায়নি। তবে ২০২৫ সালের শেষ দিকে এসে আইডিআরএ অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে, যা এই খাতের প্রচলিত কাঠামোকে আমূল বদলে দেবে।
এই পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বড় আঘাত আসবে ক্ষুদ্র এজেন্টদের ওপর এবং সরকারের কর আহরণের ওপর। বর্তমানে হাজার হাজার মানুষের আয়ের উৎস এই এজেন্সি কমিশন। কমিশন বাতিল হলে এনবিআর বার্ষিক প্রায় ৩৩ কোটি টাকার সরাসরি কর হারাবে। এছাড়াও এজেন্ট নিবন্ধনের ফি থেকে প্রাপ্ত সরকারি আয়ও বন্ধ হয়ে যাবে। বর্তমানে ৩,১৩৫ জন সক্রিয় নিবন্ধিত ব্যক্তি এজেন্টের জীবন-জীবিকা এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
নিচে এজেন্সি ব্যবস্থার আর্থিক সংশ্লেষ এবং পরিবর্তনের প্রভাব দেখানো হলো:
নন-লাইফ বীমা খাতের এজেন্ট ও রাজস্ব পরিসংখ্যান
| আর্থিক ও নীতিগত বিষয় | সংশ্লিষ্ট তথ্য |
| ব্যক্তিগত এজেন্টের বর্তমান অবস্থা | ৩,১৩৫ জন (নিবন্ধিত) |
| মোট গ্রস প্রিমিয়াম (২০২৩) | ৪,৭৫২.৩৫ কোটি টাকা |
| আনুমানিক কমিশন ব্যয় (১৪.২৫% হারে) | ৬৭৭ কোটি টাকা |
| এনবিআর কর (৫% উৎসে কর) | ৩৩ কোটি টাকা (প্রায়) |
| নতুন নীতি কার্যকর | ১ জানুয়ারি ২০২৬ |
| কমিশন পরবর্তী অবস্থা | শূন্য শতাংশ কমিশন ও লাইসেন্স স্থগিত |
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নন-লাইফ বীমায় এজেন্টরাই এখনো মূল চালিকাশক্তি। অনেক ক্ষেত্রে তারা বেতনভুক্ত কর্মচারী নন, ফলে তাদের মাধ্যমে সংগৃহীত ব্যবসায় কোম্পানির স্থায়ী ব্যয় কম থাকে। এখন কমিশন শূন্য করা হলে কোম্পানিগুলোকে স্থায়ী জনবল নিয়োগ করতে হবে, যা তাদের প্রশাসনিক ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। তাছাড়া ডিজিটাল ও করপোরেট চ্যানেলের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ হওয়ার আগে এমন সিদ্ধান্ত কতটুকু কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
পরিশেষে, আইডিআরএ-র এই সিদ্ধান্তটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হলেও এর বাস্তবায়ন অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এজেন্ট প্রথা বাতিল করার পর যদি সমান্তরাল কোনো বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা না যায়, তবে সাধারণ বীমা খাতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। সফল রূপান্তরের জন্য কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন হবে দৃঢ় নীতিগত স্থিরতা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।
