ঝুঁকির ক্ষেত্রে জীবন বীমা

ঝুঁকির ক্ষেত্রে জীবন বীমা – পাঠটি “বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা” বিষয়ের “জীবন বীমা” অধ্যায়ের একটি পাঠ। বলাবাহুল্য যে, সম্পত্তি বীমা (নৌ ও অগ্নিবীমা) সংক্রান্ত চুক্তিসমূহই মূলতঃ ক্ষতিপুরণের চুক্তি হিসেবে পরিগণিত। জীবন বীমার চুক্তিকে ক্ষতিপূরণের চুক্তি হিসেবে গণ্য করা হয় না। কেননা, জীবনের ক্ষতি নিরূপণ করা প্রকৃতপক্ষে এবং স্বার্থভাবে সম্ভবপর নয়। কিন্তু, তা সত্ত্বেও অনেকে প্রতিপাদ্য বিষয়টি জীবন বীমা অধ্যায়ে চিহ্নিত করে থাকেন বলেই জীবন বীমা চুক্তি করার আগে যেসব বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়, সেসব সম্পর্কেই প্রথমে এবং পরবর্তীতে মূল দু’টি সম্পত্তি বীমার ক্ষেত্রে সংক্ষিপ্ত আলোচনা প্রদান করা হলো।

[ অন্যথায়, সমধিক বোধভ্রান্তির সৃষ্টি হতে পারে। তবে, প্রসঙ্গতঃ মনে রাখা প্রয়োজন যে, সম্পত্তি বীমার ক্ষেত্রে ক্ষতিপুরণ ও দাবীপুরণ শব্দ দু’টি দ্বিধাহীনভাবে একাধারে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু, জীবন বীমার ক্ষেত্রে দাবীপুরণ শব্দটিই কেবল প্রযোজ্য। অবশ্য, জীবন বীমায় ক্ষতিপূরণ কথাটি ব্যবহার না করেও ঝুঁকি গ্রহণের আগে যেসব বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করা হয়ে থাকে, সে সম্পর্কে আলোচনা করা হলো ]

ঝুঁকির ক্ষেত্রে জীবন বীমা

ঝুঁকির ক্ষেত্রে জীবন বীমা | ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা | বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা

 

জীবন বীমার ক্ষেত্রে In case of Life Insurance:

জীবন বীমার চুক্তিতে ঝুঁকি গ্রহণের সময় বীমাকারী কতকগুলি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করে থাকেন যা সংক্ষেপে নিম্নরূপ :

১। বীমাগ্রহীতার বয়স (Age of proposed Insured) :

বীমাচুক্তি করার আগেই বীমাকারী বীমাগ্রহীতার বয়স সম্পর্কে জেনে নিবেন। কেননা, ঝুঁকি সেলামী নির্ধারণের জন্যেএকটি অন্যতম বিবেচ্য বিষয়। দশ বছর পর্যন্ত এবং পঞ্চাশ বছর বয়সের উপরের মানুষের মৃত্যুর সম্ভাবনা স্বভাবতঃই বেশী; পক্ষান্তরে, এর মধ্যবর্তী বয়সের মানুষের মৃত্যুর সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম থাকে। সুতরাং, বয়সের ব্যাপারে বীমাগ্রহীতাকে অবশ্যই জেনেশুনে নিতে হবে।

 

২। শারীরিক গঠন (Bulld) :

শারীরিক গঠন বলতে মূলত উচ্চতা, ওজন, ওজনের বন্টন এবং বুকের ব্যাপ্তীকে বুঝায়। অসামঞ্জস্য ওজন প্রায়শঃই শরীরের কোন গোপন ব্যাধি বা অসুস্থতা নির্দেশ করে। তেমনিভাবে শারীরিক গঠন মানুষের সুস্থতা বা অসুস্থতার নির্দেশবহ বলে এ বিষয়ে বীমাকারীকে সাবধান হতে হয়।

 

৩। স্বাস্থ্যগত অবস্থা (Physical condition) :

