আজকের আলোচনার বিষয় “ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা বীমাপত্রের প্রকারভেদ ” যা সামাজিক ও অন্যান্য ধরনের বীমাসমূহ অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।
Table of Contents
ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা বীমাপত্রের প্রকারভেদ

দুর্ঘটনা বীমা তথা ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা বীমার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার সাথে সাথে বিভিন্ন প্রকার ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা বীমার প্রবর্তন হতে থাকে। নিম্নে ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা বীমাপত্রের প্রকারভেদ উল্লেখ করা হলো :
১. দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বীমা (Accidental Death Insurance)
২. দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বা অক্ষমতা ধীমা | Accidental Death and Disability Insurance).
৩. নির্দিষ্ট রোগ ও দুর্ঘটনা বীমা ( Specified Disease and Accident Insurance)
৪. সকল প্রকার অসুস্থতা ও দুর্ঘটনা বীমা ( All Sickness and Accident Insurance).
৫. হাসপাতাল ও চিকিৎসা ব্যয় বীমা ( Hospitalization and Medical Expenses Insurance)
৬. প্রিমিয়াম মওকুফ সুবিধা ( Waiver of Premium Benefits)।
নিম্নে উপরোক্ত ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা বীমাসমূহের উপর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রদান করা হলোঃ
১. দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুবীমা ( Accidental Death Insurance) :
মারাত্মক কোন দুর্ঘটনার কারণে আহত হয়ে কোন মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এ ধরনের মৃত্যু ঝুঁকির বিরুদ্ধে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বীমা গ্রহণ করা হয়। দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার তারিখ থেকে পরবর্তী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বীমাগ্রহীতার মৃত্যু হলে তার উত্তরাধিকারীকে বীমাকারী বীমাকৃত অর্থ পরিশোধ করে দেন। রেলগাড়ীতে বা বাসে যাতায়াতকালীন অথবা কোন থিয়েটার বা সিনেমা হলে অবস্থানকালে প্রচণ্ড কোন দুর্ঘটনায় আহত হয়ে বীমাপত্রে উল্লেখিত সময়ের মধ্যে বীমাগ্রহীতা মারা গেলে এবং এ ধরনের বীমা করা থাকলে বীমাগ্রহীতাকে বীমাকৃত অর্থের দ্বিগুণ পরিশোধ করা হয়।
২। দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বা অক্ষমতা বীমা ( Accidental Death and Disability Insurance) :
কোন আকস্মিক দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত হয়ে কোন মানুষ মারা যেতে পারেন, আবার বীমাগ্রহীতা চিরদিনের জন্যে অক্ষম হয়ে যেতে পারেন অথবা শরীরের কোন কোন অপরিহার্য অঙ্গ হারিয়ে অকেজো হয়ে যেতে পারেন। দুর্ঘটনায় আহত হয়ে এরূপ দুর্ভাগ্যজনকভাবে যে মানুষটি ছিলেন পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনিই পরিবারে বোঝা হয়ে পড়তে পারেন। এরূপ ক্ষেত্রে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু ও অক্ষমতা বীমা গ্রহণ করা থাকলে বীমাকারীর কাছ থেকে যে সুবিধা পাওয়া যায়, তাতে একদিকে পঙ্গু ও অক্ষম ঐ মানুষটি (বীমাগ্রহীতা) যেমন পরিবারে নিজের সম্মানজনক অবস্থা বজায় রাখতে পারেন, তেমনি পরিবারের সচ্ছলতারও নিশ্চয়তা দিতে পারেন।
নিম্নে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু ও অক্ষমতা বীমার সুবিধাসমূহ উল্লেখ করা হলো
বহিঃস্থ এবং দৃষ্টিগ্রোচর । Exernal & Visible) মারাত্মক কোন দুর্ঘটনার কারণে বীমাগ্রহীতার
(ক) মৃত্যু হলে মোট বীমাকৃত অর্থ পরিশোধ্য হয় ;
(খ) দেহের দু’টি অঙ্গ বা দু’টি চোখ অথবা একটি অঙ্গ ও একটি চোখ নষ্ট হয়ে গেলে মোট বীমাকৃত অর্থ পরিশোধ্য হয় ;
(গ) দেহের যে কোন একটি অঙ্গ বা একটি চোখ নষ্ট হয়ে গেলে অবস্থানুযায়ী বীমাকৃত অর্থের শতকরা ১০ থেকে ১০ ভাগ পর্যন্ত পরিশোধ্য হয়
(ঘ) বীমাগ্রহীতা স্থায়ীভাবে সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে গেলে মোট বীমাকৃত অর্থ নগদ বা নির্দ্দিষ্ট কিস্তিতে পরিশোধ্য হয়।
রেলগাড়ী বা বাসে যাতায়াত কালে অথবা বীমাপত্রে বিশেষভাবে বর্ণিত কোন দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা অক্ষমতা অথবা অঙ্গহানি ঘটলে উপরোক্তভাবে পরিশোধ্য অঙ্কের দ্বিগুণ অর্থ পরিশোধ করা হয়।
