অগ্নিবীমার উপাদানসমূহ 

আজকের আলোচনার বিষয় “অগ্নিবীমার  উপাদানসমূহ ” যা অগ্নিবীমা অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।

অগ্নিবীমার উপাদানসমূহ 

 

অগ্নিবীমার উপাদানসমূহ 

 

অন্যান্য বীমার মতই অগ্নিবীমার চুক্তি গঠনের জন্যেও কতকগুলি উপাদান একান্ত অপরিহার্য। স্বভাবতঃই অগ্নিবীমাও যেহেতু একটি চুক্তি তাতে সাধারণ চুক্তির উপাদান সমূহ সমভাবে থাকতে হয়। যথা : (ক) কমপক্ষে দু’টি পক্ষ, (খ) প্রস্তাব দান, (গ) স্বীকৃতি (ঘ) পরস্পরিক দায়-দায়িত্ব, (ঙ) প্রতিদান, (চ) পক্ষসমূহের যোগ্যতা, (ছ) পক্ষসমূহের পারস্পরিক স্বেচ্ছা-সায় এবং (জ) উদ্দেশ্য ও প্রতিদানের বৈধতা।

উপরোক্ত উপাদানগুলো সম্পর্কে অগ্নিবীমার ক্ষেত্রে সংক্ষেপে নিম্নরূপ বর্ণনা করা যেতে পারে –

প্রথমতঃ সম্ভাব্য বা প্রস্তাবিত বীমাগ্রহীতা মৌখিক বা লিখিতভাবে তার সম্পদ- সম্পত্তির জন্যে বীমা গ্রহণের প্রস্তাব দিতে পারেন। তবে, প্রকৃতপক্ষে বীমাকারীর কাছ থেকে সংগৃহীত প্রস্তাবনা পত্র পুরণ করে লিখিতভাবেই বীমাগ্রহীতা প্রস্তাব দিয়ে থাকেন। উক্ত প্রস্তাবনা পত্রে বীমার বিষয়বস্তুর ধরন, মূল্য, গঠন ইত্যাদি ও বীমাগ্রহীতার ব্যক্তিগত তথ্যাদি সম্পর্কে তথ্য প্রদান করা হয় যা চূড়ান্ত সন্ধিশ্বাস সহকারে সন্নিবেশিত করতে হয়। কেননা, অগ্নি বীমা চুক্তিও চুড়ান্ত সদ্বিশ্বাসের চুক্তি।

দ্বিতীয়ত : উক্ত প্রস্তাবনা পত্রে সন্নিবেশিত তথ্যাদির প্রেক্ষিতে বীমাকারী যদি দেখেন ঝুঁকির পরিমাণ তথা বিষয়বস্তুর মূল্য তত বেশী নয়, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রস্তাব তথা ঝুঁকি গ্রহণ করতে পারেন। আর, যদি দেখেন যে, বিষয়বস্তু অনেক ঝুঁকিপূর্ণ ও তার মূল্য অনেক তাহলে বীমাকারী নিজস্ব জরিপকারী প্রেরণ করে সঠিক জরিপ করে নেন। জরিপকারীর প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে বীমাকারী প্রস্তাবের মূল্যায়ন করবেন এবং প্রস্তাব বিবেচনা করবেন। এরূপ ক্ষেত্রে অপরিচিত প্রস্তাবকারীর কাছ থেকে বীমাকারী পরিচিতিপত্র চাইতে পারেন যা সাধারণতঃ সমাজের দায়িত্বশীল বা সম্ভ্রান্ত কোন ব্যক্তির কাছ থেকে সংগ্রহ করতে হয়।

