আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় সঞ্চিতি ও তহবিল বিনিয়োগ যা জীবন বীমা অধ্যায়ের অর্ন্তভুক্ত। অন্যান্য কারবারের রিজার্ভ বা সঞ্চিতির মত বীমার সঞ্চিতি সমার্থবহ নয়। বীমার ক্ষেত্রে সঞ্চিতির প্রকৃতি ও সংজ্ঞা ভিন্ন রকমের। অন্যান্য কারবারী ক্ষেত্রে মুনাফা থেকে সঞ্চিতি সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু, এক্ষেত্রে সঞ্চিতি হচ্ছে একটি দায় যা যখন প্রয়োজন মিটিয়ে দিতে হয়।
সঞ্চিতি ও তহবিল বিনিয়োগ

বীমার ক্ষেত্রে সঞ্চিতি ও তার উপর ধার্য্যকৃত সুদ সমন্বয়ে গঠিত হয়ে থাকে এবং যা বীমাদাবী পুরণের জন্যে পর্যাপ্ত। তবে, যুগ বিবর্তণের ধারায় বীমার ক্ষেত্রে উৎকর্য ও বিভিন্নতা সাধিত হয়েছে অনেক।তাই, বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো উক্ত সঞ্চিতি নির্ধারণের বা হিসেব করার জন্যে দু’টো পন্থা অবলম্বন করে থাকে।
যথাঃ (১) সম্মুখ বিবেচনা পদ্ধতি বা ভবিষ্যৎ পদ্ধতি (Prospective Method) এবং
(2)পশ্চাৎ বিবেচনা পদ্ধতি বা অতীত পদ্ধতি (Retrospective Method)। এ কারনেই দু’টি পন্থা অনুযায়ী সঞ্চিতির দুটি সংজ্ঞা রয়েছে।
ভবিষ্যৎ পদ্ধতি অনুযায়ী রিজার্ভ বা সঞ্চিতি হচ্ছে এমন একটি তহবিল যা ভবিষ্যৎ প্রিমিয়াম বা বীমা সেলামী ও সুদ সমন্বয়ে গঠিত এবং যা ভবিষ্যৎ বীমাদাবী পূরণের জন্যে পর্যাপ্ত। পক্ষান্তরে, অতীত পদ্ধতি (Retrospective Method) অনুযায়ী সঞ্চিতি হচ্ছে প্রাপ্ত বীমা সেলামী থেকে পরিশোধিত বীমাদ্যবী বাদ দিয়ে যে অর্থ থাকে সুদ সহ উক্ত জমাকৃত অর্থই সঞ্চিতি। মোট কথা, সঞ্চিতি হলো সুদসহ বীমাসেলামী থেকে বীমাদাবী বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট মেয়াদাস্তে যা থাকে ।

বীমার তহবিল বিনিয়োগ করা
আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় হচ্ছে বীমার তহবিল বিনিয়োগ করা। বলা বাহুল্য যে, বীমা গ্রহীতাদের কাছ থেকে সংগৃহীত বীমার্কিস্তির অর্থ এবং সুদ, মূলধনী লাভ, মিতব্যয়ীতা ও বীমাদাবীর অপরিশোধ থেকে প্রাপ্ত ও সঞ্চিত দিয়ে গঠিত হয় বীমা প্রতিষ্ঠানের তহবিল (Fund) তথা সঞ্চিতি (Reserve)। আর, স্বভাবতঃই এই তহবিল বা সঞ্চিতি হলো বীমাগ্রহীতাদের কাছে বীমা কোম্পানী বা বীমাপ্রতিষ্ঠান অথবা বীমাকারীর দায় (Liabitity)।

এই তহবিল কোম্পানীতে বসিয়ে রাখা আদৌ সমীচীন নয় তথা কোন বিবেচক কারবার-সচেতন ব্যক্তি বা উপার্জনেচ্ছু প্রতিষ্ঠানের যথার্থ কাজ নয়। কেননা, কারবার পরিচালনা করতে হলে,মুনাফা করতে হলে এবং বীমাকারীকে বীমাগ্রহীতার বীমাদাবী মেটাতে হলে উক্ত তহবিল যথার্থভাবে খাটিয়ে তাকে বাড়িয়ে তোলা একান্ত কর্তব্য ও অপরিহার্য। তহবিল (Fund) খাটিয়ে বাড়িয়ে তোলার এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় বিনিয়োগ (Investment)
বিভিন্ন লেখক ও বীমা বিশেষজ্ঞদের অভিমত তথা সংশ্লিষ্ট বীমা আইনের ব্যাখা অনুযায়ী নিরাপত্তা, মুনাফাজনকতা, তারল্য, বহুধাপ্রবাহ (Diversification) ও কারবারের প্রবৃদ্ধি সাধন সাপেক্ষে ও অভিলক্ষ্যে তহবিল খাটিয়ে বাড়িয়ে তোলার যে প্রক্রিয়া তাকেই বিনিয়োগ (Investment) বলা হয়।
বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তাসমূহ Needs of Investment
[উপরোক্ত বর্ণনা থেকেই অনুমেয় যে, বিনিয়োগের কতকগুলি প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।]
এম. এন.মিশ্র বিনিয়োগের যে ক’টি প্রয়োজনের বিষয়ে উল্লেখ করেছেন নিম্নে সেগুলি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রদান করা হলো :-
১. বীমাদাবী পরিশোধ (Payment of Clalms) : বীমাদারী পরিশের করাই প্রকৃতপক্ষে বীমাকারীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, মূল ও বৃহত্তম কর্মকাণ্ড। এই বীমাদাবী পরিশোধের জন্যে দরকার বাড়তি অর্থ যা তহবিল খাটানোর মাধ্যমেই সম্ভব। সুতরাং, বীমাদাবী পরিশোধের জন্যেই দরকার তহবিল- বিনিয়োগ করা।
২. আর্থিক ঘাটতি উত্তরণ (To Overcome financial deficit) : সাধারণতঃ বীমাদাবী হিসেবে পরিশোষ্য অর্থ, ধীমাকিস্তি হিসেবে সংগৃহীত অর্থের পরিমানের চেয়ে বেশী হয়ে থাকে। এ ছাড়াও, বীমাকারীকে কারবারী কার্যধারা পরিচালনা করতে অর্থের প্রয়োজন হয় সঙ্গত কারনেই। যদি তহবিল -বিনিয়োগ না করা হয়, তাহলে আর্থিক ঘাটতি দেখা দিবে অনিবার্য কারণে। তাই, আর্থিক ঘাটতি পূরণ করার অপরিহার্য লক্ষ্যেই তহবিল- বিনিয়োগ একান্ত প্রয়োজন !
৩. জাতীয় স্বার্থ (National Interest) : বীমা কিস্তি হিসেবে বীমা প্রতিষ্ঠানসমুহে যে বিপুল পরিমান অর্থ জমা হয় তা অলসভাবে রেখে দিলে প্রতিষ্ঠানের যেমন ক্ষতি হয়, তেমনি সামাজিক ও জাতীয় বৃহত্তর স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সুতরাং, এ বৃহত্তর সামাজিক অভিলক্ষ্যটি সংহত করার জন্যেও তহবিল- বিনিয়োগ করা একান্ত প্রয়োজন।
