সামগ্রিক ক্ষতি

আজকের আলোচনার বিষয় “সামগ্রিক ক্ষতি ” যা নৌ বা সামুদ্রিক বীমা অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।

সামগ্রিক ক্ষতি

 

সামুদ্রিক ক্ষতিসমূহ

 

বীমাকৃত বিষয়বস্তু যদি সমগ্রভাবে বা সম্পূর্ণটাই ক্ষতিগ্রস্ত অথবা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যায়; তাহলে তাকে সামগ্রিক ক্ষতি বলে। সম্পূর্ণ পণ্যসামগ্রী নিয়ে জাহাজটি ডুবে গেলে বা অগ্নিকাণ্ডের ফলে পুরোপুরি বিনষ্ট হলে তাকে সামগ্রিক- ক্ষতি হিসেবে গণ্য করা হয়। ধ্বংস প্রাপ্ত বিষয়বস্তু বীমাকৃত থাকলে তার মালিক বা বীমাগ্রহীতা বীমাকারীর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারবেন। তবে, সামগ্রিক -ক্ষতির বেলায় ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করা হয় বীমাকৃত ও ধ্বংস প্রাপ্ত বিষয়বস্তুর বীমাকৃত মূল্য ও তার বাজার মূল্য দেখে।

বীমাকৃত মূল্য যদি বিষয়বস্তুর মূল্যের সমান হয়, তাহলে বীমাগ্রহীতা তা আদায় করতে পারেন; যদি বীমাকৃত মূল্য প্রকৃত মূল্য অপেক্ষা কম হয়, তাহলে বীমাকৃত অর্থই শুধু আদায় করা যাবে এবং মূল্য অপেক্ষা বেশী হলে বিষয়বস্তুর মূল্য পর্যন্তই আদায় করা যাবে। সুতরাং, সামগ্রিক- ক্ষতির বেলায় মূল্য অপেক্ষা বেশী টাকার বীমাপত্র গ্রহণ করায় কোন বাড়তি সুবিধে নাই। প্রসঙ্গতঃ প্রশ্ন আসতে পারে যে, বীমাকৃত বিষয়বস্তুর কোন একটি অংশ সম্পূর্ণটাই ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে তাকে সামগ্রিক- ক্ষতি না আংশিক ক্ষতি হিসেবে গণ্য করা হবে? সেক্ষেত্রে দেখতে হবে উক্ত অংশটি সমগ্র বীমাকৃত বিষয়বস্তু থেকে বিভাজ্য কিনা।

বিভাজ্য হলে এবং বিষয়বস্তুর বীমাকরণ এমনভাবে হয়েছে যে বীমাকৃত অর্থের পরিমান আলাদাভাবে নির্ণয় করা যায়, তাহলেই শুধু উক্ত অংশের সামগ্রিক- ক্ষতি হয়েছে বলে গণ্য হয়। অন্যথায় নয়, বরং তাকে আংশিক ক্ষতি হিসেবেই গণ্য করা হয়। মোট কথা, এরূপ অবস্থায় ক্ষতির ধরন নির্ণয় করা কষ্টকর। 

 

এই সামগ্রিক ক্ষতিকে আবার ক্ষতির ধরন ও প্রকৃতি অনুযায়ী দুভাগে ভাগ করা যায়। যথা : –(ক) প্রকৃত সামগ্রিক ক্ষতি ও (গ) উদ্ধারযোগ্য সামগ্রিক ক্ষতি। নিম্নে উভয় প্রকারের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রদান করা হলোঃ

(ক) প্রকৃত সামগ্রিক ক্ষতি ( Actual Total Loss) :

বীমাকৃত বিষয়বস্তু যদি সমগ্রটাই এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় যে—তা আর চিহ্নিত করা বা উদ্ধার করা আদৌ সম্ভব নয়, তাহলে তাকে প্রকৃত সামগ্রিক -ক্ষতি বলে।

নিম্নলিখিত ক্ষেত্রসমূহে প্রকৃত সামগ্রিক ক্ষতি সংঘটিত হয়ে থাকে –

১। বিষয়বস্তুটি সম্পূর্ণ ধ্বংস প্রাপ্ত হলে; অর্থাৎ একটি জাহাজ অগ্নিকাণ্ডের ফলে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেলে ৷