তৃতীয়ত : এসব আনুষ্ঠানিকতাসমূহ পালন সাপেক্ষে বীমাকারী সন্তুষ্ট হলে প্রস্তাব তথা ঝুঁকি গ্রহণ করতে পারেন। এ জন্যে কোন সময় নির্ধারিত না থাকলে চুক্তি গঠিত হওয়ার সাথে সাথে ঝুঁকি গ্রহণ আরম্ভ। Commencement of risk) হয়েছে বলে গণ্য হয়। অর্থাৎ, প্রস্তাব গ্রহণের সাথে সাথে ঝুঁকি গ্রহণ করা হয়। তাতে বীমাপত্র এবং/অথবা বীমা সেলামী প্রদান করা হোক বা না হোক। তবে, যেক্ষেত্রে ঝুঁকি খুব বেশী থাকে সেক্ষেত্রে বীমা সেলামী প্রদানই হয় চুক্তি গ্রহণ তথা ঝুঁকি গ্রহণের ভিত্তি। কিন্তু, বীমাপত্র ইস্যু করা হয়ে গেলে আবার বীমা সেলামী প্রদান করা হোক বা না হোক ঝুঁকি গ্রহণ করা হয়ে যায়।

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, বীমাকারী যদি সাময়িকভাবে ( Provisionally) গ্রহণ করেন তাহলে সাধারণতঃ বীমাপত্র প্রদানের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে ঝুঁকি গ্রহণের পূব পর্যন্ত একটি cover note বা Interim Protection Note বীমাগ্রহীতাকে প্রদান করে থাকেন। বীমাপত্র প্রদানের আগেই যদি বীমাগ্রহীতার বীমাকৃত সম্পত্তির ক্ষতি হয়ে যায়, তাহলে বীমাগ্রহীতা উক্ত Cover note bh Interim Protection Note দিয়েই বীমাদাবী বা ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারবেন।

চতুর্থতঃ বীমাকারী চুক্তি গঠনের সাথে সাথে অথবা চুক্তি মোতাবেক বা আনুষ্ঠানিকতা সাপেক্ষে ধীমাগ্রহীতাকে বীমাপত্র (Policy) ইস্যু করে থাকেন। আগেই বলা হয়েছে যে বীমাপত্র প্রদানের সাথে সেলামী দেয়া হোক আর না হোক ঝুঁকি গ্রহণ বা আরম্ভ হয়ে যায়। বীমাপত্রে সাধারণতঃ বীমাগ্রহীতার নাম, ঠিকানা, বিষয়-বার বিবরণ, মূল্য, অবস্থান, গঠন, বীমাসেলামী সংক্রান্ত শর্তাবলী ইত্যাদি সম্পর্কে বর্ণনা সন্নিবেশিত করা হয়। এতে বীমাচুক্তি সংক্রান্ত বিভিন্ন শর্তাবলী ও ধারাসমূহ সন্নিবেশিত থাকে। যদিও শর্তাবলী পরিবর্তনযোগ্য।

ও প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, বীমাপত্র সাধারণতঃ এক বছরের জন্যে প্রদান করা হয়। তবে, এক বছরের কম বা বেশী মেয়াদের জন্যে দেয়া হয়ে থাকে। এক বছরের কম মেয়াদের বীমাপত্রকে স্বল্প মেয়াদী বীমাপত্র (Short-term Policy) ও এক বছরের বেশী মেয়াদের বীমাপত্রকে দীর্ঘমেয়াদী বীমাপত্র ( Long-term Policy) বলে। দীর্ঘমেয়াদী বীমাপত্র সাধারণতঃ দালান-কোঠার উপর প্রদান করা হয়ে থাকে।

আরও উল্লেখ্য যে, মেয়াদের মধ্যে যদি একাধিক অগ্নি দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে বীমাগ্রহীতা বীমাকৃত মূল্যের চেয়ে অধিক ক্ষতিপুরণ পাবেন না। প্রথমবারের ক্ষতিপুরণ দেয়ার পরে যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে তাই পরবর্তী দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ হিসেবে পাওয়া যাবে। তবে, বীমাগ্রহীতা যদি আবার পূর্ণ ক্ষতিপূরণ পেতে চান তাহলে, প্রয়োজনীয় বাড়াত অর্থ সেলামী হিসেবে প্রদান করে মূল্যর বীমাকৃত অর্থ পুর্নস্থাপিত করতে পারেন।

এই হোল সাধারণ উপাদান সমূহের প্রধান প্রধান কয়েকটি উপাদান সম্পর্কে বর্ণনা। এখন বিশেষ উপাদান সমূহ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রদান করা হলোঃ-

