নৌ-বীমার ইতিবৃত্ত

আজকের আলোচনার বিষয় “নৌ-বীমার ইতিবৃত্ত ” যা নৌ বা সামুদ্রিক বীমা অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।ব্যবসা-বাণিজ্য মানুষের জীবিকার একটি উপায় বা অবলম্বন। আর, ব্যবসা- বাণিজ্য সংক্রান্ত আদান প্রদানের একটি বিরাট অংশ সম্পন্ন করা হয় নৌ-পথে।

নৌ-বীমার  ইতিবৃত্ত

 

নৌ-বীমার ইতিবৃত্ত

 

 

স্থলপথে পণ্য পরিবহণের ঝুঁকি অপেক্ষাকৃত অনেক কম, পক্ষান্তরে, নৌ-পথে – বিশেষতঃ সমুদ্রপথে সওদাগরী নৌ-যান চলাকালীন অনেক সময়ই প্রবল ঝড়-ঝঞ্চা, তরঙ্গ, জলদস্যুর আক্রমণ, লুট-তরাজ ইত্যাদি বিপদ-বিপত্তির কারণে বিপুল ক্ষতি সাধিত হতে পারে। নাবিক, পণ্য জাহাজ – এ সব কিছুই সমুদ্রগর্ভে নিমজ্জিত হয়ে যেতে পারে যে কোন সময়ে। এজন্যেই আধুনিক কালে নৌ-বীমার ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে পড়ছে দিন দিন ।

এই নৌ-বীমার উদ্ভব কবে হয়েছে তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করা না গেলেও সর্ব প্রথম যে নৌ-বীমার উদ্ভব ঘটেছে সে বিষয়ে দ্বিমতের তেমন কোন অবকাশ নেই। যতদূর জানা যায় খ্রীষ্টপূর্ব ১১৬ অব্দের দিকে রোচ দ্বীপের অধিবাসীগণ নৌ-পথে পণ্য পরিবহণ প্রশ্নে কিছু নীতিমালার প্রচলন করেন যা নৌ-বীমা ব্যবস্থার একটি উন্মেষ-সূত্র হিসেবে পরিগণিত।

কিন্তু, উক্ত ক্ষতিপূরণ নীতিমালা সমুদ্রপথে পণা পরিবহণের বিরুদ্ধে নিশ্চয়তা দানের জন্যে তেমন সহায়ক হয়নি। তাই, সামুদ্রিক বিপদ-বিপত্তি জনিত আর্থিক ক্ষতির অশ্চিয়তা তথা ঝুঁকির বিরুদ্ধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা প্রবর্তনের চেষ্টা চলতে থাকল।

১১৮২ খৃষ্টাব্দে ফ্রান্স থেকে বিতাড়িত ইহুদীগণ নৌ-বীমা ও বিনিময় বিল-এ দু’টি ব্যবস্থার প্রচলন করেন। এদের প্রবর্তিত বীমা ব্যবস্থা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ীগণ গ্রহণ ও চালু করতে থাকেন। এইচ. এ.এল. ককরেল-এর মতে ইটালীতে প্রথম আধুনিক নৌ-বীমার গোড়াপত্তন হয় এবং কালক্রমে তা ইউরোপের অন্যান্য দেশে প্রচলিত হতে থাকে।

ত্রয়োদশ শতকে ইটালী থেকে বিতাড়িত লোম্বার্ড বণিক সম্প্রদায় ইংল্যাণ্ডে বীমাপ্রথা চালু করেন।১৪৩৭ সালে ব্রুসেলোনায় নৌ-বীমা সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ প্রকাশিত হয়। ১৫৫৬ সালে স্পেনের জন্যে রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ বীমা পরিচালনা বিধি চালু করেন।শপ্তদশ শতকের শেষ ভাগে লণ্ডনের এডওয়ার্ড লয়েডস-এর কফিখানায় বন্দর নাবিকদের সমাগম হতে থাকে।

ফলে লয়েডস সওদাগরী জাহাজের নাবিকদের কাছ থেকে খবরাখবর সংগ্রহ এবং তাদের সাথে যোগাযোগের সুযোগ পান। দেশবিদেশগামী ইউরোপীয় বনিকদের জাহাজসমূহের যাবতীয় খবর ও তথ্যাদি তার কাছে সংগৃহীত হতে থাকে।

কালক্রমে, তিনি এতদসংক্রান্ত বিবিধ তথ্যাদি সম্বলিত একটি সাময়িকী প্রকাশ করেন যা লয়েডস বিবরনী ( Lloyd’s List) নামে অভিহিত। ধীরে ধীরে লয়েডস-এর কফিখানাই নৌ-বীমার দায়গ্রাহকগণের কার্যকলাপের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়।

