বীমার সংজ্ঞা ও তাৎপর্য

বীমার সংজ্ঞা ও তাৎপর্য – নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা” বিষয়ের ” বীমার মৌলিক ও সাধারণ আধেয়সমূহ ” বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ।

বীমার সংজ্ঞা ও তাৎপর্য

বীমার সংজ্ঞা ও তাৎপর্য | বীমার মৌলিক ও সাধারণ আধেয়সমূহ | বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা

 

 

শুধু মানুষ কেন জীব মাত্রেই চায় তার বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ জীবনে ক্ষুধা, অকালমৃত্যু ও অন্যবিধ অনাকাঙ্খিত অথচ সম্ভাব্য বিপর্যয়জনিত অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকতে। তবে, মানুষ যেহেতু জীবন ও জগতের উৎস থেকে প্রাপ্ত সর্বাধিক সুযোগ-সুবিধা লাভ করে সমাজবদ্ধ ও সভ্য হতে পেরেছে – সে ক্রমাগতভাবে ঐসব অনিশ্চয়তাকে জয় করে চলেছে বিভিন্ন উপায় অবলম্বনে।

তার একটি অন্যতম উপায় হলো আধুনিক কালের বীমা (Insurance) ব্যবস্থা। চিন্তার ও সভ্যতার ধারায় মানুষ শুধু তার জীবন নয় — জীবনের জন্যে অপরিহার্য সম্পদ-সম্পত্তির নিরাপত্তা ও রক্ষা-ব্যবস্থার কথাও কম ভাবছে না। আজ বীমা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ হচ্ছে বিভিন্নভাবে ও দ্রুতগতিতে। প্রসঙ্গতঃ অনুধাবনেয় যে – আজ বীমা একটি বহুল পরিচিত ও ব্যবহৃত ব্যবস্থা বটে; কিন্তু, প্রাথমিক পর্যায়ে স্বাভাবিক কারণেই তা যে এমনটি ছিলো না, তা ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না। তাই, বীমার উপরোক্ত বিভিন্ন অবস্থা, ক্রমবিকাশ ও পরিবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটেই বিভিন্নভাবে বীমার সংজ্ঞাদান ও বীমা প্রসঙ্গে অভিমত ব্যক্ত করা হয়েছে।

বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ও চিন্তার আলোকে বিভিন্ন গ্রন্থকার, লেখক ও বীমা বিশেষজ্ঞ বীমা সম্পর্কে যেসব সংজ্ঞা ও অভিমত প্রদান করেছেন তার কয়েকটি নিম্নে বর্ণিত হলো :

অধ্যাপক মার্ক, আর, গ্রীণি (Mark. R. Greene)

বীমার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে। প্রাক-ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, বীমাকে দু’টি প্রধান বিষয়ের আলোকে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে। যথাঃ – (১) সুনির্দিষ্ট কার্যাবলী সম্পাদনের জন্যে একটি আর্থিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এবং (২) দু’টি পক্ষের মধ্যে বৈধ চুক্তি হিসেবে। কেননা, এ দু’টি দিকের কোন একটির উপর নির্ভর করে সংজ্ঞা প্রদান করলে তা সম্পূর্ণ হয় না। তাই, তিনি উক্ত দু’টি দিকের প্রতি লক্ষ্য রেখেই যে সংজ্ঞাটি দিয়েছেন তা হলো—

is an economic institution that reduces risk both to society and to individuals by combining under one management a large group of objects so situated that the aggregate losses to which society is subject become predictable within narrow limits Insurace is usually effected by and can be said to include all legal contracts under which the insurer. for consideration, promises to reimburse the insured for any loss suffered during the term of the agreement ”