১. বীমাযোগ্য স্বার্থ (Insurable Interest) : বীমার বিষয় বস্তুতে বীমাগ্রহীতার যে আর্থিক স্বার্থ বিদ্যমান থাকে তাকেই বলা হয় বীমাযোগ্য স্বার্থ। বিষয়-বস্তুর বিনাশে বা ক্ষতিতে যদি বীমাগ্রহীতার স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ইহার বিদ্যমানতায় যদি বীমাগ্রহীতার উপকার হয় বা স্বার্থ রক্ষিত হয় তাহলেই বোঝা যাবে যে বিষয় বস্তুতে বীমাগ্রহীতার বীমাযোগ্য স্বার্থ বিদ্যমান রয়েছে। বীমাযোগ্য স্বার্থ ছাড়া যে কোন বীমাচুক্তিই জুয়া চুক্তি হিসেবে গণ্য হয়। অগ্নিবীমার বেলায় এ কথা ততোধিক সত্য এই কারণে যে— অন্যান্য বীমার বেলায় বীমাকৃত বিষয়- বস্তুতে চুক্তিগঠনকালীন বা ক্ষতিসংঘটনকালীন বীমাগ্রহীতার বীমাযোগ্য স্বার্থ বিদ্যমান।

[নিম্নোক্ত শর্তাবলী পালিত বা পরিপুরিত হলেই বীমাযোগ্য স্বার্থের বিদ্যমানতা বা অস্তিত্ব প্রমানিত হয়—

(i) বিষয় বস্তুটিকে হতে হবে একটি বাস্তব বা দৃশ্য উপাদান যা অগ্নি দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে পারে

(ii) উপাদানটিকে হতে হবে বীমার বষয় বস্তু :

(III) বিষয় বস্তুটির অস্তিত্ব বা বিদ্যমানতায় বীমাগ্রহীতার উপকার সাধিত বা আর্থিক স্বার্থ রক্ষিত হবে এবং বিনাসে বা অবিদ্যমানতায় তার ক্ষতি বা স্বার্থ বিপর্যস্ত হবে। বীমাযোগ্য স্বার্থ হচ্ছে বিষয়-বস্তুতে বীমাগ্রহীতার আর্থিক স্বার্থ। আগ্নিবীমা চুক্তি প্রকৃতপক্ষে বীমাকারী ও বীমাগ্রহীতার মধ্যে একটি ব্যক্তিগত চুক্তি। সুতরাং, স্বার্থের হস্তাস্তরে অগ্নি বীমাচুক্তি বাতিল বলে পরিগণিত হয়।

কোন বিষয়বস্তুতে নিম্নোক্ত ব্যক্তিবর্গের বীমাযোগ্য স্বার্থ বিদ্যমান থাকে –

(a) স্থাবর বা অস্থাবর কোন সম্পত্তির মালিকের সম্পত্তির উপর বীমাযোগ্য স্বার্থ বিদ্যমান থাকে। তবে, কখনও পূর্ণ মালিক বা আদৌ মালিক না হয়েও বীমাযোগ্য স্বার্থের অধিকারী হতে পারেন। যেমন : আজীবন ভাড়াটে মৃত্যুর পূর্বাবধি ভাড়ার সম্পত্তির উপর বীমাযোগ্য স্বার্থের অধিকারী থাকেন।

(b) প্রতিনিধির মালিকের সম্পত্তির উপর বীমাযোগ্য স্বার্থ থাকে।

 (c) অংশীদারের অংশীদারী কারবার বা সম্পত্তিতে বীমাযোগ্য স্বার্থ থাকে।

(d) পাওনাদারের কাছে রক্ষিত দেনাদারের কোন সম্পত্তির উপর পূর্বসত্ববলে পাওনাদার বীমাযোগ্য স্বার্থের অধিকারী হন।

(e) পুনঃ বীমাকৃত সম্পত্তির উপর প্রথম বীমাকারীর বীমাযোগ্য স্বার্থ বিদ্যমান থাকে।

(f) বন্ধক হিসেবে রক্ষিত সম্পত্তির উপর বন্ধকগ্রহীতার বীমাযোগ্য স্বার্থ বিদ্যমান থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি তার প্রাপ্য বুঝে না পান।

