আজকের আলোচনার বিষয় “অগ্নিবীমার প্রকারভেদ ” যা অগ্নিবীমা অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।জীবন-জীবিকার ক্ষেত্র প্রসারিত হওয়ার সাথে সাথে এবং ব্যবসা বাণিজ্যের আওতা ও পরিধি ব্যাপক এবং জটিলতর হওয়ার প্রেক্ষাপটে অগ্নিবীমার ক্ষেত্রও ক্রমাগত সাম্প্রসারিত হয়ে চলেছে। সেই সাথে নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত করে চলেছে। বীমাগ্রহীতার চাহিদা ও প্রয়োজন এবং সম্পদ-সম্পত্তি তথ্য বিষয়বস্তুর প্রকৃতি, মূল্য ও ঝুঁকির মাত্রাগত প্রভেদের কারণে নতুন নতুন ধরনের অগ্নিবীমাপত্রের উন্মেষ ঘটে চলেছে।
Table of Contents
অগ্নিবীমার প্রকারভেদ

নিম্নে এ যাবৎ উদ্ভাবিত ও প্রচলিত অগ্নিবীমাপত্রসমূহের প্রধান প্রধান কয়েকটি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়া হলো :
১। মূল্যায়িত বীমাপত্র ( Valued Policy):
বিভিন্ন ধরনের অগ্নিবীমাপত্রের মধ্যে একটি অন্যতম প্রকরণ হলো মূল্যায়িত বীমাপত্র। এ ধরনের বীমাপত্রের বেলায় বিষয়বস্তুর মূল্য আগে থেকেই নির্ধারিত বা নির্দিষ্ট হয়ে থাকে এবং বীমাকৃত সম্পত্তি পুরোপুরি নষ্ট কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত। হলে বীমাকারী বীমাগ্রহীতাকে উক্ত মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে বাধ্য থাকেন। এ ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার সময় সম্পত্তির মূল্যের প্রমাণপত্র দাখিল করতে হয়না।
বীমাপত্র গ্রহণ করার সময় মূল্যায়িত বীমাপত্রে বীমাকৃত সম্পদের মূল্য নির্ধারণ করা হয় এবং অগ্নি দ্বারা উক্ত সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বীমাকারীকে তার ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হয়। এ বীমাপত্রে ক্ষতিপুরণের মাপকাঠি হিসেবে বিনষ্ট সম্পদের বাজার মূল্যের উপর নির্ভর করা হয়। তাই, এ জাতীয় বীমাপত্রকে ক্ষতিপূরণের নীতির অনুবর্তী নয় বলে গণ্য করা হয়; বরং, একে জীবন বীমার ন্যায় ঘটনা সাপেক্ষে চুক্তি হিসেবে পরিগণিত করা হয়। বাস্তবে অগ্নিবীমায় মূল্যায়িত বীমাপত্রের প্রচলন তাই অপেক্ষাকৃত মে পরিলক্ষিত হয়।
এ বীমাপত্রের সুবিধে হলো এই যে এতে সম্পদ-সম্পত্তির মুল্যের প্রমাণপত্র দাখিল করতে হয় না, বীমাকারী ক্ষতিপূরণ সম্পর্কে আত থাকেন এবং নৈতিক বিপত্তির সম্ভাবনা বেশ কম থাকে। আর, প্রধান প্রধান অসুবিধাগুলো এই যে- এ বীমাপত্রের ক্ষতিপুরণের নীতি যথারীতি কার্যকর নয়, সেলামীর হার সাধারণতঃ বেশী হয়, আংশিক ক্ষতি নির্ণয় করা বস্তুতঃপক্ষে জটিলতাপূর্ণ এবং সম্পদ-সম্পত্তির মূলা বৃদ্ধি হলে নতুন সম্পত্তি ক্রয়ের ক্ষেত্রে বীমাগ্রহীতার স্বার্থ সংরক্ষিত হয় না।
২। অমূল্যায়িত বা মূল্য নির্ণেয় বীমাপত্র ( Unvalued or Valuable Policy) :
অ-মূল্যায়িত বীমাপত্র মূল্যায়িত বীমাপত্রের বিপরীত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। অর্থাৎ, অমূল্যায়িত বীমাপত্রে বীমাদারীর পরিমাণ ক্ষতিগ সম্পত্তির বাজারমূলে। নর্মারিত বা স্থিরীকৃত হয়। এ জাতীয় বীমাপত্রের বেলায় বীমাগ্রহণের আগে থেকে বিষয়বস্তুর মূল্য নিদ্ধারণ করা হয়না । বরং, পরবর্তীকালে নির্ধারণ করার ব্যবস্থা থাকে। এ রীমাপত্রে ক্ষতিপুরণের নীতি কার্যকর হয়।
৩। গড়পড়তা বীমাপত্র (Average Policy) :
বীমাগ্রহীতাদের সকলেই স্বভাবতঃ একই প্রয়োজন, চাহিদা ও মনোবৃত্তি বা প্রকৃতি সম্পন্ন নন। কেউবা কোন কারণে বা খেয়ালবশতঃ বীমার জন্যে প্রস্তাবিত বিষয়বস্তুর প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম মূল্যের বীমাপত্র গ্রহণ করেন, আবার কেউবা বাজারমূল্য বা প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশী মূল্যের বীমাপত্র গ্রহণ করতে পারেন। এখন, সঙ্গতকারণেই প্রশ্ন জাগে যে— ক্ষতি সংঘটিত হলে কি উক্ত উভয় ক্ষেত্রেই একই নিয়ম-নীতিতে ক্ষতিপূরণ দান করা হবে?
