আজকের আলোচনার বিষয় “অগ্নিবীমার নীতিমালা ” যা অগ্নিবীমা অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।
Table of Contents
অগ্নিবীমার নীতিমালা

আর্থ-সামাজিক প্রতিটি ক্ষেত্রে তথা যাবতীয় কর্মকাণ্ডসুষ্ঠু ভাবে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্যে কতকগুলি নীতি ও পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। বীমাও যেহেতু একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর্থ-সামাজিক কর্মকাণ্ড, স্বভাবতঃই তা সে সাধারণ নিয়মের কোন ব্যতিক্রম নয়। আর, অগ্নিবীমার চুক্তিও যেহেতু অন্যান্য সাধারণ চুক্তি এবং বীমাচুক্তির মতই—–অগ্নিবীমার ক্ষেত্রেও সাধারণ নীতিমালা ও অপরিহার্য উপাদানসমূহ সমভাবে বিদ্যমান। উপরন্তু, অগ্নিবীমার বেলায় নিম্নে বর্ণিত নীতিমালা বিশেষভাবে অনুসৃত হয়।
(i) ক্ষতিপূরণের নীতি (Principles of Indemnity ) :
অগ্নিবীমা সম্পত্তি বীমার আওতাভুক্ত বলেই ক্ষতিপুরণের চুক্তি হিসেবে পরিগণিত। অগ্নি দ্বারা সৃষ্ট ক্ষতিপূরণ সম্পর্কেই যেহেতু অগ্নিবীমার চুক্তি গঠিত হয়ে থাকে ক্ষতিপূরণ স্বাভাবিক কারণেই তার একটি অন্যতম অপরিহার্য নীতি ও বিষয়। অগ্নিবীমার ক্ষতিপূরণ নীতি অনুযায়ী গঠিত চুক্তিতে বীমাকারী বা দায়গ্রহীতা বীমাগ্রহীতাকে ক্ষতি সঙ্ঘটিত হলে তা সংঘটিত হবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন। দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়ে ক্ষতি হলে, বীমাগ্রহীতা ক্ষতির পরিমাণের বেশীও আদায় করতে পারবেন না, আবার কমও গ্রহণ করবেন না— যতটা ক্ষতি হয়েছে ততটাই ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারবেন।
অগ্নিবীমার, ক্ষতিপূরণ প্রশ্নে বিভিন্ন লেখক ও বিশেষজ্ঞ যে সব অভিমত ব্যক্ত করেছেন তার কয়েকটি অভিমত নিম্নে প্রদান করা হলো :
বিচারপতি লর্ড ন্যান্সফিল্ড-এক মামলার রায় প্রসঙ্গে বলেছেন যে, “এটা অত্যন্ত সঙ্গতভাবেই স্বীকৃত যে— ক্ষতিপূরণের নিয়মানুযায়ী সংঘটিত ক্ষতির চেয়ে কেউ বেশী অর্থ আদায় করতে পারবেন না। কেননা, প্রতারণা প্রতিরোধকল্পেই এ নীতি প্রণীত যাতে অধিক সুবিধা লাভের জন্যে কেউ অন্যায় ও ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতি সংঘটনে প্রলুদ্ধ না হয় ( it was very wisely that a man should not recover than he had lost as was formulatul to prevent fraud. lest the temptation of gain should occasion unfair and wilful losses. “–Chief Justice Lord Mansfield ) ।
এল. জে. ব্রেট বলেছেন-” বীমাচুক্তির পরিসরে নৌ ও অগ্নিবীমা চুক্তি মূলতঃ ক্ষতিপূরণের চুক্তি এবং শুধুই ক্ষতিপুরণের জন্যে গঠিত। উপরন্তু, যে সব ক্ষতির জন্যে বীমাপত্র প্রস্তুত করা হয়, তার জন্যে বীমাগ্রহীতা সম্যকভাবে ক্ষতিপূরণকৃত হবেন। এ নিয়মের অন্যথা হলে অর্থাৎ, বীমাগ্রহীতা ক্ষতির চেয়ে বেশী আদায় করতে সুযোগ পেলে অথবা তাকে কম প্রদান করা হলে তা হবে একটি নিশ্চিত ভ্রান্ত প্রস্তাবনা বা কর্মপন্থা the contract of insurance contained in a marine or fire policy is a contract of indemnity and of indemnity only and that this contract means that the assured. in case of a loss against which the policy has been made, shall be fully indemnified
