বীমা কোম্পানির বর্ধিত নিবন্ধন ফি নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সাথে বিরোধ

দেশের বীমা খাতে নিবন্ধন নবায়ন ফি বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এবং বীমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে এক নজিরবিহীন আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। প্রচলিত বীমা আইন ও বিধিমালা উপেক্ষা করে ২০২৬ সালের জন্য অতিরিক্ত ফি দাবি করায় খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি আইডিআরএ বীমা কোম্পানিগুলোকে সংশোধিত বিধিমালা অনুসারে বাড়তি ফি পরিশোধের নির্দেশ দিলে এই সংকটের সূচনা হয়।


ফি বৃদ্ধির প্রেক্ষাপট ও আইনি অসংগতি

বীমা আইন-২০১০ অনুসারে, প্রতিটি বীমা কোম্পানিকে প্রতি বছর ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পরবর্তী বছরের নিবন্ধন নবায়নের আবেদন করতে হয়। ২০২৬ সালের জন্য কোম্পানিগুলো গত ২০২৫ সালের নভেম্বরেই তৎকালীন প্রচলিত হার (প্রতি হাজার গ্রস প্রিমিয়ামে ১ টাকা) অনুযায়ী ফি পরিশোধ করেছে। তবে গত ৪ ফেব্রুয়ারি সরকার ‘বীমা ব্যবসা নিবন্ধন ফি বিধিমালা-২০১২’ সংশোধন করে নতুন গেজেট প্রকাশ করে, যেখানে ফি’র হার প্রায় আড়াই গুণ বাড়ানো হয়েছে।

বীমা খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বীমা আইন বা আইডিআরএ আইনে ‘ভুতাপেক্ষা’ বা অতীতে কার্যকর হওয়া কোনো সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের এখতিয়ার নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দেওয়া হয়নি। ফলে পরিশোধিত ফি নতুন করে বাড়িয়ে আদায়ের দাবিকে আইনিভাবে অবৈধ ও স্বেচ্ছাচারী বলে অভিহিত করছেন কোম্পানিগুলোর মুখ্য নির্বাহীরা।

সংশোধিত বিধিমালার নতুন হার

সরকার ধাপে ধাপে বীমা কোম্পানির নিবন্ধন ফি বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী ফি’র হার নিচে দেওয়া হলো:

সময়কালপ্রতি হাজার গ্রস প্রিমিয়ামে ফি’র হারপূর্ববর্তী হার (প্রতি হাজারে)বৃদ্ধির হার
২০২৬ – ২০২৮২ টাকা ৫০ পয়সা১ টাকা১৫০%
২০২৯ – ২০৩১৪ টাকা ০০ পয়সা১ টাকা৩০০%
২০৩২ ও পরবর্তী৫ টাকা ০০ পয়সা১ টাকা৪০০%

‘দুয়ার সার্ভিস’ বিতর্ক ও এসএমএস চার্জ

অভিযোগ রয়েছে যে, ২০২৪ সালের জুলাই পরবর্তী সময়ে বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান ‘দুয়ার সার্ভিস লিমিটেড’-এর বকেয়া বিল পরিশোধের চাপ তৈরি হওয়ায় আইডিআরএ ফি বাড়ানোর এই পথে হাঁটে। বিনামূল্যে এসএমএস সার্ভিস দেওয়ার নামে বীমা কোম্পানিগুলোর ওপর এই বাড়তি ফি’র বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি অনেক কর্মকর্তার। আইডিআরএ বর্তমানে বাড়তি ফি পরিশোধ না করলে কোম্পানিগুলোর নিবন্ধন নবায়ন সনদ আটকে রাখছে এবং মৌখিকভাবে চাপ সৃষ্টি করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

খাত সংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ

বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরাম (বিআইএফ) এবং বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন (বিআইএ) এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। বিআইএফ-এর সেক্রেটারি জেনারেল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শফিক শামীম পিএসসি (অব.) এবং জেনিথ ইসলামী লাইফের মুখ্য নির্বাহী এস এম নুরুজ্জামানসহ অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের খরচ অলরেডি ২০২৫ সালের ব্যালেন্স শিটে দেখানো হয়ে গেছে। এখন নতুন করে বাড়তি ফি চাইলে তা কোম্পানিগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে।

এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী ইমাম শাহীন মনে করেন, সময় পার হওয়ার পর বিধিমালা সংশোধন করে পুনরায় ফি চার্জ করা আইনের লঙ্ঘন। এই বাড়তি খরচ কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক ব্যয় (Management Expense) বাড়িয়ে দেবে, যা গ্রাহক পর্যায়েও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

উপসংহার

বীমা কোম্পানিগুলোর দাবি অত্যন্ত পরিষ্কার— বর্ধিত ফি’র নিয়ম ২০২৭ সাল থেকে কার্যকর করা হোক। এতে কোম্পানিগুলো অগ্রিম প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পাবে এবং আইনি জটিলতা এড়ানো সম্ভব হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ যদি এই একতরফা সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা না করে, তবে বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে, যা দেশের নাজুক বীমা খাতের জন্য আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।

Leave a Comment