খুব স্বাভাবিক প্রয়োজনেই এ প্রশ্নের একটি যথার্থ সমাধানের পন্থা উদ্ভাবিত হয় যা গড়পড়তা নীতি বা পন্থা হিসেবে স্বীকৃত হয়। এ নীতি অনুযায়ী, কম মূল্যের বীমাগ্রহণ করলে সে অনুপাতে সমন্বিত করে ক্ষতিপূরণ নির্ধারিত হবে। অর্থাৎ, বিষয়বস্তুর বীমাকৃত মূল্য ও বাজার মূল্য বা প্রকৃত মূল্যের অনুপাত অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ বা বীমাদাবীর পরিমাণ সমন্বিত ও নির্ধারিত হবে।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে—বিষয়বস্তুর বীমাকৃত মূল্য যদি বাজার মূল্য বা প্রকৃত মূল্যের সমান হয় অথবা বেশী হয়, তাহলে উক্ত গড়পড়তা নীতি কার্যকর হয় না। তবে, কোন সম্পত্তির জন্যে একাধিক বীমাপত্র গ্রহণ করা হলে এবং তার যে কোন একটি বীমাপত্রে গড়পড়তা নীতি প্রযুক্ত থাকলেই প্রত্যেকটি বীমাপত্রে তা কার্যকর হয়।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্টতঃই প্রতীয়মান হয় যে—কোন বীমাগ্রহীতা সম্পত্তির প্রকৃত মূল্যাপেক্ষা কম মূল্যে বীমা করলে পরোক্ষভাবে তাকে শাস্তিদানের উদ্দেশ্যেই এ বীমাপত্রের প্রবর্তন হয়েছে। কেননা, এরূপ ক্ষেত্রে বীমাগ্রহীতা বীমাকারীর কাছ থেকে সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারবেন না।এ বীমাপত্রের সুবিধে হচ্ছে এই যে—এরূপ বীমাপত্র নৈতিক ঝুঁকি হ্রাস করে এবং কমতি বা অব-বীমার জন্যে বীমাগ্রহীতাকে শাস্তি দিয়ে বীমাকারীর স্বার্থ রক্ষা পায়।
আর, অসুবিধে হলো যে—এতে ক্ষতিপূরণের নীতি পূর্ণ অনুসৃত হয় না এবং এক্ষেত্রে হিসেব কিছুটা জটিলতাপূর্ণ।
৪। বিনির্দিষ্ট বীমাপত্রঃ
নির্দিষ্ট সম্পত্তির নির্দিষ্ট পরিমাণ মূল্যের কথা উল্লেখ থাকে। বীমার বিষয়বস্তুর পূর্ণমূল্যের বীমা করা হোক আর না হোক… ক্ষতি হলে বীমাকারী চুক্তিতে উল্লেখিত পরিমাণ ক্ষতিপুরণ দিয়ে থাকেন। কোন অবস্থায় কোম্পানী ঐ নির্দিষ্ট অর্থের বেশী বা কম প্রদান করতে পারেন না। যেমন : ১৫ হাজার টাকার সম্পত্তির ১০ হাজার টাকার অগ্নি বীমাপত্র গ্রহণ করা হলো। অগ্নিকাণ্ডের ফলে যদি ক্ষতির পরিমাণ হাজার হয়, তাহলেও তিনি ক্ষতিপূরণ ঐ ১০,০০০ টাকাই পাবেন। মোট কথা, বিনির্দিষ্ট বীমাপত্রের ক্ষেত্রে ক্ষতিপুরণের সীমা নির্ধারিত থাকে। তাই, প্রকৃত ক্ষতিপূরণের সাথে এর কোন সম্পর্ক থাকে না ।
এ বীমাপত্রের সুবিধে হচ্ছে এই যে—এতে গড়পড়তা নীতি প্রযুক্ত হয় না, মূল্যায়নের সমস্যা দেখা দেয়না এবং চুক্তির দু’পক্ষই ক্ষতিপুরণের পরিমাণ আগে থেকে জানেন। আর অসুবিধে হচ্ছে যে প্রকৃত ক্ষতি বেশী হলে বীমাগ্রহীতা তা আদায় করতে পারেন না এবং সামগ্রিক ক্ষতির ক্ষেত্র ব্যতীত কমতি বা অব-বীমার জন্যে এধরনের বীমাপত্রে বীমাগ্রহীতাকে ক্ষতিপুরণ কম পাওয়ার ক্ষতি স্বীকার করতে হয় না।
