বীমাচুক্তি ও বাজিচুক্তির মধ্যে তুলনা

বীমাচুক্তি ও বাজিচুক্তির মধ্যে তুলনা – পাঠটি “বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা” বিষয়ের “বীমার মৌলিক ও সাধারণ আধেয়সমূহ” অধ্যায়ের একটি পাঠ। বীমার মৌলিক ও সাধারণ আধেয়সমূহ, সাদৃশ্য বা মিল(Similarity) বীমাচুক্তি ও বাজি ধরার চুক্তি বা জুয়া চুক্তি একই ধরনের চুক্তি বলে মনে হতে পারে। কেননা, এক সময় বীমা চুক্তিকে ফটকার বা ফটকাবাজির চুক্তি (Contract of Speculation) বলা হতো। বাজি ধরার চুক্তিতে কোন অনিশ্চিত ঘটনার উপর আর্থিক লেনদেনের অঙ্গীকার করা হয়।

যেমন:- কোন ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার ব্যাপারে দু’পক্ষ বা ব্যক্তির মধ্যে বাজি ধরা হতে পারে। তেমনি, বীমাচুক্তিতেও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত ঘটনার জন্যে সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণের লক্ষ্যে চুক্তি সম্পাদিত হয়ে থাকে। একারণেই, Lord Mansfield in Carter Vs Buchu ( 1765 ) – Sm L. C (546) – মামলাটির রায় প্রসঙ্গে বলা হয়েছিল – “Insurance is a Contract on Speculation (বীমা হলো ভবিষ্যৎ অনুমান বা দূরকল্পনা ভিত্তিক একটি চুক্তি)”।

বীমাচুক্তি ও বাজিচুক্তির মধ্যে তুলনা

 

বীমাচুক্তি ও বাজিচুক্তির মধ্যে তুলনা | বীমার মৌলিক ও সাধারণ আধেয়সমূহ | বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা

 

বৈসাদৃশ্য বা গড়- মিল বা পার্থক্য(Differences ) অবশ্য Speculation -এর বাংলা প্রতিশব্দ পূর্ব-ধারণাও হয়। তাতে কিন্তু, তাৎপর্যগত প্রভেদও লক্ষ্যযোগ্য। সে যাই হোক, আধুনিক আইনজীবীগণ সঙ্গতকারণেই এ প্রসঙ্গে অর্থবহ ভিন্নমত পোষন করে থাকেন। আধুনিক মতে বীমাচুক্তি কোন বাজিচুক্তি নয়; বরং, এটি এমন একটি চুক্তি যেখানে চুক্তির বিষয়বস্তুতে চুক্তিভুক্ত পক্ষসমূহ বিশেষতঃ বীমাকৃত ব্যক্তি বা বীমাপত্রধারীর স্বার্থ জড়িতথাকে।

অন্যদিকে, বাজিচুক্তি হচ্ছে –এমন এক সম্মতি যেখানে সম্মতির বিষয়বস্তুতে পক্ষসমূহের কোন সঙ্গত স্বার্থ জড়িত থাকে না এবং যে সম্মতি আইনে বলবৎযোগ্য নয়, প্রকৃতপক্ষে তা কোন চুক্তি হিসেবেও পরিগণিত নয়। প্রসঙ্গতঃ Wilson vs Jones (L., R 2 Ex 141] – মামলার রায়ে বিচারপতির অভিমতটি প্রনিধানযোগ্য। তার মতে – “ একটি জুয়াচুক্তি ও একটি জুয়াচুক্তি নয়” – এ দুয়ের মধ্যে প্রধান পার্থক্য নির্ভর করে চুক্তিকারীদের চুক্তির বিষয়বস্তুতে কোন স্বার্থ আছে কিনা তারই উপর।

সুতারাং, উপরোক্ত আলোচনায় এটি স্পষ্ট যে, বীমাচুক্তি ও বাজি চুক্তিতো এক নয়ই ; বরং, একটি চুক্তি – অপরটি আদৌ কোন চুক্তি নয়। নিম্নে তাই বীমাচুক্তি ও বাজিচুক্তির মধ্যে পার্থক্যসমূহ সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো : –

 

১. বীমাযোগ্য স্বাথ ( Insurable Interest) :

বীমাচুক্তিতে বীমাযোগ্য স্বার্থ থাকে; কিন্তু, বাজিচুক্তিতে তা থাকে না।

 

২. স্বার্থ সংরক্ষণ (Protection of Interest) :