if ever a proposition is brought forward which is at variance with it–that is to say, which either will prevent the assured form obtaining a full indemnity, or which will give to the assured more than a full indemnity–the proposition must certainly be wron L. J. Brett )1 *
T. Bowen (এল. জে. বোয়েন) – প্রায় সমভাবে মন্তব্য করেছেন যে- “It is an ocular illusion to suppose that under any circumstances more may be obtained by the assured that the amount of the loss. অর্থাৎ, যে কোন অবস্থাতেই প্রকৃত ক্ষতি অপেক্ষা বীমাগ্রহীতার বেশী কিছু ক্ষতিপূরণ মাতৃ করার পায়তারা হলো একটি অন্যায় প্রবক্তা (চাক্ষুস মায়া)।
ক্ষতির চেয়ে বেশী আদায়ের সুযোগ দেয়া হলে দুটো বিপত্তি ঘটত। প্রথমতঃ তাতে বীমাপত্রধারী অধিক প্রাপ্তির বা বন র লালসায় অন্যায়ভাবে বীমাকৃত সম্পত্তিতে অগ্নি সংযোগে জলুর হতে পারত এবং দ্বিতীয়তের উপরোক্ত কারণেই বীমাকারীকে ছোট ক্ষতির জন্যে বড় দাবী মেটাতে অথবা ইচ্ছাকৃত অথবা অন্যায় ক্ষতির জন্যে অধিক প্রদান করত হতো যা বীমা সেলামী বৃদ্ধিতে অসম্ভব রকম প্রভাবিত করত এবং প্রকারান্তরে বীমা বিষয়টিই হতো অসফল একটি কর্মোদ্যোগ।
তবে, সাধারণত : একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের অর্থের জন্যেই বীমাপত্র গ্রহণ করা হয়—তাই বলে তাকেই আবার ক্ষতি অথবা ক্ষতপুরণের পরিমাপক বলা যাবে না। এ অংকটি শুধুই সেই সর্বোচ্চ সীমা, যে পর্যন্ত দায়গ্রহীতা দায় বা ক্ষতিপূরণে দায়বদ্ধ থাকেন। প্রকৃতপক্ষে, ক্ষতি সংঘটিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পত্তির ক্ষতি সংঘটনের সময়ে বাজার মূল্যই বীমাদাবী হিসেবে প্রাপ্য অথবা প্রদেয়। অবশ্যি, যদি ৩। বীমাকৃতমূল্য বা অর্থের সীমার মধ্যে থাকে।
তবে, মূল্যায়িত বীমাপত্রের বেলায় এ নিয়ম প্রযোজ্য নয়। সেক্ষেত্রে, পূর্বেই সম্পত্তির মূল্য নির্ধারণ করে বীমাকৃত মূল্য ধার্য করা হয় এবং সামগ্রিক ক্ষতি হলে বীমাকৃত অর্থই হয় বীমাদাবী যদি তাতে পূর্বেই কোন প্রতারণা বা অস্বাভাবিক রকম বেশী বীমাকৃত মূল্য ধার্য না করা হয়ে থাকে। আর আংশিক ক্ষতি হলে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পত্তির বাজার মূল্যের সাথে বীমাকৃত মূল্যের সমন্বয় করে বীমাদাবী নির্ধারিত হয়। যদি বীমাকৃত মূল্য সাস্কার মূল্যের চেয়ে কম হয় তা হলে সেই তুলনায় কমদাবী আদায় করতে পারবে এবং বেশী হলে তুলনামূলকভাবে বেশী পাবে। তবে, তা কোন অবস্থাতেই বীমাকৃত অর্থের চেয়ে বেশী হতে পারবে না।
অগ্নিবীমায় ক্ষতিপুরণ প্রসঙ্গে ব্যাপক আলোচনায়— না গিয়ে সংক্ষেপে এ নীতির মূল কথা নিম্নরূপ বর্ণনা করা যায়—
(১) ক্ষতি হলেই ক্ষতিপূরণ পাওয়া যাবে;
(২) ক্ষতি যতটুকু হয়েছে ততটুকুই ক্ষতিপুরণ প্রাণ্য অথবা প্রদেয়
(৩) অতিরিক্ত কিছু আদায় করলে তা বীমাকারীর প্রাপ্য
(৪) বীমাকারী বীমাগ্রহীতাকে সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ করে দিলে তৎসম্পর্কিত কোন উদ্ধার বা প্রাপ্তিতে পরবর্তীতে পূর্বমালিক বা বীমাগ্রহীতার স্থলে বীমাকারী মালিকানা বা অধিকারে অভিষিক্ত হবেন যা স্থলাভিষিক্ততার নীতি হিসেবে আখ্যায়িত :