৫। ভাসমান বীমাপত্র (Floating Policy):
এ ধরনের বীমাপত্র একাধিক স্থানে বা রক্ষিত পণ্য বা সম্পত্তির জন্যে গ্রহণ করা হয়। যদি একই মালিকের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যমান সম্পত্তির জন্যে একটি বীমাপত্র ক্রয় করা হয়, তাহলে তাকে ভাসমান বীমাপত্র বলা হয়। আসলে ভাসমান বীমাপত্র সাধারণতঃ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় থাকা সম্পদ-সম্পত্তির নিরাপত্তার জন্যে গ্রহণ করা হয়। অনেক সময় দেখা যায় যে, উৎপাদনকারী কিংবা বড় বড় কারবারীদের পণ্যদ্রব্যের কতক অংশ কারখানায়, কিছু বন্দরে, কিছু ডকে, কিছু গুদামে এবং আরও নানা জায়গায় বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে থাকে।
এরূপ ক্ষেত্রে পণ্য মালিকের পক্ষে বিভিন্ন জায়গায় রক্ষিত বা স্থিত পণ্যের জন্যে আলাদা আলাদা বীমাপত্র গ্রহণ করা হয়। বীমা প্রতিষ্ঠান প্রত্যেকটি স্থানে রক্ষিত পণ্যে আলাদা আলাদা সেলামী নির্ধারণ করে পরে মোট সেলামীর গড়-নির্ণয় করে সাকল্য সেলামী ধার্য করে থাকে।এ বীমাপত্রের সুবিধে হলো—এখানে মজুদপণ্যের হ্রাস-বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এ ধরনের বীমা কার্যকরী হয় এবং বীমাগ্রহীতা একাধিক পণ্য বা বিক্ষিপ্তভাবে অবস্থিত পণ্যের বীমা করার বিশেষ সুবিধে লাভ করে থাকেন।আর, অসুবিধে হলো যে—গড় সেলামী বের করা জটিলতাপূর্ণ এবং কোন কোন পণ্যের ক্ষেত্রে বিশেষ ধরনের শর্ত প্রযুক্ত হয়।
৬। বাড়তি বীমাপত্র ( Excess Policy) :
যে সকল কারবারীর মজুদ মালের পরিমাণ নির্দিষ্ট থাকে না, বরং সব সময় এর হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে, তাদের বেলায় বাড়তি বীমাপত্র উপযোগী। এক্ষেত্রে বীমাগ্রহীতা, যে পরিমাণ মজুদ পণ্য তার কাছে সর্বদা থাকে, তার জন্যে একটা সাধারণ বীমাপত্র এবং বাড়তি বা অতিরিক্ত পরিবর্তনশীল পণ্যের জন্যে অন্য একটি বীমাপত্র গ্রহণ করেন। অভিজ্ঞতার আলোকে বীমাগ্রহীতা, পণ্যের মজুদ কখনও যে পরিমাণের নীচে যাবে না বলে মনে করেন, তার জন্যে একটি বীমাপত্র গ্রহণ করেন মজুদ পণ্যের ঐ সর্বনিম্ন পরিমাণের অতিরিক্ত বা বাড়তি অংশ বাবদ।
বাড়তি মজুদ পণ্যের প্রকৃত মূল্য প্রতি মাসে ঘোষণা করতে হয়। পরে এ সমস্ত ঘোষণার মাসিক গড় বের করে প্রিমিয়াম নির্ণয় করা হয়। এভাবে একই মজুদ পণ্যের জন্যে দু’টি বীমাপত্র গ্রহণ করা হয়। প্রথমোক্ত বীমাপত্রটিকে প্রথম ক্ষতির বীমাপত্র এবং পরের বীমাপত্রটিকে বাড়তি বীমাপত্র হিসেবে অভিহিত করা হয়।বীমাগ্রহীতার জন্যে এ ধরনের বীমাপত্র বেশ লাভজনক।
৭। ঘোষণাযুক্ত বীমাপত্র ( Declaration Policy) :
