দেশের বিমা খাতকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ এবং গতিশীল করতে বিমা কোম্পানিগুলোকে নগদবিহীন বা ক্যাশলেস (Cashless) লেনদেন পরিচালনার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। সোমবার ঢাকার বিয়াম ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) আয়োজিত নতুন ওয়েবসাইট ও ‘ডিজিটাল বিমা ম্যানুয়াল’ উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। গভর্নরের মতে, বিমা খাতে স্বচ্ছতা ফেরাতে ব্যাংক ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রিমিয়াম সংগ্রহ এবং প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য।
Table of Contents
ডিজিটাল রূপান্তর ও স্বচ্ছতার গুরুত্ব
অনুষ্ঠানে গভর্নর স্পষ্ট করে বলেন যে, বিমা প্রিমিয়াম সরাসরি নগদে গ্রহণ না করে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে জমা দেওয়ার পদ্ধতি চালু করা হবে। এই প্রক্রিয়াটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা বা গাইডলাইন তৈরি করবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, অতীতে স্বল্পমেয়াদি লাভের নেশায় বিমা খাত তার সঠিক পথ হারিয়েছে। এখন সময় এসেছে এটিকে একটি উচ্চ উৎপাদনশীল এবং আস্থাসম্পন্ন খাত হিসেবে পুনর্গঠন করার।
ডিজিটাইজেশনের সুফল পেতে হলে বিমাকারীদের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। গভর্নর জানান, নগদ লেনদেন কমিয়ে আনতে পারলে বিমা খাতে শৃঙ্খলা ফেরার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক সব ধরনের প্রযুক্তিগত ও নীতিগত সহায়তা প্রদান করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বিমা খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও সমাধান
গভর্নর তার বক্তব্যে বিমা খাতের অন্যতম বড় সমস্যা—’দাবি পরিশোধে ব্যর্থতা’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রিমিয়াম সংগ্রহ এবং বিনিয়োগ করা হলেও পর্যাপ্ত তহবিলের অভাবে গ্রাহকরা তাদের বিমা দাবি বুঝে পাচ্ছেন না। তিনি বিমা তহবিলকে সঠিকভাবে পরিচালনার নির্দেশ দেন এবং সুশাসন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
অনুষ্ঠানে আলোচিত বিমা খাতের সংস্কার ও বর্তমান প্রেক্ষাপট একনজরে:
| বিষয় | বিবরণ ও লক্ষ্য |
| লেনদেনের মাধ্যম | নগদবিহীন (ক্যাশলেস) এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে প্রিমিয়াম সংগ্রহ। |
| নিয়ন্ত্রক ভূমিকা | আইডিআরএ কর্তৃক নতুন নির্দেশিকা তৈরি এবং ডিজিটাল ম্যানুয়াল প্রকাশ। |
| সুশাসন | ব্যাংক খাতের মতো বিমা খাতেও ব্যাপক সুশাসন সম্পর্কিত শর্ত আরোপ। |
| বাজার সম্প্রসারণ | স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তিতে বিমার পরিধি বৃদ্ধি এবং জিডিপিতে অবদান রাখা। |
| ডিজিটাল রিফর্ম | আগামী ৫ বছরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সংস্কারের লক্ষ্যমাত্রা। |
বাজার সম্প্রসারণ ও অর্থনীতির চাকা
বাংলাদেশে বিমা খাতের বর্তমান পরিধি অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় অনেক কম। ড. মনসুর উল্লেখ করেন যে, বাজার সম্প্রসারণ না হলে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাবে না। সরকার কিছু উদ্যোগ নিতে পারে, তবে বিমা পণ্য উন্নয়নের মূল দায়িত্ব নিতে হবে কোম্পানিগুলোকেই। স্থাবর ও অচল সম্পত্তির পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ঝুঁকি বিমার আওতায় আনতে পারলে এই খাতের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব।
আইডিআরএ-র ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
আইডিআরএ-র চেয়ারম্যান এম আসলাম আলম জানান, ‘ডিজিটাল বিমা ম্যানুয়াল’ তৈরির মাধ্যমে বিমা সংক্রান্ত আইন, বিধি এবং যাবতীয় প্রক্রিয়া জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। এটি বিমা খাতের প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি সংস্কারের একটি বড় অংশ। তিনি সতর্ক করেন যে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে যদি এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন না হয়, তবে এই খাতের সংকটগুলো আরও জটিল আকার ধারণ করবে।
অনুষ্ঠানে বিমা খাতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ দাবি করেন, কোম্পানিগুলোর অর্থ যেন ব্যাংকে নিরাপদ থাকে এবং তারল্য সংকটের কারণে গ্রাহকের বিমা দাবি পরিশোধ যেন আটকে না যায়। তারা গভর্নরের কাছে এই বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস চান। সবশেষে, বিমা খাতের এই ডিজিটাল অগ্রযাত্রা গ্রাহক আস্থা ফেরাতে এবং একটি আধুনিক অর্থনীতি গঠনে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