২। বিষয়বস্তুটি এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় যাতে বীমাকৃত হয়েছিল তেমন কোন বস্তুকে সনাক্ত করাই অসম্ভব হয়ে পড়ে। অর্থাৎ, বিষয়টি সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় না। বটে, কিন্তু, এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় – বুঝাই যায় না যে এই সেই বস্তু যা বীমাকৃত হয়েছিল। উদাহরণ স্বরূপ, সমুদ্রের পানিতে খাদ্য সামগ্রী এমনভাবে ভিজে গিয়ে নষ্ট হয়েছে যে – তা আর আগের অবস্থায় নেই অথবা ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে এবং বিষয়বস্তু যদি আর উদ্ধার করার উপায় না থাকে।

৩। বীমাগ্রহীতা বীমাকৃত বিষয়বস্তুর উপর থেকে কোন কারণে সম্পূর্ণভাবে মালিকানা হারিয়ে ফেললে, তখন বিষয়বস্তুর যথাযথ অস্তিত্ব থাকলেও তা অধিকারের বাইরে চলে যায় বলে তাকে প্রকৃত সামগ্রিক ক্ষতি হিসেবে গণ্য করা হয়। যেমন শত্রু বলপূর্বক বিষয়বস্তু দখল করে নিলে এধরনের ক্ষতি সাধিত হয়।

৪। বিষয়বস্তুটি যদি হারিয়ে যায়। যেমনঃ একটি জাহাজ যদি দীর্ঘকাল যাবৎ নিখোজ থাকে। অর্থাৎ, সংগত সময় পর্যন্ত অপেক্ষার পরেও যদি ফিরে না আসে, তাহলে তাকে প্রকৃত সামগ্রিক ক্ষতি হিসেবে গণ্য করা হয়।

(খ) উদ্ধারযোগ্য সামগ্রিক ক্ষতি ( Constructive Total Loss):

বীমার সমগ্র বিষয়বস্তু যদি এমনভাবে বিনষ্ট বা সেপ্রাপ্ত হয় যেতা উভারযোগ্য বা পাওয়ার যোগ্য— তবে, উদ্ধার খরচ যদি বিষয়বস্তুর মূল্যের সমান বা তার চেয়ে বেশী হয়, তাহলে, অথবা প্রকৃত সামগ্রিক- ক্ষতি এড়ানো সম্ভব নয় বলে যদি তা পরিত্যাগ করা হয়, তাহলে তাকে উচ্চারযোগ্য সামগ্রিক- ক্ষতি বলা হয়। উদাহরন স্বরূপ, ১৮৪৫ সালে Moss Vs. Smith মামলায় Moul. J উদ্ধারযোগ্য সামগ্রিক- ক্ষতি সম্পর্কে যে অভিমত প্রকাশ করেছেন তা উল্লেখ করা যায়।

সেখানে বলা হয়েছে যে, সমুদ্রের তলদেশে কোন ব্যক্তির ১ শিলিং যদি তলিয়ে গিয়ে থাকে এবং তা উদ্ধার করতে যদি দুই শিলিং ব্যয় হয়, তাহলে তা উদ্ধার করার চেষ্টা নিছক বোকামী। সেক্ষেত্রে তা উদ্ধার করা যায় বটে, কিন্তু, তা উদ্ধার করতে বিষয়বস্তুর মূল্যাপেক্ষা বেশী খরচ হয়ে যায়। প্রকৃত সামগ্রিক- ক্ষতি এবং উদ্ধারযোগ্য সামগ্রিক- ক্ষতির মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্যবিদ্যমান।

 

সামুদ্রিক ক্ষতিসমূহ

 

তবে, তারমধ্যে একটি বিষয় প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য তা হলো এই যে, বীমাগ্রহীতা যদি উদ্ধারযোগ্য সামগ্রিক ক্ষতি আদায় করতে চান, তাহলে বীমাকারীকে যথাসময়ে পরিষ্কার ও শর্তহীন একটি বর্জন নোটিশ প্রদান করতে হবে যাতে বীমাগ্রহীতা বিনষ্ট বা ধ্বংসপ্রাপ্ত পণ্যের যা কিছু উদ্ধারযোগ্য তার দাবী বা স্বার্থ পরিত্যাগ করার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন অন্যথীয়, বীমাকারী উক্ত ক্ষতিকে প্রকৃত সামগ্রিক ক্ষতি হিসেবে গণ্য করবেন এবং সেভাবে ক্ষতিপূরণ দিবেন। কেননা, বিষয়বস্তুর ক্ষতিপূরণের পর যা উদ্ধার বা পাওয়ার যোগ্য তা স্থলাভিষিক্ততার নীতি অনুযায়ী বীমাকারীরই প্রাপ্য হয়।

Leave a Comment