 

ফলশ্রুতিতে, লয়েডস-এর উদ্যোগেই ১৭২০ সালে The Lloyd’s Assurance এবং The Royal Exchange নামে দু’টি বীমা প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়। ১৭৭১ সালে নৌ-বীমার দায় গ্রাহকগণ ও এজেন্টগণ মিলে ‘Association of Lloyd’s underwriters’ নামে একটি সমিতি গঠন করেন।যা পৃথিবীর সর্ব- প্রথম সংগঠিত আধুনিক বীমা কোম্পানী হিসেবে স্বীকৃত।

১৮৭১ সালে এ কোম্পানীটিকে ইংল্যাণ্ডের পার্লামেন্টে আইন পাস করে – The corporation of Lloyd’s নামে পুনগঠিত ও সংবিধিবদ্ধ করে নেয়া হয়। ১৮২৪ সালে Alliance Insurance Co. প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় পর থেকে Lloyd’s Association এর একচেটিয়া প্রভাব হ্রাস পায় এবং আরও অনেক নৌ-বীমা কোম্পানী প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে।

ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণের সাথে সাথে পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও বীমা ব্যবস্থার তাগিদ অনুভূত হয় এবং নৌ-বীমা ব্যবসার সম্প্রসারণ ও প্রচলন শুরু হয়।আমাদের এ উপ-মহাদেশে প্রথম প্রচলন হয় জীবন বীমার। ১৮১৮ সালেই উপ-মহাদেশে ‘দি ওরিয়েন্ট লাইফ এ্যাসিওরেন্স কোম্পানী’ নামে প্রথম জীবন বীমা কোম্পানী প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ধীরে ধীরে আরও বেশ কিছু কোম্পানী প্রতিষ্ঠিত হয়।

কিন্তু, ১৯১২ সালেই এখানে বীমা সংক্রান্ত আইন পাশ হয়। এর আগে এরূপ কোন আইন এখানে ছিল ना।যাই হোক, নৌ–বা সম্পত্তি বীমার ক্ষেত্রে বৃটিশ কোম্পানীগুলোই মূলতঃ ব্যবসা পরিচালনা করছিল। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পরে পাক শাসন আমলেও সে একই অবস্থা চলতে থাকে। ১৯৫০ সালে ৯০% ভাগ বীমা ব্যবস্থাই বিদেশী বীমা কোম্পানীর হাতে ছিল।

স্বাধীনতার পরে এক্ষেত্রে একটি বিরাট পরিবর্তন সাধিত হলো। ১৯৭২ সালের ৮ই আগষ্ট রাষ্ট্রপতির ৯৫ নং আদেশে বীমা কোম্পানীগুলোই জাতীয়করণ করা হয়; ৭৫টি বীমা প্রতিষ্ঠানকে ৫টি বীমাকর্পোরেশন-এর আওতায় আনা হয়।

১৯৭৩ সালের ১৪ই মে বীমা কর্পোরেশন অধ্যাদেশ বলে উক্ত ৫টি কর্পোরেশনকে সাধারণ বীমা কর্পোরেশন ও জীবন বীমা কর্পোরেশন নামে দু’টি ভিন্ন কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। স্বাভাবিক কারণেই সাধারণ বীমা কর্পোরেশন নৌ-বীমা সংক্রান্ত কার্যাবলী পরিচালনা করছে।

 

নৌ-বীমার ইতিবৃত্ত

 

১৯৭৫ সালের পর থেকে বাংলাদেশে বে-সরকারী মালিকানায় বীমা কোম্পানী প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে। এযাবৎ প্রায় ১৮টি সাধারণ বীমা কোম্পানী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং সাধারণ বীমা কোম্পানীগুলোই নৌ-বীমা ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে। উল্লেখ্য যে বৃটিশ আমল থেকেই আমাদের এতদঞ্চলে জীবন বীমার ব্যবসা ছিল সবচেয়ে বেশী।

কিন্তু স্বাধীনতার পরে-বিশেষতঃ ১৯৭৫ সালের পর থেকে আমাদের এখানে যে, সব বেসরকারী বীমা কোম্পানী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার অধিকাংশই সাধারণ বীমা ব্যবসা পরিচালনা করছে। এটি একটি লক্ষ্যনীয় পরিবর্তন যা ব্যবসা-বানিজ্যের ক্ষেত্রে অগ্রসরতার ইঙ্গিত বহন করে।

Leave a Comment