(g) গচ্ছিত সম্পত্তির উপর গচ্ছিত গ্রহীতার বীমাযোগ্য স্বার্থ থাকে এবং

(h) জনকল্যাণে উইলকৃত ন্যাসাধীন সম্পত্তি Trust-Property or estate)-র উপর ন্যাসরক্ষক বা অছি (Trustee)-র অথবা অছি পরিষদের সদস্যদের (Members of Board of Trustees) বীমাযোগ্য স্বার্থ বিদ্যমান থাকে।]

৩. চূড়ান্ত সদ্বিশ্বাস (Ulmost good falth) : অন্যান্য বীমাচুক্তির মতই অগ্নি বীমার ক্ষেত্রেও চূড়ান্ত সদ্বিশ্বাস একটি অন্যতম অপরিহার্য উপাদান। উভয় পক্ষকেই চুক্তি গঠনের শুরু থেকে চুক্তির পরিসমাপ্তি পর্যন্ত এই চূড়ান্ত সদ্বিশ্বাস রক্ষা করে চলতে হবে। কোন পর্যায়ে কোন পক্ষ যদি তথ্যাদি প্রকাশে বা স্ব স্ব দায়িত্ব ও আনুষ্ঠানিকতা পালনে কোন অতিরঞ্জন, মিথ্যা বর্ণনা বা প্রতারণার মাধ্যমে চূড়ান্ত সদ্ধিশ্বাস ভঙ্গ করেন তাহলেই চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে। যে কোন পক্ষই আইনতঃ অভিযুক্ত হবেন।

উভয় পক্ষকেই বিষয়বস্তুও চুক্তি সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্যাদি সঠিক ও পূর্নভাবে প্রকাশ করতে হবে—কোন কিছু গোপন করা যাবেনা বা বাড়িয়ে বলা যাবে না : এমনকি, যদি সরকার প্রকাশ করা প্রয়োজন বা জরুরী বলে মনে হয়, তাহলে না জিজ্ঞেস করলে বা না জানতে চাইলে তা জানাতে বা প্রকাশ করতে হবে। [তবে, নিম্নোক্ত ক্ষেত্র সমুহে তথ্যাদি প্রকাশ না করলেও চুক্তি বাতিল হয় না :-

(১) যে সব তথ্য বা অবস্থা ঝুঁকি হ্রাস করে ;

(২) সে সব তথ্য সম্পর্কে সঙ্গত কারণে অবহিত থাকার কথা ;

(৩) যে সব তথ্য সর্বজনবিদিত;

(৪) যে সব সম্পর্কে সরবরাহকৃত তথ্যাদি বা প্রস্তাবণাপত্রে সন্নিবেশিত তথ্যাদি থেকে জেনে নেয়ার সুযোগ থাকে এবং

(৫) যে সব তথ্য চুক্তির শর্তানুযায়ী প্রকাশ করার অবকাশ বা প্রয়োজন নেই।

 

৪. ক্ষতিপূরণ ( Indemnity) : ক্ষতিপুরণ অগ্নিবীমা চুক্তির আর একটি অন্যতম অপরিহার্য উপাদান। বীমাকৃত বিপদ বা দুর্ঘটনা সংঘটনের ফলে বীমাকৃত বিষয় বস্তুর ক্ষতি সাধিত হলে বা বিষয় বস্তু ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে বীমাকারী বীমাগ্রহীতাকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করেন। বীমাকারী এমন ভাবে ক্ষতিপূরণ প্রদান করবেন যেন বীমাগ্রহীতার সম্পত্তি ক্ষতি সংঘটনের পূর্বে যে অবস্থায় ছিল তদ্রূপ অবস্থায় অথবা কাছাকাছি অবস্থায় ফিরিয়ে দেয়া যায়-যেন মনে হয় কোন ক্ষতি হয়নি।তবে, ক্ষতিপূরণ পেতে হলে –