আর, দুর্ঘটনায় আহত হয়ে সাময়িকভাবে অক্ষম হয়ে পড়লে বীমাগ্রহীতাকে সাধারণতঃ প্রতি হাজার টাকার বীমায় ৫ টাকা সাপ্তাহিক অক্ষমতা ভাতা প্রদান করা হয় এবং অক্ষমতা আংশিক হয়ে থাকলে হাজার প্রতি ১.২৫ টাকা সাপ্তাহিক অক্ষমতা ভাতা পরিশোধ্য হয়।
৩. নিদ্দিষ্ট রোগ ও দুর্ঘটনা বীমা ( Specified Disease and Accident) :
মানুষ আকস্মিক দুর্ঘটনায় কবলিত হয়ে মারা যেতে পারে বা অক্ষম হয়ে যেতে পারে, তেমনি আকস্মিক বা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেই কোন মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে অকেজো হয়ে যেতে পারেন। এরুপ অনিশ্চয়তার বা দুর্ভাগ্যজনক অবস্থার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ও ঘটনা ধীমা প্রদান করা হয়। এরূপ বীমাকে “নির্দিষ্ট রোগ বা দুখীমানিত অক্ষমতা বীমা ও বলা হয়। এ ধরনের বীমাপার বীমাকারী নির্দিষ্ট কতকগুলি রোগের নাম উল্লেখ করে থাকেন। কোন কোন কোম্পানী বা বীমাকারী ৭০/৮০ প্রকার রোগের নাম তালিকাভুক্ত করে রাখেন।
তালিকাভুক্ত যে কোন রোগে আক্রান্ত হয়ে বীমাগ্রহীতা অকেজো হয়ে পড়লে সাধারণ দুর্ঘটনাজনিত অক্ষমতায় প্রদত্ত হারে সাপ্তাহিক ভাতা প্রদান করা হয়। কোন কোন বীমাকারী বা বীমা কোম্পানী ৫২ সপ্তাহ পর্যন্ত, আবার কোন কোন কোম্পানী ১২০ সপ্তাহ পর্যন এরূপ সুবিধা প্রদান করে থাকেন। তবে, এক সময়ে কোন কোম্পানীই ৫২ সপ্তাহের বেশী এরূপ সুবিধা প্রদান করত না।
৪. সকল অসুস্থতা ও দুর্ঘটনা বীমা ( All Sickness and Accident Insurance) :
যেকোন প্রকার রোগজনিত অসুস্থতার কারণে মানুষ সামষ্টিকভাবে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে। এরূপ অসুস্থতা জনিত সাময়িক অক্ষমতার বিরুদ্ধে এ ধরনের বীমাপত্র প্রদান করা হয়। তবে, আমাদের দেশে এর প্রচলন নেই বললেই চলে। উন্নত দেশগুলোতেও এ ধরনের বীমাপত্র দায়িত্বশীল বা উচ্চ শ্রেণীর মানুষের জন্যে প্রদান করা হয়। কেননা, দায়িত্বহীন বা নীতিজ্ঞানহীন মানুষ এ থেকে অন্যায় সুযোগ গ্রহণ করার চেষ্টা করতে পারে।
৫. হাসপাতাল ও চিকিৎসা ব্যয় বীমা ( Hospitalization and Midical Expenses Insurance):
মারাত্মক দুর্ঘটনায় আহত হলে বা রোগে আক্রান্ত হলে তার চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে অনেকের পক্ষেই তা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এরূপ ক্ষেত্রে বীমাগ্রহীতা চাইলে উপযুক্ত বাড়তি প্রিমিয়াম দিয়ে দুর্ঘটনা বা নির্দিষ্ট অথবা সকল প্রকার রোগজনিত অক্ষমতাবীমার সাথে হাসপাতাল • চিকিৎসা ব্যয় বীমাগ্রহণ করতে পারেন। নির্দিষ্ট ধরনের চিকিৎসার জন্য সর্বোচ্চ যত টাকা প্রয়োজন হতে পারে তার জন্যে বীমা গ্রহণ করা যায়। বীমাগ্রহীতা চিকিৎসার জন্যে হাসপাতাল বা যে ধরনের চিকিৎসালয়ে অবস্থান করেন, বীমাকারী শর্তানুযায়ী বীমাকৃত অর্থ সে হাসপাতাল বা চিকিৎসালয় অথবা চিকিৎসককে পরিশোষ করতে পারেন; আবার বীমাগ্রহীতাকে প্রদান করতে পারেন।
৬. প্রিমিয়াম মওকুফের সুবিধা ( Walver of Premium Benefits) :
কখনও কোন (ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা) বীমাপরধারী বা বীমাগ্রহীতা কোন দুর্ঘটনা বা রোগ-ব্যধির কারণে অক্ষম হয়ে পড়লে আর প্রিমিয়াম প্রদান করতে পারেন না বা তার কাছ থেকে প্রিমিয়াম আদায় করা সম্ভবপর হয়না। ফলে, বীমাপত্র বাতিল হয়ে যায়। এরূপ ক্ষেত্রে বীমাকারীগণ বীমাকারীদের সুবিধা দানের উদ্দেশ্যে প্রিমিয়াম মওকুফের ব্যবস্থার প্রচলন করেন। অর্থাৎ, প্রিমিয়াম মওকুফের মাধ্যমে অক্ষম বীমাগ্রহীতাকে বীমাপত্র বাতিলের হাত থেকে রক্ষা করেন। সাধারণতঃ দু’টি অবস্থার প্রেক্ষিতে এরূপ সুবিধা প্রদান করা হয়। যথা :-
(ক) আকস্মিক দুর্ঘটনার ফলে বীমাগ্রহীতা শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়লেএবং
(খ) মারাত্মক রোগ-ব্যাধির জন্যে বা অন্য কোন কারণে বীমাগ্রহীতা শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়লে।

ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা বীমা সাধারণত : দুর্ঘটনা বীমা বিভাগের অন্তর্ভুক্ত থাকে। কিন্তু, আমাদের দেশে প্রচলিত বিধি মোতাবেক জীবন বীমার সাথে অতিরিক্ত চুক্তি হিসেবেও ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা বীমাচুক্তি করা যায়। আর, তার জন্যে অতিরিক্ত চুক্তির প্রিমিয়াম জীবন বীমার প্রিমিয়ামের সাথেই প্রদান করতে হয়।
