বীমা কোম্পানির পুনর্গঠনে নতুন অধ্যাদেশ: রেজল্যুশন তহবিলের বাস্তবতা নিয়ে সন্দেহ!

বাংলাদেশের বীমা খাতে নতুন সংস্কারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) বীমা আইন ২০১০ সংশোধন এবং একটি নতুন বীমাকারী রেজল্যুশন অধ্যাদেশ ২০২৫ এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে। সরকারী সংস্কারের অংশ হিসেবে এই অধ্যাদেশটি দেশের বীমা খাতের সংকট সমাধানের লক্ষ্য রাখে। এটি মূলত পলিসি হোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা, জনগণের আস্থা বৃদ্ধি, পাওনাদারদের ক্ষতি কমানো এবং দায়ী ব্যক্তিদের থেকে অর্থ ফেরত আনার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রণয়ন করা হয়েছে।

তবে, খসড়া অধ্যাদেশটির বাস্তবায়ন নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষত, অংশীজনদের কাছ থেকে সীমিত মতামত নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় বাজার বিশ্লেষণ এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন না করার কারণে এটি বীমা খাতের জন্য কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। খসড়ায় মোট ৯৭টি ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বীমা কোম্পানির পুনর্গঠনে রেজল্যুশন তহবিল গঠন, ব্রীজ বীমাকারী গঠন, প্রশাসক নিয়োগ, একীভূতকরণ, সাময়িক সরকারি মালিকানা এবং তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তরের মতো বিষয়গুলো।

প্রতিষ্ঠানগুলির মতামত এবং বিভিন্ন সংস্থার উদ্বেগ

এই খসড়া অধ্যাদেশ নিয়ে মতামত আহ্বান করা হয় চলতি বছরের জুন মাসে। তবে, দেশের ৮৪টি বীমা কোম্পানির মধ্যে মাত্র ১৫টি কোম্পানি মতামত প্রদান করেছে। এর মধ্যে ১০টি কোম্পানি অধ্যাদেশের খসড়ার সাথে একমত হলেও বাকি ৫টি কোম্পানি বিআইএ (বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন) এর মতামতকে তাদের মতামত হিসেবে উল্লেখ করেছে।

গুরুতর অর্থনৈতিক সংকটের মুখে বীমা কোম্পানিগুলো

এছাড়া, আইডিআরএ এর চেয়ারম্যান ড. এম আসলাম আলম, ২০২৪ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর ১৫টি লাইফ বীমা কোম্পানি এবং ১৭টি নন-লাইফ বীমা কোম্পানির আর্থিক অবস্থা উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানান। ৩,৬২৮ কোটি টাকার বীমা দাবি বকেয়া রয়েছে, যার মধ্যে বেশিরভাগ দাবি রয়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ, পদ্মা ইসলামী লাইফ এবং প্রোগ্রেসিভ লাইফ কোম্পানির।

আইডিআরএ’র সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে এই বকেয়া দাবির বিষয়টি উল্লিখিত হয়েছে, যেখানে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের বকেয়া দাবির পরিমাণ ২,৭৪৩ কোটি টাকা।

রেজল্যুশন তহবিলের বাস্তবতা এবং এর ভবিষ্যত

রেজল্যুশন তহবিলের মাধ্যমে বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক পুনর্গঠন করা হবে। তবে, অর্থায়নের উৎস নিয়ে সংশয় রয়েছে। সরকারের ঋণ, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ/অনুদান এবং অন্যান্য উৎস থেকে অর্থায়নের প্রস্তাব থাকলেও, আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দুর্বল বীমা কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তা বা ঋণ দেওয়া হওয়ার কোনো নজির নেই। ফলে, এই তহবিলের কার্যকরীতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

একীভূতকরণ এবং প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক

একীভূতকরণ এবং পুনর্গঠন বিষয়ে বিআইএ (বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন) কিছু নীতিমালা প্রস্তাব করেছে। তবে, একীভূতকরণের মধ্যে কোম্পানির অর্থ আত্মসাতের দায় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭২ সালে এমন একীভূতকরণ প্রয়োগ করা হয়েছিল, তবে এটি আর্থিক সমস্যার কারণে ছিল, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে আরও অনেক কঠিন হতে পারে।

অধ্যাদেশটির বাস্তবায়ন ও এর কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় রয়েছে। খাত সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, সরকারি মালিকানা ও বীমা কোম্পানির তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তর সংক্রান্ত ধারাগুলোর অপব্যবহার হতে পারে, যা খাতের জন্য আরও বড় সমস্যা তৈরি করবে।

Leave a Comment