বীমাকারীর দৃষ্টিকোন থেকে বীমাযোগ্য ঝুঁকির আবশ্যকীয় উপাদানসমূহ – পাঠটি “বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা” বিষয়ের “ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা” অধ্যায়ের একটি পাঠ। বীমাকারীর দিক থেকে বীমাযোগ্য ঝুঁকির কতকগুলি অবশ্য বিবেচ্য উপাদান রয়েছে যা নিম্নে বর্ণিত হলো :-
Table of Contents
বীমাকারীর দৃষ্টিকোন থেকে বীমাযোগ্য ঝুঁকির আবশ্যকীয় উপাদানসমূহ

ক) বীমার বিষয়বস্তু হতে হবে পর্যাপ্ত সংখ্যা ও সমমান সম্পন্ন (Objects to be of sufficient number and homogeneous quality) :
সম্ভাব্য ক্ষতির একটি প্রায় কাছাকাছি হিসাব বা পরিমাপ সম্পন্ন করার সুবিধার্থে বিষয়বস্তুকে অবশ্যই সংখ্যা ও মানে হতে হবে পর্যাপ্ত এবং সমজাতীয়। যে বিষয় বা বস্তুর সম্ভাব্য ক্ষতি সম্পর্কে হিসাব বা পরিমাপ করতে হবে তা যদি হয় মাত্র কিছু সংখ্যক এবং মানে বিভিন্ন তাহলে বীমাকারীর জন্যেতো বটেই প্রকারান্তরে বীমাগ্রহীতার জন্যেও তা হয় অসুবিধাজনক।
কেননা, তা থেকে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের জন্যে কোন নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। [যেমন:- কতগুলি আবাসিক ভবনের সাথে যদি কতকগুলি বাণিজ্যিক ভবনকে একই শ্রেণীভুক্ত করে অগ্নিবীমার চুক্তি করা হয়, তা হবে একটি অযৌক্তিক কাজ। কেননা, উক্ত দুধরনের ভবনের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য বিপদ-বিপর্যয়গুলিই একেবারে ভিন্ন প্রকৃতির। উপরন্তু, যে শ্রেণীটির উপর সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ হিসেব করার পরিসংখ্যান নিজে হবে, তা প্রাকৃতিক ও সামাজিক পারিপার্শ্বিকতায় হতে হবে অন্ততঃ প্রায় সমজাতীয় যাতে করে কখনও কোন কারণে তার একাংশে কোন ক্ষতিই সাধিত হবে না, অন্য অংশে হয়ত হবে অনেক – এমনটি না হয়। আবার, কোন কোন বাত্যাসন এলাকার বাড়ীগুলির সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমান নির্ধারণ করাও সাধারণতঃ সম্ভবপর হয় না।
(খ) ক্ষতি হতে হবে দুর্ঘটনাজনিত ও অনিচ্ছাকৃত (Loss to be accidental and un-intentional):
বীমাযোগ্য ক্ষতিটিকে কেন্দ্র করে কিছু অনিশ্চয়তা থাকতেই হবে। অন্যথায়, সেখানে কোন ঝুঁকি থাকবে না। আর, ঝুঁকি না থাকলেতো বীমারই প্রয়োজন হয় না, যেহেতু, বীমার কাজই হলো ঝুঁকি দূর বা লাঘব করা। তবে, উক্ত অনিশ্চয়তা বা ঝুঁকিজনিত ক্ষতি হতে হবে কোন দুর্ঘটনা থেকে সৃষ্ট(সম্পত্তি বীমার ক্ষেত্রে) এবং অনিচ্ছাকৃত।
ইচ্ছাকৃতভাবে সৃষ্টি করা কোন ক্ষতিকে স্বাভাবিক ও সংগত কারণে বীমাকারীগণ লাঘব বা পূরণ করে দেয়ার চুক্তি গঠনে সম্মত হন না। কেননা, এভাবে সৃষ্ট ক্ষতি লাঘব বা পূরণ করে দেয়ার রেওয়াজ প্রচলিত থাকলে স্বভাবতঃই ক্ষতি এবং সেলামীর পরিমাণ বেড়েই চলত। আবার, সেলামীর পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে প্রকারান্তরে বীমাপত্র ক্রয়ের পরিমানও হয়ে পড়ত সীমিত এবং সে কারণেই বীমার ক্ষেত্রে বিপুল সংখ্যার (বীমাযোগ্য ঝুঁকির) নীতিটি অকৃতকার্যতায় পর্যবশিত হয়ে পড়ত যা ফলশ্রুতিতে বীমাকারীদের জন্যে সম্ভাব্য ঝুঁকি নিরূপণের ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করত।
[ অভিজ্ঞতার নিরীখেই বলা হয় যে বীমা হলো এমন একটি পণ্য (সেবা) হা অবশ্যই ক্রয়কৃত বা সংগৃহীত হতে হবে প্রয়োজনের আগেই। কেননা শুরু হয়ে যাওয়া কোন অগ্নিকাণ্ড বা অগ্নি বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে কোন অগ্নি বীমাপত্র ক্রয় করতে যাওয়া নিঃসন্দেহে একটি বিলম্বিত উদ্যোগ (“Insurance is one commodity that must be purchased before it is needed Once the fire starts. It is too late to buy fire insurance”] উপরোক্ত উক্তিটি পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় যে -ক্ষতি অবশ্যই নিশ্চিত হবে। না, তাহলে, তাতে বীমার মূল অপরিহার্যতা থাকে না।