এ জাতীয় বীমাপত্র বাড়তি বীমাপত্রের অসুবিধাসমূহ দূরীভূত করার নিমিত্তে প্রবর্তিত হয়েছে। এ বীমাপত্রে, মজুদপণ্য যে কোন সময় বৃদ্ধি পেয়ে যতটুকু পর্যন্ত হতে পারে –এরুপ সর্বাধিক/সর্বোচ্চ বীমাকৃত মূল্যের উল্লেখ থাকে। বীমাকৃত মূল্যের উপর সাময়িকভাবে প্রিমিয়ামের একটা অংশ, সাধারণতঃ শতকরা ৭৫ ভাগ, চুক্তি গ্রহণকালে প্রদান করতে হয়। নির্দিষ্ট সময়ান্তে, সাধারণতঃ মাসান্তে, বীমাগ্রহীতাকে তার প্রকৃত মজুদ পণ্যের পরিমাণ বীমাকারীর কাছে ঘোষণা করতে হয় এবং বার মাসের ঘোষণার একটা গড় বীমা বছরের শেষে বের করা হয়।
আর, ঐ গড় পরিমাণের উপর ভিত্তি করে বীমাকিস্তি নির্ণয় করা হয়। এভাবে অগ্রিম প্রদত্ত প্রিমিয়াম অপেক্ষা যদি নির্ণীত প্রিমিয়াম কম হয়, তাহলে বীমাগ্রহীতা তা ফেরৎ পাবেন; আর, যদি তা বেশী হয়, তবে যত টাকা বেশী হয়, ঠিক তত টাকা বীমাকারীকে দিতে হয়। ঘোষণাকৃত বীমাপত্র বড় বড় উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ীগণ, যাদের মজুদ পণ্যের পরিমাণ বিপুল ও পরিবর্তনশীল, তারা গ্রহণ করে বেশ সুবিধা লাভ করতে পারেন।
৮। সমন্বয়যোগ্য বীমাপত্র ( Adjustable Policy):
সমন্বয়যোগ্য বীমাপত্র বিভিন্ন প্রকার অগ্নিবীমার মধ্যে অন্যতম একটি বীমাপত্র। এ ধরনের ক্ষেত্রে বীমাপত্রের বীমাকৃত মূল্য বীমাপত্র গ্রহণকালে প্রকৃত মজুদ পণ্যের মূল্যের সমান হবে। এ মূল্যানুযায়ী বীমাকিত্তি নির্ধারণ করা হয় এবং তা শুরুতেই প্রদান করা হয়। বীমাগ্রহীতার মজুদ পণ্যের পরিমাণ হ্রাস-বৃদ্ধি হলে, তা ঘোষণাপত্র দ্বারা বীমাকারীকে অবহিত করতে হবে এবং বীমাকারী উক্ত ঘোষণা মোতাবেক বীমাকিস্তির পরিমাণ হ্রাস-বৃদ্ধি করবেন। যতবার মজুদ পণ্য পরিবর্তিত হবে, ঠিক ততবারই বীমার্কিত্তি সমন্বয়ের বা পুনর্বিন্যাসের দরকার হয়।
সাধারণতঃ বীমাপত্রের মেয়াদস্ত বীমাকিস্তির হিসেব চূড়ান্ত করা হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, বীমাগ্রহীতা প্রথমে মজুদ পণ্যের মূল্যের সমান একটি সাধারণ বীমাপত্র গ্রহণ করেন এবং পরে মজুদ পণ্য হ্রাস-বৃদ্ধি পেলে তা বীমার অন্তর্ভুক্ত করেন। এজন্যে এ বীমাপত্রে ঘোষণাকৃত মূল্যের উপর নির্ভর করে বীমাকারীর দায়। আর তাই, ঘোষণাকৃত বীমাপত্র বীমাগ্রহীতার বেলায় বহুবিধ সুবিধাজনক হলেও তা বীমাকারীর কাছে ততটা আকর্ষণীয় নয়। এ জাতীয় বীমাপত্রে অসৎ স্বভাবের বীমাগ্রহীতার দয়ার উপর বীমাকারীকে অনেকটা নির্ভর করতে হয়।
৯। বাট্টাযুক্ত সর্বাধিক মূল্যের বীমাপত্র ( Maximum value with discount Policy) :
