বিভিন্ন প্রকার বীমা চুক্তির মধ্যে পার্থক্য | বীমার মৌলিক ও সাধারণ আধেয়সমূহ, যুগ পরিবর্তনের ধারায় ক্রমাগতভাবে বিভিন্ন ধরনের বীমার উদ্ভব ও উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে। যথাঃ – জীবন বীমা, নৌ-বীমা, অগ্নিবীমা এবং অন্যান্য বিভিন্ন প্রকারের দুর্ঘটনা ও সামাজিক বীমাসমূহ। এসব বীমার মধ্যে একাধারে পার্থক্য নির্দেশ করা অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার। তবে, জীবন বীমা, নৌ ও অগ্নি বীমাই যেহেতু সব বীমার মধ্যে অধিকাংশ স্থান জুড়ে আছে, সে কারণে এ তিনটি বীমার মধ্যে পার্থক্য দেখানো মোটামুটিভাবে সহজসাধ্য বিধায় নিম্নে মূলতঃ উক্ত বীমাসমূহের মধ্যেই পার্থক্য দেখানো হলো।
Table of Contents
বিভিন্ন প্রকার বীমা চুক্তির মধ্যে পার্থক্য | বীমার মৌলিক ও সাধারণ আধেয়সমূহ | বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা

পার্থক্যসমূহঃ
১। সংজ্ঞা (Definition) :
মানুষের জীবনের সংকট ও বিপর্যয় মোকাবেলা তথা অনিশ্চয়তাজনিত ঝুঁকি লাঘব ও দূরীকরণের প্রতিশ্রুতির প্রেক্ষিতে বীমা প্রতিষ্ঠানের সাথে যে চুক্তিগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, তাকেই বলে জীবন বীমা। পক্ষান্তরে, নৌ-পথে ও অগ্নি থেকে সম্পত্তির উপর সম্ভাব্য কোন ক্ষতিজনিত ঝুঁকি লাঘর বা দূরীকরণের অথবা ক্ষতিপূরণ দানের প্রতিশ্রুতির প্রেক্ষিতে বীমা প্রতিষ্ঠানের সাথে যে চুক্তিগত ব্যবস্থা নেয়া হয়, তাকেই বলা হয় সম্পত্তি বীমা বা নৌ ও অগ্নি বীমা। – বীমা বিধির ২ ধারা।
২. প্রকৃতি (Nature):
জীবনের কোন ক্ষতি যেহেতু পরিমাপ করা সম্ভব নয়, সে কারণে জীবন বীমাকে ক্ষতিপুরণের চুক্তি বা বীমা হিসেবে গণ্য করা হয় না; কিন্তু, নৌ ও অগ্নি তথা অন্যান্য প্রায় সকল প্রকার বীমাই ক্ষতিপূরণের বীমা উপরক্ত, সম্পত্তির উপর নৌ ও অগ্নি বীমা করা হয় বলে এদের সম্পত্তি বীমা বলা হয়; কিন্তু, জীবন বীমা সম্পত্তি বীমা নয়।
৩ ঘটনা-দুর্ঘটনার নিশ্চয়তা ( Certainty of happening or mishappening) :
নৌ ও অগ্নিবীমার ক্ষেত্রে কোন দুর্ঘটনা ঘটতেও পারে, নাও ঘটতে পারে ; কিন্তু, জীবন বীমার ক্ষেত্রে বীমাকৃত ব্যক্তির কোন এক সময় নির্দিষ্ট বয়স অথবা এক সময় মৃত্যু হবেই।
৪. বীমা কিস্তি বা সেলামী অথবা প্রিমিয়াম ( Insurance Premium) :
জীবন বীমার ক্ষেত্রে সাধারণতঃ একাধিক কিস্তি প্রদান করতে হয়, কিন্তু, অন্যান্য বীমার ক্ষেত্রে সাধারণতঃ একটি কিস্তি বা সেলামীই প্রদান করতে হয়।
৫. বীমার বিষয়বস্তু (Subject matter of Insurance) :
জীবন বীমার ক্ষেত্রে বীমার বিষয়বস্তু হচ্ছে জীবন এবং অন্যান্য বীমার ক্ষেত্রে বিষয়বস্তু হচ্ছে সম্পত্তি।
৬. বীমাযোগ্য স্বার্থ ( Insurable Interest) :
জীবন বীমার ক্ষেত্রে বীমাকৃত জীবনের উপর বীমাযোগ্য স্বার্থ বিদ্যমান থাকে, পক্ষান্তরে, নৌ ও অগ্নিবীমার ক্ষেত্রে বীমাকৃত সম্পত্তির উপর বীমাযোগ্য স্বার্থ বিদ্যমান থাকে।
৭. উদ্দেশ্য (Objective) :
জীবন বীমার ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা ও বিনিয়োগ – বীমাগ্রহীতার এ দুটো উদ্দেশ্যই একাধারে সাধিত হয় পক্ষান্তরে, অন্যান্য বীমায় শুধুই প্রতিরক্ষার উদ্দেশ্যটি সাধিত হয়ে থাকে।