(i) ক্ষতিগ্রস্ত বিষয়-বস্তু হতে হবে বীমাকৃত,

(ii) ক্ষতি সংঘটিত হতে হবে বীমাকৃত কারণ বা বিপদে, এবং (111) ক্ষতি হতে হবে অনিচ্ছাকৃত এবং সাধারণ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ হিসেবে বিষয়-বস্তু রক্ষার জন্যে যথাসাধ্য চেষ্টায়ও যদি ক্ষতি রোধ করা সম্ভব না হয়ে থাকে –অর্থাৎ কোন অবহেলা বা অসদুদ্দেশ্য না থাকলে এবং আন্তরিক রক্ষা প্রচেষ্টা প্রমানিত হলেই কেবল ক্ষতিপুরণ আদায় করা যাবে।

এছাড়া ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত আরও নিয়ম কানুন রয়েছে। যেমন :—

(a) ক্ষতি যে পরিমাণ সংঘটিত হয়েছে, বীমাগ্রহীতা সে পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দাবী ও আদায় করতে পারবেন। অর্থাৎ, বিষয়বস্তু বীমাকৃত করে তা থেকে মুনাফা করা যাবে না। কেননা, তেমন সুযোগ দেয়া হলে বীমাকৃত বিষয় বস্তু ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংস করে বীমাদাবী আদায়ের প্রবণতা বৃদ্ধিপাবে।

(b) উপরোক্ত নিয়মের সম্প্রসারণে বলা রয়েছে যে বীমাগ্রহীতা বীমাকৃত মূল্যের (Insured Value) বেশী ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারবেন না। এটি কোন পরিমাপক নয়, তবে সর্বোচ্চ সীমা যে পর্যন্ত বীমাগ্রহীতা বীমাদাবী আদায় করতে পারবেন। আর ক্ষতির পরিমাণ যদি বীমাকৃত অর্থের চেয়ে কম হয়, তাহলে সঙ্গত কারণেই পূর্ণ ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারবেন।

(c) আর, বীমাপত্র যদি মূল্যায়িত হয়, তাহলে ক্ষতিপূরণ বা দাবী পূরণ করা হয় ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংসপ্রাপ্ত সম্পত্তির ক্ষতি সঙ্ঘটনকালীন বাজার মূল্যের প্রেক্ষিতে সমন্বয় সাধন সাপেক্ষে। ফলে, প্রকৃত ক্ষতির উপর গুরুত্ব দেয়া হয় না; বরং, বাজারমূল্য অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ বা দাবীর পরিমাণ প্রকৃত ক্ষতির চেয়ে কমও হতে পারে এবং বেশীও হতে পারে। কেননা, বীমাগ্রহীতা তাহলে অব-বীমা (Under-Insure) করে অধিক প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে প্রবুদ্ধ হতে পারেন।

(d) ক্ষতিপূরণ বা দাবী আদায় করার সময় তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে বীমাগ্রহীতার প্রাপ্য বা তার অধিকার বীমাকারীর কাছে অবশ্যই হস্তান্তর করতে হয়।

(e) বীমাগ্রহীতা যদি একই সম্পত্তির জন্যে একাধিক বীমাপত্র গ্রহণ করে থাকেন, তাহলে বীমাকৃত সম্পত্তির ক্ষতি সংঘটিত হতে উভয় বীমাকারীর কাছ থেকে বীমাদাবী বা ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারবেন। তবে, তা কোন কারণেই বীমাকৃত অর্থের চেয়ে বেশী হতে পারবেনা। এক্ষেত্রে বীমাগ্রহীতা আনুপাতিক হারে সর্বশ্লষ্ট বীমাকারীদের কাছ থেকে কেবল মাত্র প্রকৃত ক্ষতিই আদায় করতে পারবেন।

একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি আরও পরিষ্কার করা যেতে পারে। ধরা যাক মি. রহিম একই সম্পতির জন্যে ‘ক কোম্পানীর কাছ থেকে ৩০,০০০ টাকার এবং ‘খ’ কোম্পানীর কাছ থেকে ৬০,০০০ টাকার দু’টি বীমাপত্র গ্রহণ করেন। বীমাগ্রহীতার ক্ষতি হলো ৩০,০০০ টাকা। এখন বীমাগ্রহীতা উভয় ধীমাকারীর কাছ থেকে (৩০,০০০ + ৩০,০০০) মোট ৬০,০০০ টাকা বীমাদারী আদায় করতে পারবেন না। পারবেন প্রকৃত ক্ষতি ৩০,০০০ টাকাই। উক্ত টাকা তিনি দু কোম্পানীর কাছ থেকে আনুপাতিক ( ৩:৬ বা ১৪২) হারে নিতে পারবেন।

অর্থাৎ বীমাগ্রহীতা ‘ক’ কোম্পানীর কাছ থেকে ১০,০০০ টাকা এবং ‘খ’ কোম্পানীর কাছ থেকে ২০,০০০ টাকা আদায় করতে পারবেন। তবে, যে কোন কোম্পানীর কাছ থেকেও তিনি পুরো টাকা নিতে পারেন। সেক্ষেত্রে যে কোম্পানীর কাছ থেকে ক্ষতিপুরণ নেয়া হলো সে কোম্পানী অপর কোম্পানীর কাছ থেকে আনুপাতিক অংশ নিয়ে নিবেন। তবে, যদি ক্ষতি ৫০,০০০ টাকা হতো, তাহলে ‘ক’ কোম্পানীর কাছ থেকে পুরো টাকা নেয়া যেতো না। কারণ, ‘ক’ কোম্পানী থেকে গৃহীত বীমাপত্রের মূল্যই হলো 00,000 টাকা। তাই, ‘ক’ কোম্পানী ৩০,০০০ টাকার বেশী দিবেন না বরং ‘খ’ কোম্পানীর কাছ থেকে পুরো টাকা নিলে ‘খ’ কোম্পানী ‘ক’ কোম্পানীর কাছ থেকে পরে আনুপাতিক অংশ নিয়ে নিতে পারবে।

৫. স্থলাভিষিক্ততা ( Subrogation) : সম্পত্তি বীমার আইন অনুযায়ী বীমাকারী যদি বীমাকৃত সম্পত্তির ক্ষতি সংঘটনের প্রেক্ষিতে বীমাকারীকে ক্ষতিপুরণ প্রদান করেন, সেক্ষেত্রে বীমাগ্রহীতার যদি উক্ত বীমাকৃত বিষয়-বস্তুর জন্যে তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে প্রাপ্য থাকে, তা বীমাকারীই পাবেন বীমাগ্রহীতা পাবেন না।কেননা, তাকেতো ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়েছেই।

অর্থাৎ, বীমাগ্রহীতার উষ্ণ প্রাপ্যের উপর যে অধিকার ছিল, সে অধিকারে এখন বীমাকারীই অভিষিক্ত হবেন আবার, পূর্ণ ক্ষতিপুরণ দানের পর যদি ক্ষতিগ্রস্ত সম্পত্তি থেকে কিছু উদ্ধার করা যায়, তারও মালিকানা বা অধিকার চলে যাবে সঙ্গত কারণেই বীমাকারীর কাছে। তাই, বীমাগ্রহীতার স্থলে বীমাকারীর অভিষিক্ত হওয়ার এ নীতিকেই বলা হয় স্থলাভিষিক্ততার নীতি বা মতবাদ | Principle or Doctrine of Subrogation)। এ নীতিটি স্বভাবতঃই ক্ষতিপুরণের নীতির বা উপাদানের অনুগামী (Corollary to the Principle of Indemnity) কারণ, ক্ষতিপূরণ দেয়া হলেই কেবল স্থলাভিষিক্ততার প্রশ্ন আসে।

