এশিয়ার বীমা খাতে বদলে যাচ্ছে অগ্রাধিকারের চিত্র

এশিয়ার বীমা খাতে চলতি সপ্তাহে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা সামনে এসেছে। ব্যক্তিগত আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, বীমা খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার নিয়ে নতুন প্রশ্ন, প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত আর্থিক ঝুঁকি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নতুন উদ্যোগ—সব মিলিয়ে ২৩ থেকে ২৬ জুন সময়কালে শিল্পখাতটি ছিল বেশ আলোচনায়।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে এশিয়ার ভোক্তাদের মানসিকতায়। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, আগের তুলনায় উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পদ পাওয়ার চেয়ে ব্যক্তিগত আর্থিক সক্ষমতা ও স্বনির্ভরতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন মানুষ। ২০২৬ সালের ম্যানুলাইফ এশিয়া কেয়ার সার্ভে অনুযায়ী, জীবনের শেষ পর্যায়ে গড়ে ১৩ থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত অনেকেরই পরিচর্যা বা আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে বলে অংশগ্রহণকারীরা ধারণা দিয়েছেন।

ফেব্রুয়ারি ও মার্চ ২০২৬ সালে পরিচালিত এ জরিপে এশিয়ার নয়টি বাজারের ৯ হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক অংশ নেন। জরিপের ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, দীর্ঘায়ু, স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়ের বৃদ্ধি এবং অবসর-পরবর্তী আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ মানুষের পরিকল্পনায় বড় প্রভাব ফেলছে। ফলে বীমা ও দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ভিত্তিক আর্থিক পণ্যের প্রতি আগ্রহও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

করপোরেট পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ঘোষণা এসেছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক ইনকাম ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড জানিয়েছে, তাদের ডিজিটাল বীমা প্ল্যাটফর্ম ‘হাইভ’ (HIVE)-এর ব্যবসা এমবেড ফিন্যান্সিয়াল গ্রুপ হোল্ডিংস প্রাইভেট লিমিটেডের কাছে হস্তান্তর করা হবে। ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে এই লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। যদিও আর্থিক চুক্তির মূল্য প্রকাশ করা হয়নি, তবে এমবেড ফিন্যান্সিয়াল গ্রুপ সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে তালিকাভুক্তির প্রস্তুতির অংশ হিসেবে একটি বিশেষ উদ্দেশ্যভিত্তিক অধিগ্রহণ কোম্পানির (SPAC) সঙ্গে ব্যবসায়িক সমঝোতা করেছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাব্য ইকুইটি মূল্য প্রায় ৪২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হিসেবে ধরা হয়েছে।

এদিকে বীমা খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বাজার নিয়ে প্রকাশিত ২০২৬ সালের মে মাসের এআই সার্চ ভিজিবিলিটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এআই-ভিত্তিক সার্চ প্ল্যাটফর্মে করা নির্দিষ্ট ও বিস্তারিত বীমা-সংক্রান্ত প্রশ্নের প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে কোনো বীমা প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ডের নাম উল্লেখ করা হয়নি। ব্র্যান্ড পর্যবেক্ষণ প্রতিষ্ঠান সোমন্ত্রা গুগলের এআই ওভারভিউ এবং চ্যাটজিপিটিসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ২০টি অস্ট্রেলীয় বীমা ব্র্যান্ডকে ঘিরে ৩৪ হাজার ২৭৮টি গ্রাহক আলাপ বিশ্লেষণ করে এই তথ্য প্রকাশ করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা দেখাচ্ছে যে কেবল প্রচলিত অনলাইন উপস্থিতি নয়, বরং এআই-নির্ভর তথ্য অনুসন্ধান ব্যবস্থায়ও নিজেদের দৃশ্যমানতা বাড়ানো এখন বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

অন্যদিকে, পর্যাপ্ত বীমা সুরক্ষার অভাব যে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে, সে বিষয়েও নতুন সতর্কবার্তা এসেছে। মুডিজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে আগামী দুই দশকে বিমাবিহীন ক্ষতির পরিমাণ ৪১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

প্রতিবেদনটি আরও উল্লেখ করেছে, অর্থনৈতিক মোট ক্ষতির তুলনায় বীমা কোম্পানিগুলোর পরিশোধিত অর্থের যে ঘাটতি তৈরি হয়, সেটিই ‘ইনস্যুরেন্স প্রোটেকশন গ্যাপ’। এই ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে এবং এটি বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি কাঠামোগত ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোও এআই ব্যবহারের ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস কমিশন হালনাগাদ এআই নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। নতুন কাঠামোতে প্রতিযোগিতায় সমতা বজায় রাখা, তথ্য ব্যবহারে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সাইবার নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি মোকাবিলাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

একই সময়ে সিঙ্গাপুরের মনিটারি অথরিটি অব সিঙ্গাপুর (এমএএস) বীমা খাতের জন্য ‘প্রোটেক্টেড সেল কোম্পানি’ (পিসিসি) নামে নতুন করপোরেট কাঠামো চালুর বিষয়ে পরামর্শ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। এই কাঠামোর মাধ্যমে একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে পৃথক ‘সেল’-এ বিভিন্ন সম্পদ ও দায় আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা যাবে। ফলে বিকল্প ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর ও নমনীয় হবে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকেরা।

সব মিলিয়ে চলতি সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করেছে যে, এশিয়ার বীমা খাত এখন কেবল নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। পরিবর্তিত ভোক্তা চাহিদা, জলবায়ুজনিত ঝুঁকি, ডিজিটাল রূপান্তর এবং আধুনিক নিয়ন্ত্রক কাঠামো—সবকিছু মিলিয়ে শিল্পটি একটি নতুন বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

মন্তব্য করুন