৮. মেয়াদ ( Term) :
জীবন বীমার চুক্তি সাধারণতঃ দীর্ঘ মেয়াদী হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে, নৌ ও অগ্নিবীমার চুক্তি স্বল্প মেয়াদী হয়।
৯. সমর্পণ মূল্য ( Surrender Value) :
জীবন বীমাপত্র নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে ( সাধারণতঃ ২ থেকে ৩ বছরের পর) সমর্পণ মূল্য অর্জন করে। কিন্তু, অগ্নি ও নৌ-বীমার ক্ষেত্রে কোন সমর্পণ মূল্য পাওয়া যায় না।
১০. বীমাযোগ্য স্বার্থের স্থিতিকাল (Time of the presence of Insurable Interest) :
জীবন বীমার ক্ষেত্রে বীমাপত্র গ্রহণের সময়ই বীমাযোগ্য স্বার্থ থাকা একান্ত প্রয়োজন। আর, নৌ-বীমার ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতি সংঘটিত হবার সময় বীমাযোগ্য স্বার্থ বিদ্যমান থাকলেই চলে। কিন্তু, অগ্নি বীমার বেলায় বীমাপত্র গ্রহণের সময়ও বীমাযোগ্য স্বার্থ থাকা যেমন প্রয়োজন, তেমনি কোন দুর্ঘটনা বা ক্ষতি সংঘটিত হবার সময়ও বীমাযোগ্য স্বার্থ থাকতে হয়, নয়তো, অগ্নিবীমার চুক্তিই অবৈধ বলে গণ্য হয়।
১১. নৈতিক ঝুঁকি ( Moral hazard) :
জীবন বীমা ও নৌ-বীমার ক্ষেত্রে নৈতিক ঝুঁকি অপেক্ষাকৃত কম। কেননা, মানুষ তার নিজের জীবনের উপর অর্থনৈতিক কাজের জন্যে অনেকটা সংযত থাকে এবং নৌ-বীমার ক্ষেত্রে বীমাগ্রহীতা বীমার বিষয়বস্তু থেকে সচরাচর দূরে থাকেন। পক্ষান্তরে, অগ্নিবীমার ক্ষেত্রে নৈতিক ঝুঁকি থাকে সর্বাধিক। কেননা, বীমাগ্রহীতা অতি লোভবশতঃ নিজের বীমাকৃত সম্পত্তিতে ইচ্ছাকৃতভাবে অগ্নি সংযোগ করে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে অনেক বেশী পাওয়ার চেষ্টা করে এমন ঘটনা অনেকই দেখা যায়।
১২. বীমাপত্রের হস্তান্তর (Transfer of Insurance Policy) :
জীবন বীমা ও নৌ-বীমার ক্ষেত্রে বীমাপত্র হস্তান্তর করা যায় এবং তা খুব বেশী আয়াস সাধ্য নয়। কিন্তু, অগ্নি বীমার ক্ষেত্রে বীমাপত্র হস্তান্তর করা সহজ নয়।

১৩ অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা বা লাভ ( Extra financial benefit or gains) :
জীবন বীমার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা বা বোনাস আকারে মুনাফার অংশ মুনাফাযুক্ত বীমাপত্রের গ্রহীতা পান। নৌ-বীমার ক্ষেত্রেও সম্পত্তির ক্রয়মূল্যের সাথে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১৫ ভাগ লাভ বীমাগ্রহীতা আদায় করতে পারেন। কিন্তু, অগ্নিবীমার ক্ষেত্রে ক্ষতি সংঘটিত হলে বীমাকারীর কাছ থেকে বীমাগ্রহীতা শুধু সম্পত্তির বর্তমান মূল্যই আদায় করতে পারেন। তবে, বীমাকৃত মূল্যের চেয়ে বীমাদাবী বেশী হতে পারবে না।
১৪. উহ্য শত (Implled Warranty):
নৌ-বীমার ক্ষেত্রে উহ্য শর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু, জীবন ও অগ্নিবীমার ক্ষেত্রে তেমনটি নয়। মোটামুটিভাবে, এগুলোই বিভিন্ন বীমার মধ্যে প্রধান প্রধান পার্থক্য। এ ছাড়াও, বিভিন্ন খুঁটিনাটি পার্থকাতো রয়েছেই। যেমনঃ – বীমা কিস্তি বা সেলামী প্রদানের নিয়ম, আবেদনের নিয়ম, বীমাদাবী প্রদানের নিয়ম ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিদ্যমান পার্থক্যসমূহ ।
