আজকের আলোচনার বিষয় “নৌ-বীমার শর্তাবলী উল্লেখ পূর্বক নিম্নে বর্ণিত সমস্যাটির সমাধান ” যা নৌ বা সামুদ্রিক বীমা অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।একখানা জাহাজ মন্ট্রিল থেকে লণ্ডন সমুদ্র যাত্রার জন্যে বীমা করা হয়। সেন্ট লরেন্স (দ্বীপ) নদী দিয়ে যাওয়ার সময় জাহাজের মাষ্টার আবিষ্কার করেন যে, জাহাজখানি সমুদ্র যাত্রার অনুপযুক্ত অবস্থায় বন্দর ত্যাগ করেছে। জাহাজ খানি মন্ট্রিল ফিরে যায় এবং সেখানে জাহাজখানিকে সমুদ্রযাত্রার উপযুক্ত করা হয়। যাত্রা পুনরায় শুরু হয় এবং জাহাজখানি ঝড়ে আটলান্টিক মহাসাগরে ধ্বংস হয়ে যায়।
নৌ-বীমার শর্তাবলী উল্লেখ পূর্বক নিম্নে বর্ণিত সমস্যাটির সমাধান

নৌ-বীমাচুক্তির অধীনে এক্ষেত্রে বীমাকারীর দায়িত্ব কি হতে পারে?
সমাধান :নৌ-বীমা চুক্তির অন্যতম অনুক্ত শর্ত ( Implied Warranty*) হচ্ছে জাহজের সমুদ্রে চলাচলযোগ্যতা ( Sea worthiness)। চলাচলযোগ্যতা বলতে জাহজের পণ্য বোঝাই করার পরে যাত্রা শুরু করে নির্ধারিত সমুদ্র পথ দিয়ে নিরাপদে অতিক্রম করে গন্তব্য স্থান বা স্থানসমূহে পৌঁছার যোগ্যতা বা উপযুক্ততাকে বুঝায়। তবে, সমুদ্রের বিভিন্ন পথ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন বলে সব জাহাজই এক পথে চলাচলের যোগ্য নয়; আবার কোন জাহাজই বিভিন্ন পথে চলাচলযোগ্য নয়।
কোন কোন গ্রন্থকার তাই এ বিষয়টিকে জাহাজের উপযুক্ততা (Fitness) হিসেবে বর্ণনা করেছেন। উক্ত চলাচলযোগ্যতা বা উপযুক্ততার পূর্বশর্তগুলি হচ্ছে— জাহজের যোগ্য কাপ্তান, প্রয়োজনীয় এবং যথাযোগ্য লোক-লস্কর ও সাজ সরঞ্জান এবং যথারীতি ও সম্ভবমত পণ্য বোঝাই সম্পর্কিত সঠিক ঘোষণা। উপরন্তু, ছোটখাট প্রত্যাশিত-অপ্রত্যাশিত বিপদ-আপদ মোকাবেলায় জাহাজের প্রয়োজনীয় সবকিছুর নিশ্চয়তা বিধানও উপযুক্ততার আওতাভূক্ত।
এই উপযুক্ততা থাকলেই শুধু বীমাকারী বা যে কোন বীমা প্রতিষ্ঠান জাহাজ মালিকের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হবেন, অন্যধায় নয়। আর, উপযুক্ততা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ব্যবস্থা নেয়া সাপেক্ষে জাহাজের কাপ্তানকেই নিশ্চিত ঘোষণা প্রদান করতে হবে যার প্রেক্ষিতে বীমাকারী ও জাহাজ কর্তৃপক্ষের মধ্যে বীমা চুক্তি গঠিত হতে পারে।
আলোচ্য সমস্যাটিতে দেখা যায় যে, জাহাজখানি মন্ট্রিল থেকে লণ্ডন যাওয়ার পথে সেন্ট লরেন্স (দ্বীপ) নদী দিয়ে যাওয়ার সময় জাহাজের মাষ্টার জানতে পারেন যে, জাহাজখানি সমুদ্র যাত্রার অনুপযুক্ত অবস্থায়ই বন্দর ত্যাগ করেছে। অতঃপর, জাহাজখানিকে মন্ট্রিলে ফিরিয়ে এনে সমুদ্র যাত্রার উপযুক্ত করে পুনরায় যাত্রা শুরু করে আটলান্টিক মহাসাগরে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়ে ধ্বংস হয়ে যায়।
এক্ষেত্রে জাহাজমালিক ক্ষতিপূরণ দাবী করলে, বীমাকারী অবশ্যই বিষয়টি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় খোঁজ-খবর নিবেন এবং বীমাকারীর কাছে অবশ্যই জাহাজের উপযুক্ততা সম্পর্কে কাপ্তানের ঘোষণাপত্র যথারীতি দেয়া হয়েছে কিনা জানবেন। জাহাজের উপযুক্ততা সম্পর্কে জাহাজে কাপ্তানের নিশ্চিত ঘোষণা থাকে। অথচ, জাহাজের কাপ্তানই পথিমধ্যে আবিষ্কার করেন যে, যাত্রার শুরুতেই জাহাজ যাত্রার অনুপযুক্ত ছিল। এমন প্রমাণ জানতে পারলে, অবশ্যই মিথ্যা বর্ণনার দায়ে বীমাকারী এ বীমাচুক্তির অধীনে ক্ষতিপুরণ দানে অস্বীকার করতে পারবেন। কেননা, চুক্তিটি মিথ্যা বর্ণনার কারণে স্বেচ্ছা-সায়ের অভাবেই বাতিল বলে গণ্য হবে।
তবে, বীমাকারীর সাধারণ প্রচেষ্টায় যদি জাহাঙ্গর উপযুক্ততা সম্বন্ধে মিথ্যা বর্ণনা (অবেহেলার কারণে হলেও) জানা যায়, তাহলে বীমাকারী এ দায় এড়াতে পারেন না। কিন্তু, মিথ্যা বর্ণনার মাধ্যমে চুক্তি গঠনের পরে একবার যাত্রা শুরু করে পথ থেকে ফিরে এসে জাহাজ উপযুক্ত করে আবার যাত্রা শুরু করে পথে ঝড়ে পড়ে ধ্বংস হলেও বীমাকারী এ যুক্তিও হাজির করতে পারেন যে, যথাসময়ে যাথারীতি যাত্রা শুরু করে বিনা বাঁধায় যেতে পারলে, ঐ সময়ে ঝড়ের কবলে পড়ার প্রশ্ন উঠতো না।

তবে, বীমাকারীর কাছে কোন কারণে জাহাজের উপযুক্ততা সম্পর্কে কাপ্তানের ঘোষাণাটি না থাকলে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রয়োজনীয় তথ্যাদি উদ্ধারে সক্ষম না হলে হয়ত দায় এড়াতে পারবেন না।তথাপি, এক্ষেত্রে ধরে নেয়া যায় যে, কাপ্তানের ঘোষণা ছাড়া বীমাকারী চুক্তিতে আবদ্ধ হননি এবং চুক্তি গঠন মিথ্যা বর্ণনার মাধ্যমেই হয়েছে। অর্থাৎ, কাপ্তান প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা না করেই জাহাজটিকে সমুদ্র যাত্রার উপযুক্ত বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং এটি প্রমানিত হলে বীমাকারী অবশ্যই দায়বদ্ধ হবেন না। কারণ, চুক্তির প্রকৃত বিষয়টি প্রমানিত হলে তা বাতিল বলে ঘোষিত হবে।