এ প্রকার বীমাপত্র মোতাবেক সারা বছরের জন্যে মজুদ পণ্যের সর্বোচ্চ মূল্যের বীমা করা হয় এবং সে মূল্যানুযায়ী প্রিমিয়াম দিতে হয়। বছরান্তে মজুদ পণ্যের মূল্যের হ্রাস-বৃদ্ধির জন্যে বাট্টা হিসেবে প্রদত্ত এক তৃতীয়াংশ বীমাকিত্তি বীমাগ্রহীতাকে ফেরৎ দেয়া হয়। এভাবে এ জাতীয় বীমাপত্রে ঘোষণার ঝামেলা পরিহার করা যায় এবং সর্বাধিক মূল্যের সহজ বীমা গ্রহণ করা যায়। আসলে বাট্টাযুক্ত সর্বোচ্চ মূল্যের বীমাপত্র গ্রহণ করার পর বীমাগ্রহীতাকে যে বারবার ঘোষণাপত্র পেশ করতে হয় ও বীমাকারীকে পুনঃসমন্বয় বা পুনর্বিনাস করতে হয়, এরূপ জটিল কর্মকাণ্ড থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্যেই এ ধরনের বীমাপত্র উদ্ভাবিত হয়েছে। ব্যবসার নিয়মানুযায়ী কয়েক ধরনের পণ্য দ্রব্যের জন্যেই কেবল এ প্রকার বীমাপত্র প্রদান করা হয়।
১০। পুনঃস্থাপন বীমাপত্র ( Re-instalment or Replacement Policy) :
এ প্রকার বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে চালু হয়েছে। যে বীমাপত্রে অগ্নিকাণ্ডের ফলে বীমাকৃত সম্পত্তি নষ্ট হয়ে গেলে তার জন্যে কোন ক্ষতিপূরণ না দিয়ে যদি উক্ত সম্পত্তি পুনরায় প্রতিস্থাপন Replacement) করার জন্যে বীমাকারী প্রতিশ্রুতি দেন, তাকে পুনঃস্থাপন বীমাপত্র বলা হয়। এ ধরনের বীমাপত্রে বীমাকারী, অগ্নি দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বীমাগ্রহীতার সম্পত্তির পুনঃস্থাপনের সম্পূর্ণ ব্যয় পরিশোধ করবার দায় গ্রহণ করেন।
অনেক ক্ষেত্রে বীমাকারী সম্পত্তি প্রতিস্থাপনের বা তদরুন প্রয়োজনীয় অর্থ প্রদানের অধিকার বীমাপত্রে সংরক্ষিত করে রাখে। পুনঃস্থাপন বীমায় বীমাগ্রহীতা পুরোনো সম্পত্তির বদলে নতুন সম্পত্তি অর্জন করেন বিধায় একে পুরোনো প্রদীপের বদলে নতুন প্রদীপ বীমাপত্র (New lamp for the old policy) বলা হয়। এ ধরনের বীমাপত্র কেবলমাত্র যন্ত্রপাতি ও দালান কোঠার জন্যে প্রদান করা হয়ে থাকে। পুনঃস্থাপন বীমার সাথেও গড়পড়তা ধারার সংযুক্তি থাকে।
১১। মুনাফাহানির অগ্নিবীমাপত্র/আনুষঙ্গিক ক্ষতি বীমাপত্র (Loss of Profit Policy / Consequential Loss Insurance) :
অগ্নি- দুর্ঘটনার দরুন সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ ছাড়াও উক্ত সম্পত্তি নষ্ট হওয়ার কারণে ব্যবসায় বন্ধ হয়ে যে মুনাফা হানি হয়, সে পরিমাণ মুনাফার ক্ষতিপূরণের জন্যে যে বীমাপত্র গ্রহণ করা হয়, তাক মুনাফা হানির অগ্নিবীমাপত্র বা আনুষঙ্গিক ক্ষতি বীমাপত্র বলা হয়।
এ বীমাপত্র সাধারণতঃ বীমাগ্রহীতার প্রকৃত মুনাফা হানি হওয়া, বকেয়া খরচ পরিশোধ না করার ক্ষতি (যথা-ঋণপত্রের বকেয়া সুদ, বকেয়া মাহিনা, কর বা Tax) ইত্যাদির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা প্রদান করে। এ ধরনের বীমাপত্রের অসুবিধা হচ্ছে এইযে, যেহেতু, বীমাগ্রহীতা অধিক পরিমাণ ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারেন, তার অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কে কিছুটা অসতর্ক হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। এ ছাড়াও এর আর একটি অসুবিধে হলো এই যে, এর দ্বারা বীমাগ্রহীতার ব্যবসায়ের গোপনীয়তা ফাঁস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