– অর্থাৎ, বীমা হচ্ছে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান যা একটি বিপুল বিধেয়-সমষ্টি (বিপদাশঙ্কা/বিষয়াবলী/উপকরণাদি)-কে একটি ব্যবস্থাপনার অধীনে একত্রিত করে এমনভাবে স্থাপন বা বিন্যস্ত করে যাতে অভি সহজেই কোন সমুদয় ক্ষতি সম্পর্কে পূর্বানুমান করা যায় এবং এভাবে যা সংঘ /সমিতি ও ব্যক্তি – এ উভয়েরই ঝুঁকি লাঘব করে থাকে। স্বভাবত চুক্তির মেয়াদকালীন সংগঠিত যে কোনো ক্ষতির জন্যে প্রতিদানের বিনিময়ে বীমাকারী  বীমাগ্রহীতাকে অর্থ পরিশোধে বা ক্ষতিপূরণ দানে প্রতিশ্রুত হন এমন সব চুক্তিকে বীমার অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এম. এন. মিশ্রও অন্য দু’টি দৃষ্টিকোণ থেকে বীমার সংজ্ঞা দান করেছেন। যথাঃ (১) কার্যভিত্তিক সংজ্ঞা | Functional Definition) ও (২) চুক্তি ভিত্তিক সংজ্ঞা (Contractual Definition)। কার্যভিত্তিক সংজ্ঞায় তিনি বলেছেন যে

“Insurance is a co-operative device to spread the loss caused by a particular risk over a number of persons, who are exposed to it and to agree to insure themselves against the risk (নির্দিষ্ট কোন ঝুঁকিজনিত ক্ষয়-ক্ষতিকে, উক্ত ঝুঁকির আওতায় যেসব ব্যক্তি থাকেন এবং যারা উক্ত ঝুঁকির বিরুদ্ধে নিজেদের রক্ষা বা নিষ্কৃত করতে চান, তাদের মধ্যে ঝুঁকি বন্টনের একটি সমবায় পন্থাকেই বীমা বলা হয়)।

[ উক্ত সংজ্ঞাটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে – বীমা হলো (ক) ঝুঁকি বন্টনের একটি সমবায় পন্থা, (খ) নির্দিষ্ট ঝুঁকির বিরুদ্ধে বীমাকৃত ব্যক্তিবর্গের মধ্যেই ঝুঁকিকে ছড়িয়ে বা বন্টন করে দেয়ার পদ্ধতি, (গ) ক্ষতির সম্ভাবনার প্রেক্ষিতে কোনো সংঘ বা মানবগোষ্ঠী (Society)-র প্রতিটি সদস্যের ক্ষতির অংশ গ্রহণ/বহন-এর নীতি এবং (ঘ) বীমাগ্রহীতাকে ক্ষতির বিরুদ্ধে নিরাপত্তা প্রদানের প্রক্রিয়া।]

 

আবার, চুক্তিভিত্তিক সংজ্ঞায় তিনি বলেছেন —

“Insurance is that in which a sum of money as a premtum is paid in consideration of the insurers incurring the risk of paying a large sum upon a given contingeny”

– অর্থাৎ, বীমা হলো এমন কিছু (চুক্তি) যার মাধ্যমে কোন স্বীকৃত আকস্মিক বিপর্যয়ের জন্যে বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধের ব্যাপারে বীমাকারী কর্তৃক ঝুঁকি বহনের বিনিময়ে বা প্রতিদানে বীমা সেলামী বা কিস্তি হিসেবে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের অর্থ পরিশোধ বা প্রদান করা হয়। এ সংজ্ঞাটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে বীমা হচ্ছে এমন একটি চুক্তি যেখানে (ক) প্রতিদান হিসেবে বা প্রতিদানে নির্দিষ্ট পরিমাণের বীমা কিস্তি বা সেলামী আরোপিত বা ধার্যকৃত হয়

(খ) উক্ত প্রতিদানের বিপরীতে কিস্তি বা সেলামীগ্রহীতা (বীমাকারী) কর্তৃক একটি বিপুল পরিমাণের অর্থ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়, (গ) পরিশোষটি হয় নির্দিষ্ট পরিমাণের অর্থে (যেমন:- সৃষ্ট বা সংঘটিত ক্ষতির সমপরিমাণ অর্থ বা বীমাপত্রের মূল্য – এর যে কোনটি হতে পারে) এবং (ঘ) পরিশোষটি কেবলমাত্র কোন ঘটনা বা দুর্ঘটনা সংঘটনের উপরই নির্ভর করে।

