দেশের বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) সম্প্রতি ‘আইডিআরএ ইন্স্যুরেন্স এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০২৫’ প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে। তবে এই তালিকায় এমন একটি প্রতিষ্ঠানের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে যার গত তিন বছরের আর্থিক কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে কোনো ইতিবাচক সূচক খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রতিষ্ঠানটি হলো ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স পিএলসি। প্রিমিয়াম আয়, নিট মুনাফা, বিনিয়োগ এবং রিজার্ভ ফান্ড—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কোম্পানিটির অবস্থান ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী হওয়া সত্ত্বেও আইডিআরএ একে ‘অসাধারণ পারফরম্যান্স’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। এই সিদ্ধান্ত বীমা খাতের স্বচ্ছতা ও পুরস্কারের মর্যাদা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তুলেছে।
Table of Contents
ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী আর্থিক সূচক
ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্সের গত কয়েক বছরের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২২ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কোম্পানিটির প্রতিটি প্রধান সূচকে ধস নেমেছে। ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটির মোট প্রিমিয়াম আয় ছিল ১১৮ কোটি ৬২ লাখ টাকা, যা ২০২৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৯৪ কোটি ৭ লাখ টাকায়। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটি প্রায় ২০.৭০ শতাংশ আয় হারিয়েছে।
ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্সের গত তিন বছরের তুলনামূলক আর্থিক চিত্র:
| সূচকের নাম | ২০২২ সালের চিত্র | ২০২৪ সালের চিত্র | পরিবর্তনের হার/পরিমাণ |
| মোট প্রিমিয়াম আয় | ১১৮.৬২ কোটি টাকা | ৯৪.০৭ কোটি টাকা | ২০.৭০% হ্রাস |
| নিট মুনাফা (কর পরবর্তী) | ১৩.৬৮ কোটি টাকা | ৮.৯৫ কোটি টাকা | ৩৪.৫৮% হ্রাস |
| মোট বিনিয়োগ | ৮৭.৫৭ কোটি টাকা | ৭৪.৪৯ কোটি টাকা | ১৪.৯৪% হ্রাস |
| রিজার্ভ ফান্ড | ১১৬.৯০ কোটি টাকা | ১০৮.৬৩ কোটি টাকা | ৮.২৭ কোটি টাকা হ্রাস |
| বীমা দাবি পরিশোধ | ৩৭.৯০ কোটি টাকা | ১৮.৭৯ কোটি টাকা | ৫০.৪২% হ্রাস |
| শেয়ার প্রতি আয় (EPS) | ১.৬৩ টাকা | ১.০৭ টাকা | উল্লেখযোগ্য অবনতি |
| শেয়ারের বাজারমূল্য | ২৪.৪০ টাকা | ১৯.৫০ টাকা | ২০.০৮% পতন |
গ্রাহক আস্থা ও বাজার মূলধনে নেতিবাচক প্রভাব
একটি বীমা কোম্পানির সক্ষমতা যাচাইয়ের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হলো গ্রাহকের বীমা দাবি পরিশোধের হার। ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্সের ক্ষেত্রে এই চিত্রটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ২০২২ সালে কোম্পানিটি ৩৭ কোটি ৯০ লাখ টাকার দাবি মিটিয়েছিল, অথচ ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকায়। দাবি পরিশোধের এই নিম্নমুখী প্রবণতা গ্রাহকসেবার মান ও আস্থার ক্ষেত্রে নেতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে। পুঁজিবাজারেও কোম্পানিটির শেয়ারের বাজারমূল্য এবং নিট সম্পদ মূল্য (NAV) ধারাবাহিকভাবে কমছে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইডিআরএ-র বিতর্কিত তালিকা ও পুরস্কারের ঘোষণা
বীমা খাতে শৃঙ্খলা ও ইতিবাচক ইমেজ তৈরির লক্ষ্যে আইডিআরএ লাইফ ও নন-লাইফ খাতের মোট ১৩টি প্রতিষ্ঠানকে এই পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত ১৮ জানুয়ারি সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক মনিরা বেগম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তালিকা প্রকাশ করা হয়।
পুরস্কারপ্রাপ্ত শীর্ষ কোম্পানিগুলোর তালিকা:
নন-লাইফ খাত: প্রথম স্থানে প্রগতি ইন্স্যুরেন্স, দ্বিতীয় স্থানে সাধারণ বীমা করপোরেশন এবং তৃতীয় স্থানে রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স। যৌথভাবে পঞ্চম স্থানে রয়েছে ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স, সেনা ইন্স্যুরেন্স এবং ইউনাইটেড ইন্স্যুরেন্স।
লাইফ খাত: প্রথম স্থানে আমেরিকান লাইফ ইন্স্যুরেন্স (মেটলাইফ), দ্বিতীয় স্থানে প্রগতি লাইফ এবং তৃতীয় স্থানে ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স।
খাত সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, প্রগতি বা রিলায়েন্সের মতো শক্তিশালী ও প্রবৃদ্ধিশীল কোম্পানির তালিকায় ইস্টল্যান্ডের মতো দুর্বল আর্থিক ভিতের কোম্পানি কীভাবে স্থান পেল?
দায়িত্বশীলদের নিরবতা
পুরস্কার প্রদানের এই বিতর্কিত মানদণ্ড সম্পর্কে জানতে আইডিআরএ-র মুখপাত্রের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি। একইভাবে ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সেলিমকেও মুঠোফোনে এবং খুদে বার্তার মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
উপসংহার
দেশের বীমা খাত যখন গ্রাহক আস্থার চরম সংকটে ভুগছে, তখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার এমন অসামঞ্জস্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত খাতের স্বচ্ছতাকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। আর্থিক সূচকে ক্রমাগত অবনমন ঘটা একটি প্রতিষ্ঠানকে ‘সুশাসনের’ দোহাই দিয়ে ‘এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান আদতে ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের মূল্যায়নকে ম্লান করে দিচ্ছে।