১২। সম্মিলিত বীমাপত্র/সার্বিক বীমাপত্র ( Combined Policy/Comprehensive Policy) :
অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রকার ঝুঁকির জন্যে একটি বীমাপত্রের দ্বারা বীমা করা হয়ে থাকে। এ জাতীয় বীমাপত্র সম্মিলিত বীমাপত্র বা সার্বিক বীমাপত্র নামে পরিচিত। তবে, সার্বিক শব্দের অর্থ এই নয় যে, সকল প্রকার ঝুঁকি এ ধরনের বীমাপত্রে গ্রহণ করা হয়। এ প্রকার বীমাপত্রেও বহু ধরনের ব্যাতিক্রম ও বিয়োজন ধারা সংযুক্ত থাকে।
সাধারণতঃ এ ধরনের বীমাপত্র আবাসিক গৃহ থেকে শুরু করে অগ্নিকাণ্ডের কারণে চুরি, ভৃত্য ও কর্মীদের দ্বারা দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিসমেত গৃহের সব ধরনের ক্ষতির জন্যে গ্রহণ করা হয়ে থাকে। জাতীয় বীমাপত্রে বহু ধরনের ঝুঁকি অন্তর্ভুক্ত থাকে বিধায় একে “সর্বময় বা সার্বিক বীমাপত্র All in policy) বলেও অভিহিত করা হয়।
১৩। ছাউনী বীমাপত্র ( Blanket Policy) :
ছাউনী বীমাপত্র বা ভলঅনকএট ফলইচা বীমাক ও বীমাগ্রহীতা উভয়ের জন্যেই অনুপযোগী এবং বীমা ব্যবসায়ের স্বার্থ বিরোধী। কোন একটি বীমাপত্রের দ্বারা যদি বিভিন্ন ধরনের বিষয়বস্তু বীমাকৃত করা যায়, তাহলে সে বীমাপত্রকে ছাউনী বীমাপত্র বলে।
দৃষ্টান্তস্বরূপ, কোন লোকের কয়েকটি বাড়ী এবং সেগুলোর মধ্যে রক্ষিত বিভিন্ন ধরনের আসবাবপত্র, পণ্যসামগ্রী, যন্ত্রপাতি প্রভৃতি কোন একটি বীমাপত্রের মাধ্যমে যদি বীমাকৃত হয়, তাহলে উক্ত বীমাপত্রই ছাউনী বীমাপত্র হিসেবে অভিহিত হয়। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, একটি মাত্র বীমাপত্র সকল প্রকার বিষয়গুকে কমলের মত আচ্ছাদিত করে রাখে বিধায় এর এরূপ নামকরণ করা হয়েছে।
১৪। অগ্নি-নিবারকী বিকল বীমাপত্র ( Sprinkler Leakage Polley) :
অগ্নি-নিবারকী যন্ত্র অনেক অট্টালিকায় ব্যবহার করা হয় এবং অগ্নিসংঘটিত হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়। আকস্মিভাবে স্বয়ংক্রিয় অগ্নি নিবারকী যন্ত্রাদি বিকল হয়ে তা থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে বীমাকৃত সম্পত্তি (দালান কোঠা বা এর অভ্যন্তরস্থ পণ্যসামগ্রী কিংবা উভয়টিই) ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। উক্ত ক্ষতির ক্ষতিপুরণ আদায় করার জন্যে এ ধরনের বীমাপুত্র গ্রহণ করা হয়।

মোটামুটিভাবে, এগুলোই হচ্ছে অগ্নিবীমার প্রধান প্রধান প্রকারভেদ। তবে, স্থানিক চাহিদা ও প্রাতিষ্ঠানিক সাতন্ত্র্য অনুযায়ী এসব বীমাপত্রের কিছুটা প্রকৃতিগত ও আবহারিক হরফের হতে পারে।