এম. কে ঘোষ ও এ.এন. আগরওয়ালা

আবার দুটি দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বীমার সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। যেমনঃ (১) প্রাথমিক বা প্রাচীন পদ্ধতি (Primary approach) ও (২) আধুনিক পদ্ধতি (Modern approach)। প্রাচীন ধরন মোতাবেক তারা বীমার সংজ্ঞায় বলেছেন যে)-

Insurance is a co operative form of distributing a certain risk over a group of persons who are exposed to it”-

অর্থাৎ, (যেসব ব্যক্তি কোন নির্দিষ্ট ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারেন অথবা ঝুঁকির আওতাধীন থাকেন তাদের মধ্যে উক্ত ঝুঁকি বন্টনের সমবায় বা যৌথ প্রক্রিয়কে বীমা বলে।) (আর, আধুনিক পন্থা অনুযায়ী বীমার সংজ্ঞায় তারা বলেছেন) Insurance in the new form may be defined as a contract whereby one party agrees to indemnify the other party against a loss which may arise, or to pay a certain sum of money on the happening of a certain event, in return of a compensation called premium.”

(অর্থাৎ, বীমা হচ্ছে এমন একটি চুক্তি বা ব্যবস্থা যার মাধ্যমে সম্ভাব্য কোন ক্ষতিপূরণ করে দিতে অথবা বীমাকিস্তি বা সেলামী নামে অভিহিত আর্থিক ক্ষতি স্বীকারের বদৌলতে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা বা দুর্ঘটনা সঙ্ঘটনের প্রেক্ষিতে সৃষ্ট কোন ক্ষতিপুরণ করে দেয়ার জন্যে এক পক্ষ অপর পক্ষে কাছে প্রতিশ্রুত হন। )

( অধ্যাপক মর্গ্যান (Morgan)-এর মতে “Insurance is the agreement of a community to consider the good of L individual members as common (সাধারণভাবে কোন এক মানবগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের প্রত্যেক ব্যক্তির কল্যাণ বিধানের প্রয়াসে বা চিন্তায় গঠি সম্মতিই হলো বীমা”) 

 

বীমার সংজ্ঞা ও তাৎপর্য | বীমার মৌলিক ও সাধারণ আধেয়সমূহ | বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা

 

আরউইন এম. টেলর (Irwin M. Taylor) তার Law of Insurane এ বীমার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন)/ The insurance contract is agreement by one party to assume another’s risk of loss in consideration for the payment of a premium, as part of a general scheme for the assumption of similar risk বীমা চুক্তি হলো সেলামী বা প্রিমিয়াম পরিশোষের প্রতিদানে এক পক্ষ কর্তৃক অপর পক্ষের উপর সম্ভাব্য ক্ষতির ঝুঁকি গ্রহণ সংক্রান্ত সম্মতি বা এরূপ অনেক ঝুঁকির দায়িত্ব গ্রহণের সাধারণ প্রকম্প বা ব্যবস্থার অংশ বিশেষ)। আবার, কারবারের বন্টন শাখা তথা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ঝুঁকি সংক্রান্ত অসুবিধা দুরীকরণের উপায়কেও বীমা বলা হয়।

মোট কথা, মানুষের জীবন অথবা সম্পদ-সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বা সম্ভাব্য বিপদ মোকাবেলার জন্যে অথবা ঝুঁকি লাঘব করতে কিংবা সম্ভাব্য ক্ষতিপুরণ গ্রহণ/ প্রদানের উদ্দেশ্যে একটি সমবায় পন্থা অথবা এক পক্ষ কর্তৃক প্রদেয় অর্থের (সেলামী বা কিস্তির) প্রতিদানে অপর পক্ষ কর্তৃক নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে বা নির্দিষ্ট ঘটনা সংঘটনে অথবা সম্ভাব্য দুর্ঘটনা সংঘটনে এককালীন বা একাধিক বারে নির্দিষ্ট পরিমাণের অথবা চুক্তিমত অর্থ পরিশোধের বা ক্ষতিপূরণ দানের প্রতিশ্রুতিতে সৃষ্ট সম্মতি তথা ব্যবস্থাই হচ্ছে বীমা।

Leave a Comment