বীমাচুক্তিতে কোন একটি স্বার্থ রক্ষাই হচ্ছে উদ্দেশ্য। পক্ষান্তরে, বাজিচুক্তির উদ্দেশ্য হচ্ছে – অর্থের বিনিময়ে জুয়াখেলা বা বাজিধরা।

 

৩ গণনীতি বা জনস্বার্থ’ (Public Policy or Public Interest) :

রীমাচুক্তি গণনীতি সাপেক্ষ এবং জনস্বার্থ রক্ষাকারী; পক্ষান্তরে, বাজিচুক্তি গণনীতি ও জনস্বার্থ পরিপন্থী।

 

৪ বলবৎযোগ্যতা তথা বৈধতা (Enforceability or Validity):

উপরোক্ত কারণেই বীমাচুক্তি বৈধ চুক্তি এবং বাজিচুক্তি অবৈধ চুলি বলে পরিগণিত। অর্থাৎ, রাজিচুক্তি প্রকৃতপক্ষে কোন চুক্তি নয়।

 

৫. ক্ষতিপূরণ (Indemnity):

জীবন বীমা ছাড়া অন্যান্য বীমাচুক্তি ক্ষতিপূরণের নীতির উপর ভিত্তি করে গঠিত হয়ে থাকে। কিন্তু, বাজিচুক্তিতে ক্ষতিপুরণের কোন প্রশ্নই আসে না।

 

৬. সন্ধিশ্বাস (Good falth) :

বীমাচুক্তি পক্ষসমূহের পারস্পরিক একান্ত বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে গঠিত হয় বলে বীমাচুক্তিকে চূড়ান্ত সন্ধিশ্বাসের চুক্তি (Contract of utmost good faith) বলা হয়, কিন্তু, বাজিচুক্তিতে সন্ধিশ্বাসের তেমন কোন অবকাশ নেই।

 

৭. কিস্তি ( Premium) :

বীমাচুক্তিতে কিস্তি প্রদান করা হয়ে থাকে। কিন্তু, বাজি ধরার চুক্তিতে এমন কোন বিষয় নেই।

 

৮. ঝুঁকি (Risk) :

বীমাচুক্তিতে কোন অনিশ্চিত ঘটনাজনিত সম্ভাব্য ক্ষতির ঝুঁকি লাঘব বা দুর করার জন্যে বীমাকারীর উপর ন্যস্ত করা হয় কিন্তু, বাজিচুক্তিতে ঝুঁকি সৃষ্টি করা হয় এবং তা উভয় পক্ষের উপর সমভাবে বর্তমান থাকে।

 

৯. বৈজ্ঞানিক হিসাব ( Scientific Calculation) :

বীমাচুক্তি হিসেব ও বিশ্লেষণের উপর নির্ভর করে গঠিত হয়; কিন্তু, বাজিচুক্তিতে বৈজ্ঞানিক হিসেব নয়, বরং সম্ভাবনার উপরই নির্ভর করা হয়।

 

১০ বৈধ প্রতিদান ও উদ্দেশ্য (Legal Consideration & Objective) :

বীমাচুক্তিতে বৈধ প্রতিদান ও উদ্দেশ্য থাকতে হয়। কিন্তু, বাজিচুক্তিতে সে প্রশ্ন আসে না।

 

বীমাচুক্তি ও বাজিচুক্তির মধ্যে তুলনা | বীমার মৌলিক ও সাধারণ আধেয়সমূহ | বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা

 

১১. আনুষ্ঠানিকতা (Provisions or Formalities) :

বীমাচুক্তি গঠনে নিদ্ধারিত কিছু নিয়ম-কানুন বা আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে হয়; কিন্তু, কাজি চুক্তির ক্ষেত্রে তার প্রশ্ন আসে না।

 

১২. মেয়াদ (Duration) :

বীমাচুক্তিতে সাধারণতঃ নিদ্ধারিত এবং কখনও দীর্ঘ মেয়াদ বা সময়ের প্রশ্ন থাকে ; কিন্তু, রাজিচুক্তি সাধারণতঃ তাৎক্ষনিক বিষয়।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে বীমাচুক্তি যে একটি বৈধ চুক্তি এবং যে প্রকৃত প্রস্তাবে আদৌ কোনচুক্তি নয়, তা সহজেই অনুহেয়। অর্থাৎ, চুক্তি গঠনের জন্যে প্রয়োজনীয় উপাদান বাজি ধরার সম্মতিতে থাকে না।

Leave a Comment