অর্থাৎ, কোন ক্ষতিকে পুরণ করে দেয়ার বীমা গ্রহণ করা হয় না। বরং, সংঘটিত হতেও পারে অথবা নাও হতে পারে এমন কোন ক্ষতি সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা দুরীকরণের – প্রতিশ্রুতি প্রসুত ব্যবস্থাই হলো বীমা । থেকে দেখা গেলে বুঝা যায় যে বীমা কোন ক্ষতি সংঘটিত হওয়ার প্রাক্কালেই প্রধান ভূমিকা পালন করে।
যাই হোক, উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বোধগম্য যে-বীমাযোগ্য ঝুঁকি হতে হলে :- (১) ক্ষতিটিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা বিদ্যমান থাকতে হবে অর্থাৎ, ক্ষতিটি হবেই এরূপ নিশ্চয়তা অথবা খুব শীঘ্র হচ্ছে, খুব মারাত্মক হবে অথবা খুব সামান্য হবে, ক্ষতি সম্পর্কে এরূপ প্রাকনিশ্চিত ধারণা বীমাযোগ্য ঝুঁকির অপরিহার্য শর্ত বা উপাদান নয় ; বরং, ক্ষতি হতেও পারে, নাও হতে পারে এরূপ অনিশ্চয়তা এবং ক্ষতির মাত্রা, কাল ইত্যাদি সম্পর্কেও অনিশ্চয়তা থাকতে হবে।
(2) উক্ত ক্ষতি হতে হবে সঙ্গতকারণেই দুর্ঘটনাজনিত এবং (২) স্বভাবতঃ তা হবে একান্তই অনিচ্ছাকৃত।
(গ) ক্ষতি নির্দ্ধারণযোগ্য বা নির্ণেয় ও পরিমাপযোগ্য হতে হবে (Loss to be determinable and measurable) :
ক্ষতি অবশ্যই স্থান ও কাল মাফিক সুনির্দিষ্ট হতে হবে। যদিও, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সহজেই ক্ষতি নিরূপিত হলে এবং সঠিকভাবে ক্ষতি পরিমাপযোগ্য হলে এ উপাদানটিকে অহেতুক সংযোজন বলে মনে হতে পারে; অথচ, এমন কতগুলি ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে ক্ষতি চিহ্নিত বা নির্ণয় করা এবং তার যথার্থ পরিমাপ করা বীমাকারীদের জন্যে প্রকৃতপক্ষেই একটি দূরপনেয় সমস্যা।
যেমন : – স্বাস্থ্যবীমায় কোন বীমাগ্রহীতা যদি তার চাকুরীকালীন পেশাগত দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ কর্মক্ষমতা হারায়— তদজনিত ঝুঁকি তথা আর্থিক ক্ষতি বীমাকারী মাসিক হারে পূরণ করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বীমাকৃত ব্যক্তি পেশাগত দায়িত্ব পালনে অক্ষম কিনা তা নির্ধারণ কিভাবে করবেন? মূলতঃ বীমাকৃত ব্যক্তির কথাই তা নির্ধারণের উৎস বা পন্থা। কিন্তু, কোন অসৎ ব্যক্তি এ ব্যাপারে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ক্ষতিপূরণ আদায়ের অপচেষ্টা করতে পারে। তাহলে, বীমাযোগ্য ঝুঁকির দ্বিতীয় উপকরণ বা শর্তটি ( অর্থাৎ ক্ষতিটি হতে হবে অনিচ্ছাকৃত) পালিত হবে না।

এমনকি, কোন কোন ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই যদি বোঝা যায় যে ক্ষতি সংঘটিত হয়েছে, তথাপি তা পরিমাপ করা কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। যেমন : – দুঃখ কষ্ট থেকে উদ্ভূত ক্ষতি অথবা কোন পরিবহন দুর্ঘটনার ক্ষতিও নিরূপণ করা সব সময় সমজসাধ্য না হতে পারে। আবার, কোন পণ্যবাহী জাহাজ ডুবে গেলে সমন্বয়কারী কর্মকর্তাদের জন্যে মাসের পর মাস কখনও বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে তার ক্ষতি নির্ণয় করতে বা সঠিকভাবে পরিমাপ করতে।
(ঘ) ক্ষতিটি কোন আকস্মিক মহাদুর্যোগ থেকে পষ্ট হে চলবে না (Loss not to be subject to catastrophie hazard) :
অবস্থা যদি এমন হয় যে-কোন আকস্মিক মহাদুর্যোগের কবলে পড়ে অথবা এই মহাবিপদে আক্রান্ত হয়ে নিষ্কাষিত শ্রেণীর বিষয়বস্তুর সম্পূর্ণটাই অথবা প্রায় সবটার ক্ষতির সম্মুখীন হয়, তাহলে তা বীমাযোগ্য ঝুঁকি হিসেবে পরিগণিত হবে না। – বাन বা মহাপ্লাবন অথবা ব্যাপক ঘূর্ণিঝড়ের ফলে কোন ভৌগলিক এলাকার প্রায় সবটাই ব্যাপক ক্ষতির শিকার বা নিশ্চিত হয়ে যেতে পারে।
ভাগ্যক্রমে, যদি তার এরূপ কোন এলাকায় রক্ষিত বা স্থিত বীমাকৃত বিষয়বস্তু বা সম্পদ-সম্পত্তির অধিকাংশই ধংস হয়ে যায়, তাহলে খুব স্বাভাবিক কারণেই উরু বীমাকারীকে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় যা আদৌ প্রত্যাশিত ছিল না। তাই, বীমাকারীগণ অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধিমত্তার আলোকে এরূপ ঝুঁকি থেকে সর্বদাই নিরাপদ দূরত্বে থেকে এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করেন।