প্রস্তাবিত বীমাগ্রহীতার স্বাস্থ্যগত অবস্থা বীমাকারীর জন্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা, বীমাগ্রহীতার দৃষ্টিশক্তি, হাতযন্ত্র, কিডনী, ফুসফুস ইত্যাদির অবস্থা খারাপ হলে, সে অসুস্থ হয়ে পড়ে –তার আয়ুষ্কাল হয়ে যায় অনিশ্চিত। একজন সুস্থদেহী মানুষের জীবনের চেয়ে এরূপ অসুস্থ ব্যক্তির জীবন অনেক বেশী ঝুঁকিপূর্ণ। সুতরাং, এ বিষয়ে বীমাকারীকে অবশ্যই সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়।

 

৪। ব্যক্তিগত বিবরণ (Personal History) :

কোন প্রস্তাবিত বীমাগ্রহীতার ব্যক্তিগত বিবরণ থেকে তার মৃত্যুর সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রায়শঃই একটি পূর্ব ধারণা নেয়া যায়। নিম্নলিখিত বিষয়গুলি ব্যক্তিগত বিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে :-

(ক) স্বাস্থ্যগত বিবরণ (Health Record) অতীত অভ্যাস (Past Habits)

(খ) বীমা সম্পৰ্কীয় ইতিবৃত্ত (Insurance History) এবং

(গ) পেশাগত ইতিবৃত্ত (History of occupation) 

 

উপরোক্ত বিষয়গুলি বিশ্লেষণ করলেই কোন ব্যক্তির আয়ুষ্কাল সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। সুতরাং, বীমাগ্রহীতার ব্যক্তিগত জীবনের নিম্নোক্ত বিষয়গুলি সম্পর্কে বীমাকারীকে অবশ্যই সাবধান হতে হয় :-

 

৫। পারিবারিক ইতিবৃত্ত (Family History) :

কোন পরিবারের ইতিবৃত্ত থেকেও সেই পরিবারের কোন ব্যক্তি সম্পর্কে সতর্ক হওয়া যায়। যেমন : – কোন পরিবারে যদি কারও যক্ষ্মা, মস্তিষ্ক বিকৃতি অথবা অন্যকোন সংক্রামক ব্যাধি থাকে, সে পরিবারের অন্যান্য সদস্যের মধ্যে তার সংক্রমণ হতে পারে। পারিবারিক পেশাও অনেক সময় আয়ুষ্কাল নির্ধারণী উপাদান হিসেবে কাজ করে। সুতরাং, পারিবারিক ইতিবৃত্ত সম্পর্কেও বীমাকারীকে অবহিত হয়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়।

 

৬। পেশা (Occupation) :

পেশার উপর অনেক সময়ই মানুষের জীবনের অনিশ্চয়তা, নৈতিকতা ইত্যাদি নির্ভর করে। এ জন্যেই বীমার ক্ষেত্রে কোন একটি পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তির জীবনকে প্রথম শ্রেণীর জীবন আবার, অন্য পেশায় নিয়োজিত কোন ব্যক্তির জীবনকে দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় শ্রেণীর জীবন হিসেবে গণ্য করা হয়। বিপদজনক পেশায় যে কোন সময়ে দুর্ঘটনাজনিত কারণে নিয়োজিত কোন ব্যক্তির সাময়িক অথবা স্থায়ী আংশিক বা সম্যক অক্ষমতা এসে যেতে পারে – এমনকি, অকালে মৃত্যুও হয়ে যেতে পারে। আবার, পেশাগতকারণেই একজন নেশাখোর নীতিবিসর্জিত হতে পারে। পক্ষান্তরে, ভিন্নপেশায় নিয়োজিত ব্যক্তির জীবন অনেক নিরাপদ এবং নৈতিক থাকতে পারে। সুতরাং, এ বিষয়েও সাবধানতা গ্রহণ অপরিহার্য।

 

৭। (Residence) :

ভাল আবহাওয়া ও জলবায়ুর অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জীবন স্বভাবতঃই খারাপ জলবায়ু অঞ্চলের মানুষের জীবনের চেয়ে উত্তম হয়ে থাকে বস্তিবাসীর চেয়ে উন্নত আবাসিক এলাকার মানুষের জীবৎকাল যে দীর্ঘ হতে পারে সে বিষয়ে সন্দেহ কি। সুতরাং, এটি একটি বিবেচ্য বিষয়।