(৫) একাধিক বীমাকারীর সাথে একই বিষয়বস্তু বীমাকৃত হলে বীমাগ্রহীতা সকল বীমাকারীর কাছ থেকে প্রকৃত ক্ষতিই আদায় করতে পারবেন; তার বেশী নয়। তবে, কোন এক বীমাকারীর কাছ থেকেও সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ নিতে পারেন যখন অন্য বীমাকারীর কাছ থেকে ক্ষতিপুরণ প্রদানকারী বীমাকারী, আনুপাতিক অর্থ আদায় করে নিতে পারবেন।
(ii) সন্নিশ্বাস নীতি (Principle of good faith) :
অগ্নিবীমা চুক্তির ক্ষেত্রে সবিশ্বাস নীতি বীমাগ্রহীতা ও বীমাকারী বা দায়গ্রহীতা উভয়কেই পারস্পরিক কর্তব্য ও দায়-দায়িত্বে আবদ্ধ করে এবং তাদের একে অপরের উপর চূড়ান্ত সন্ধিশ্বাস রক্ষা করার জন্যেও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করে। সন্ধিশ্বাস নীতি অনুযায়ী উভয় পক্ষকেই প্রয়োজনীয় ও আত সকল প্রকৃত ও বাস্তব তথ্যাবলী প্রকাশ করতে বা জানতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হয়। তবে, বীমাগ্রহীতা যেহেতু বীমার বিষয়বস্তুর মালিক, তার পক্ষে বিষয়বস্তু সম্পর্কে সর্বাধিক তথ্য জানা স্বাভাবিক বলে তার উপরই অপেক্ষাকৃত বেশী দায়িত্ব বর্তায় প্রয়োজনীয় ও সর্বাধিক তথ্য সরবরাহের। কেননা, বিষয়বস্তুর জন্যেইতো বীমাচুক্তি গঠিত হয়।
বীমাকারী মূলতঃ এবং স্বাভাবিক কারণে বীমাগ্রহীতা কর্তৃক প্রস্তাবনাপত্রে (Proposal form) প্রদত্ত বিবৃতি থেকে ঝুঁকি সম্পর্কিত তথ্যাবলী সংগ্রহ করে থাকেন। বীমাকারী বা বীমা প্রতিষ্ঠান অথবা দায়গ্রাহক বীমাগ্রহীতা কর্তৃক প্রস্তাবনা পত্রে সরবরাহকৃত বিবৃতি ও তথ্যাবলীর ভিত্তিতেই বীমা সেলামীর পরিমাণ নির্ধারণ ও বীমাচুক্তি গঠন করেন। সুতরাং, বীমাগ্রহীতাকেই বাস্তব ঘটনা ও তথ্যাবলী স্বচ্ছ ও সম্যকভাব উপস্থাপন করতে হয়। যদি বিষয়বস্তু সম্পর্কে কোন তথ্য বীমাগ্রহীতা আতসারে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন রাখেন তাহলে চুক্তি র হয়ে যায় বিধায় বীমাকারী চুক্তির দায়-দায়িত্ব পালনে অস্বীকার করতে পারেন।

[ সাধারণ ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত বীমাগ্রহীতা কর্তৃক প্রদত্ত বিবৃতিকেই ঝুঁকি নির্ধারণের জন্যে বীমাকারী পর্যাপ্ত বলে ধরে নেন। তবে, কোন কোন জটিল ক্ষেত্রে বীমাকারীর জরীপকর্মী বা নির্বাহী দ্বারা বীমাগ্রহীতার সম্পত্তি বা বীমার বিষয়বস্তু পরীক্ষা করা হয়ে থাকে।]
চুক্তির মেয়াদ পর্যন্ত সদ্বিশ্বাস রক্ষা বা পালন করে চলা অত্যাবশ্যকীয়। বিষয়বস্তু বা ঝুঁকি সংক্রান্ত কোন পরিবর্তনও বীমাগ্রহীতা কর্তৃক বীমাকারী প্রতিষ্ঠানকে জানাতে হয়। বীমাগ্রহীতা বা তার প্রতিনিধিকে সম্ভাব্য ক্ষতি হ্রাসকল্পে সঙ্গত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়। যদি তার বিপরীত কোন আচরণ করেন যাতে ঝুঁকি বা ক্ষতির সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায় তা সবিশ্বাস ভঙ্গের সামিল কার্য বলে গণ্য হবে। প্রস্তাবনা পত্রে বিবৃতি প্রদান করা হয়ে গেলেই সবিশ্বাস রক্ষা বা পালনের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় বলে যদি মনে করা হয় তাহলে তা হবে ভ্রান্ত ধারণা।