৬. শর্তাবলী ( Warranties) : অগ্নিবীমা চুক্তিতেও থাকে কতকগুলি অপরিহার্য শর্ত প্রযুক্ত। তবে, কিছু শর্ত থাকে ব্যক্ত বা লিখিত ( Expressed) এবং কিছু থাকে অব্যক্ত বা অনুক্ত । Unexpressed or implied) বিধিগতভাবে উক্ত যে কোন শর্তই যথারীতি পালিত না হলে অগ্নিবীমা চুক্তি বাতিল হয়ে যায়। এমনকি ঝুঁকি বৃদ্ধি পেলেও শর্ত পালন অপরিহার্য। বীমাগ্রহীতা যদি বীমাচুক্তি সংশ্লিষ্ট কোন শর্ত পালনে ব্যর্থ হন, তাহলে সঙ্গত কারণেই বীমাকারী বীমাদাবী পুরণ করতে অস্বীকার করতে পারেন। তাই, অগ্নিবীমা চুক্তিতে শর্তাবলী গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

৭. প্রত্যক্ষ বা নিকটতম কারণ ( Proximate Cause) : বীমাকৃত বিষয়-বস্তুতে আগুন লেগে বিষয়বস্তুর ক্ষতি বা সে সাধিত হলে অগ্নবীমায় ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয় এটাইতো ধরে নেয়া হয়। কিন্তু, আগুন লাগার কারণতো থাকতে পারে অনেক। এখন এই অনেক কারণের বিরুদ্ধেইতো কোন বীমাগ্রহীতা বীমাগ্রহণ করতে পারেনা। কারণ, তাহলে বীমার সেলামী যা হবে তাতে খাজনার চেয়ে বরং বাজনাই বেশী হয়ে যাবে। অর্থাৎ, এটি প্রকৃতপক্ষে সম্ভব নয়।

 

অগ্নিবীমার উপাদানসমূহ 

 

তাই, হয়ত বিষয়বস্তুর অবস্থান, প্রকৃতি ইত্যাদির উপর বিবেচনা করে কতিপয় বা কোন কারণ বা সম্ভাব্য বিপদ বা বিপদসমূহের বিরুদ্ধে বীমাপত্র গ্রহণ করে থাকেন। এখন, তাহলে ক্ষতিপুরণের প্রশ্ন এলে অনুসন্ধান করে দেখা হবে, কোন কারণে প্রকৃতপক্ষে আগুন লেগেছে। যে কারণে প্রকৃতপক্ষে আগুণ লেগেছে এবং ক্ষতি হয়েছে, তাই নিকটতম কারণ। মি. ডোভার (Dover) তাই বলেছেন— The Causa proxima of a loss is the Cause of the loss, Proximate to the loss, not necessarily in time. but in efficiency ( ক্ষতির কারণই হলো ক্ষতির নিকটতম কারণ, ক্ষতির নিকটতম কারণ সময়ের নিরিখে হতে হবে তা অবশ্যই নয়, বরং তা হতে হবে কার্যকরিতায় বিবেচ্য) । তাৎপর্য হলো—এই যে নিকটতম কারণ বিচার বা অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখতে হবে প্রকৃতপক্ষে কোন কারণে আগুন লেগেছে। হতে পারে এমন যে একাধিক কারণে ক্ষতিটি হলো। সেক্ষেত্রে যে কারণে শেষ পর্যন্ত বিষয়বস্তুটি জলছিল সে কারণে মূলতঃ আগুন লাগেনি-লেগেছে বরং অন্য কারনে। সেই মূল কারণটিই হলো নিকটতম বা প্রত্যক্ষ কারণ এবং অন্যটি দৃশ্য কারণ হলেও তা হবে দূরবর্তী কারণ।

নিয়ম হলো এই যে, নিকটতম কারণটি যদি বীমাকৃত হয়—তাহলেই কেবল ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হবে, অন্যথায় নয়। তাই সংশ্লিষ্ট আইনে বলা হয়েছে That the immediate and not the remote cause is to be regarded.” এ প্রসঙ্গে একটি রোমান প্রবচন হলো- ‘Sed causa Proxima, non remota spectature যার ইংরেজী অনুবাদ হলো – See the proximate cause and not the remote cause বঙ্গানুবাদ হলো—নিকটতম কারণের দিকে তাকাও, দূরবর্তী কারণের দিকে নয়।

এই হলো সংক্ষেগে অগ্নিবীমার অপরিহার্য উপাদানসমূহ যদিও অনেকেই এগুলিকে বৈশিষ্ট্যাবলী হিসেবেও অভিহিত করে থাকেন।

Leave a Comment