টেককম লাইফের এআই উদ্যোগে বীমা খাত বদলের পথে

ভিয়েতনামভিত্তিক টেককম লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর পরিচালন কাঠামো প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বীমা খাতে নতুন প্রতিযোগিতার সূচনা করেছে। বিশ্বজুড়ে অধিকাংশ বীমা প্রতিষ্ঠান এখনো এআই ব্যবহারের পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আটকে থাকলেও, টেককম লাইফ সরাসরি মূল ব্যবসায়িক কার্যক্রমে এআই প্রয়োগ করে বাস্তব পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে। খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এআই-সংক্রান্ত প্রকল্পগুলোর মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বড় পরিসরে কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, যা প্রযুক্তির সম্ভাবনা ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে বড় ব্যবধান নির্দেশ করে।

হো চি মিন সিটিতে আয়োজিত এশিয়ান ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স ও ইন্স্যুরেন্স এশিয়া সামিটে টেককম লাইফের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা রবীন্দ্র ভেনিসেট্টি বলেন, বীমা শিল্পে এআই নিয়ে আগ্রহ থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার প্রতিযোগিতার ধরণ পাল্টে দিচ্ছে, যেখানে গতি, দক্ষতা এবং তথ্যভিত্তিক আন্ডাররাইটিং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

প্রতিষ্ঠানটি মাত্র তিন মাসের মধ্যেই তাদের বিভিন্ন কার্যক্রমে এআই সংযোজন করেছে। টেককম লাইফের লক্ষ্য হলো জনবল বৃদ্ধির ওপর নির্ভর না করে প্রযুক্তির মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি করা। তারা একটি “এআই-প্রথম” ও “এআই-নেটিভ” প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চায়, যেখানে অধিকাংশ কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া হবে তথ্যনির্ভর।

ভিয়েতনামে বীমা প্রবেশহার প্রায় ২ শতাংশ, যা উন্নত দেশের তুলনায় অনেক কম। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর দ্রুত অগ্রগতির বড় সম্ভাবনা রয়েছে। পুরোনো অবকাঠামোর জটিলতা না থাকায় নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো আধুনিক ক্লাউডভিত্তিক প্রযুক্তি গ্রহণ করে দ্রুত স্কেল-আপ করতে পারছে।

বিশ্বখ্যাত পরামর্শক সংস্থা অনুযায়ী, এআই বীমা খাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে। সম্ভাব্য প্রভাবগুলো নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো—

ক্ষেত্রসম্ভাব্য প্রভাব
অপারেশনাল খরচসর্বোচ্চ ৪০% পর্যন্ত হ্রাস সম্ভব
ক্ষতির হার (লস রেশিও)৩-৫ শতাংশ পয়েন্ট উন্নতি
বৈশ্বিক বিনিয়োগ২০২৪ সালে ১০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম
আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধিএশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে দ্রুত সম্প্রসারণ

টেককম লাইফ ইতোমধ্যে মূল্য নির্ধারণ, আন্ডাররাইটিং ও দাবি নিষ্পত্তির মূল কার্যক্রমে এআই সংযোজন করেছে। আগে যেখানে এসব কাজ কাগজপত্র বা স্প্রেডশিট নির্ভর ছিল, এখন উন্নত অ্যালগরিদম দ্রুত ও নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করছে।

গ্রাহকসেবা উন্নত করতে প্রতিষ্ঠানটি “টোরি” নামে নিজস্ব এআই সহকারী চালু করেছে। প্রায় ১,৫০০ এজেন্টের মধ্যে ৮৫ শতাংশ এই সহকারী ব্যবহার করছে। গ্রাহকের সঙ্গে কথোপকথনের সময় এটি তাৎক্ষণিক তথ্য ও পরামর্শ প্রদান করে, ফলে বিক্রয় দক্ষতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

প্রতারণা শনাক্তকরণেও এআই গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ দাবি প্রতারণামূলক হতে পারে। উন্নত ডেটা বিশ্লেষণ ও প্যাটার্ন শনাক্তকরণের মাধ্যমে এআই এসব ঝুঁকি দ্রুত সনাক্ত করতে সহায়তা করছে।

প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে টেককম লাইফ আরও এক ধাপ এগিয়ে। মাত্র তিন দিনে কোনো মানব কোডিং ছাড়াই একটি এআই-ভিত্তিক ডকুমেন্ট ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম তৈরি ও চালু হয়েছে। এছাড়া এআই এজেন্টরা ভার্চুয়াল কর্মী হিসেবে প্রশাসনিক কাজ ও সফটওয়্যার উন্নয়নে যুক্ত হচ্ছে।

তবে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে—কোন উদ্যোগ আগে বাস্তবায়ন করা হবে, তা নির্ধারণ করা। ভেনিসেট্টি বলেন, “আমাদের কাছে অনেক ধারণা আছে, কিন্তু কোনটি আগে শুরু করবো, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।”

সার্বিকভাবে, টেককম লাইফের উদ্যোগ দেখায় সঠিক কৌশল, আধুনিক প্রযুক্তি ও দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে বীমা খাতে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এআই-চালিত প্রতিযোগিতা ইতোমধ্যেই তীব্র, যা ভবিষ্যতে বৈশ্বিক বীমা শিল্পকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে।

Leave a Comment