 

৮। বর্তমান অভ্যাস (Present Habits ) :

একটি মানুষের বর্তমান জীবনযাত্রা প্রণালী বা অভ্যাস তার আয়ুষ্কাল সম্পর্কে নির্দেশক হয়ে থাকে। যেমন : – একজন মদ্যপ বা নেশাখোর ব্যক্তির মৃত্যুর সম্ভাবনা যে অপেক্ষাকৃত দ্রুততর এবং বেশী সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ রাখে না। এ বিষয়টি সম্পর্কেও বীমাকারীকে সাবধান হতে হয়।

 

৯। নৈতিকতা বা নীতিজ্ঞান (Morality or morals) :

কোন মানুষ চরিত্রগতভাবে যদি ভাল হয়, তাহলে তার জীবৎকাল হবে স্বাভাবিক। আর, যদি অসচ্চরিত্র সম্পন্ন হয়, তাহলে তার জীবৎকাল হবে চরম অনিশ্চয়তার আওতাধীন। সুতরাং, বীমাগ্রহীতার নীতিজ্ঞান সম্পর্কে বীমাকারীকে সতর্ক হতে হয়।

 

ঝুঁকির ক্ষেত্রে জীবন বীমা | ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা | বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা

 

১০। বংশানুক্রম ও জাতীয়তা (Race & Nationality) :

উন্নত গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের জীবনধারা উন্নততর বিধায় তাদের আয়ুষ্কাল অপেক্ষাকৃত বেশী হয়ে থাকে উপজাতীয় বা অনুন্নত সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের চেয়ে। তাই, এ বিষয়টিও বীমাকারীকে বিবেচনাধীন রাখতে হয়।

 

১১। জাতি (Sex) :

সাধারণতঃ বিভিন্ন কারণে স্ত্রীজাতি বা স্ত্রীলোক পুরুষের চেয়ে কম আয়ুষ্কাল সম্পন্ন হয়ে থাকে। স্ত্রীলোকের শিক্ষার সুযোগ কম, কুসংস্কার ও সংকীর্ণতা, বেকারত্ব, অতিরিক্ত পরিশ্রম, সন্তান পরিচর্যা ইত্যাদি কারণে স্ত্রীজাতি কম আয়ুষ্কাল সম্পন্ন হয়ে থাকে। সুতরাং, বীমাকারীকে এ বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হয়।

 

১২। আর্থিক অবস্থা (Economic Status) :

প্রস্তাবিত বীমাগ্রহীতা যে পরিমাণের বীমাপত্র গ্রহণ করতে আগ্রহী, বীমাগ্রহীতা সে ধরনের বীমাচুক্তি সম্পাদনের জন্যে যথেষ্ট আর্থিক যোগ্যতা বা সচ্ছলতা সম্পন্ন কিনা সে বিষয়টি সম্পর্কেও বীমাকারীকে জেনে নিতে হয়।

 

১৩। প্রতিরক্ষা পেশা (Defence Service) :

প্রতিরক্ষা বিভাগে নিয়োজিত ব্যক্তিদের যেহেতু বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপদ সংকুল দায়িত্ব পালন করতে হয়, তাদের জীবৎকাল হয় অনেকটা অনিশ্চিত এবং কম। তাই, বীমাকারীকে এ ধরনের পেশাজীবী প্রস্তাবিত বীমাগ্রহীতা সম্পর্কে আগেই সতর্কতা অবলম্বন করে। নিতে হয়।

 

১৪। বীমা পরিকল্পনা (Plan of Insurance) :

বিভিন্ন ধরনের বীমা পরিকল্পনা বা বীমা চুক্তির ক্ষেত্রে ঝুঁকি কম বেশী হয়ে থাকে। কোন কোন পরিকল্পনায় বীমাকারীকে অধিকতর দায়-দায়িত্ব বহন করতে হয়। আবার, কোনটিতে কম। সুতরাং, ক্ষেত্র বুঝেই বীমাকারীকে প্রাকসতর্কতা নিয়ে চুক্তিভুক্ত হতে হয়।

Leave a Comment