আজকের আলোচনার বিষয় “আংশিক ক্ষতি” যা নৌ বা সামুদ্রিক বীমা অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।নৌ-বীমার ক্ষেত্রে বীমাকৃত বিষয়বস্তু তথা জাহাজ এবং/অথবা পরিবহণাধীন পণ্যসামগ্রী, মাসুল । ইত্যাদি যদি সম্পুর্ণরূপে সমগ্রটাই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তাহলে তাকে আংশিক ক্ষতি বলে।
আংশিক ক্ষতি

বিষয়বস্তু যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তা যদি সামগ্রিক ক্ষতি না হয়, তাহলে তা অবশ্যই আংশিক ক্ষতি হিসেবে গণ্য হবে। আংশিক ক্ষতি মূলতঃ দুপ্রকার যথা : (ক) বিশেষ আংশিক ক্ষতি ও (খ) সাধারণ আংশিক ক্ষতি। নিম্নে তাদের সম্পর্কে বর্ণনা প্রদান করা হলো :
(ক) বিশেষ আংশিক ক্ষতি( Particular Average Loss or Particular Average ):
যখন বীমাকৃত বিষয়বস্তু একাধিক থাকে এবং তার বীমাকৃত মূল্য বিভাজ্য অথবা সমগ্র বিষয়বস্তুর বিভিন্ন অংশ থাকে যা বিভাজ্য এবং তার বীমাকৃত মূল্যও বিভাজ্য, তখন উক্ত বিষয়বস্তুগুলির কোন একটির অথবা সমগ্র বিষয় বস্তুর কোন অংশের অংশবিশেষ আকস্মিক দুর্ঘটনাজনিত কোন কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে, তাকে বিশেষ আংশিক- ক্ষতি বলা হয়। Arnold-এর মতে “বীমাকৃত বিপদ দ্বারা বিষয়বস্তুর (যেমন : জাহাজ বা জাহাজের পণ্যসামগ্রীর) কোন অংশের আকস্মিক বা দুর্ঘটনাবশতঃ ক্ষতি সাধিত হলে তাকে বিশেষ আংশিক -ক্ষতি বলে।
উদাহরণ স্বরূপ, জাহাজের কোন অংশের বা পণ্যের অংশবিশেষের ক্ষতি হতে পারে। তবে, সমগ্র বিষয়বস্তু বা সব ক’টি বিষয়বস্তুর আংশিক- ক্ষতি হলে, তাকে বিশেষ আংশিক -ক্ষতি বলে না – বরং তা হয় সাধারণ আংশিক -ক্ষতি। মোট কথা, বিশেষ আংশিক-ক্ষতি হিসেবে গণ্য করতে হলে, নিম্নলিখিত বিষয় বা শর্তগুলি তাতে বিদ্যমান থাকতে হবে যথা :-
১। ক্ষতির কারণ হতে হবে সামুদ্রিক বিপদ;
২। বিপদ এবং ক্ষতি হতে হবে আকস্মিক বা দুর্ঘটনাজনিত;
৩। বিপদ বা ঝুঁকি অবশ্যই বীমাকৃত বা বীমাপত্রে উল্লেখিত অথবা অর্ন্তভূক্ত থাকতে হবে;
৪। ক্ষতি হতে হবে আংশিক। তবে, বীমাকৃত বিষয়বস্তু কয়েকটি থাকলে তার বিশেষ একটির আংশিক- ক্ষতি হবে; আর যদি বিষয়বস্তু হয় একক বা সমগ্র বিষয়, যেমন — জাহাজ, জাহাজের পণ্য, মাসুল ইত্যাদি তাহলে তার কোন একটি অংশের অংশবিশেষ ক্ষতি হতে হবে।
উপরোক্ত বর্ণনার প্রেক্ষিতে বিশেষ আংশিক- ক্ষতিকে আবার কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন (1) জাহাজের বিশেষ আংশিক -ক্ষতি, (II) পণ্যের বিশেষ আংশিক-ক্ষতি এবং (iii) মাসুলের বিশেষ আংশিক -ক্ষতি যা নিম্নে সংক্ষেপে আলোচিত হলোঃ
(I) জাহজের বিশেষ আংশিক -ক্ষতি (Particular Average on Ship) : বীমাকৃত জাহাজের যদি কোন অংশের ক্ষতি হয়, তবে তাকে জাহাজের আংশিক- ক্ষতি বলে। নৌ-বীমা চুক্তি আইনের ৬৯ ধারা অনুযায়ী –
১। যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ মেরামত করা হয়েছে, সেখানে বীমাগ্রহীতা শুধুমাত্র মেরামত খরচ ক্ষতিপূরণ হিসেবে দাবী করতে পারেন – তবে, তা বীমাকৃত মূল্যের বেশী হতে পারবে না এবং
২। যেখানে জাহাজের আংশিক মেরামত করা হয়েছে, সেখানে বীমাগ্রহীতা মেরামতের একটা যুক্তিসংগত মূল্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে দাবী করতে পারেন। অমেরামতকৃত (বিষয়বস্তুর) ক্ষতির যুক্তিসঙ্গত অবচয়ও দাবী করা যায়।
(ii) পণ্যের বিশেষ আংশিক- ক্ষতি (Particular Average on Cargo) : পণ্যের অংশ বিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাকে পণ্যের বিশেষ আংশিক- ক্ষতি বলে। পণ্যের বিশেষ আংশিক -ক্ষতি হলে তার দাবী আদায় করতে অভিজ্ঞ সার্ভেয়ার কর্তৃক সার্ভে করে ক্ষতির কারণ ও পরিমাণ সম্পর্কে বিবরণী প্রকাশ করতে হবে। বিবরণী প্রস্তুত ও প্রকাশের পর যদি অমূল্যায়িত বীমাপত্র হয় – তাহলে বীমাগ্রহীতা প্রকৃত ক্ষতি তখনই পেতে পারেন, যখন বীমাকৃত মূল্য এবং পণ্যের বাজার মূল্য সমান থাকে। আর, বীমাকৃত মূল্য বাজার মূল্য অপেক্ষা কম হলে সে অনুপাতে বেশী ক্ষতিপূরণ দাবী করতে পারবেন।
আনুষঙ্গিক খরচ বীমাগ্রহীতা বীমাকারীর কাছ থেকে পাবেন।
(III) মাসুলের বিশেষ আংশিক- ক্ষতি (Particular Average on Freight) : জাহাজ মালিক জাহাজস্থ পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে পণ্যের ক্ষতিপুরণের সাথে মাসুলের ক্ষতিও বীমাকারীর কাছ থেকে নিয়ে নেন।
মাসুল জাহাজ গন্তব্যস্থলে পৌঁছার পর দেয় হলে, আইনানুযায়ী জাহাজ মালিক পণ্য পৌঁছে না দেয়া পর্যন্ত মাসুল চাইতে পারেন না। পণ্যই ক্ষতি হয়ে গেলে তার মাসুল চাইবেন কি করে। তাই, সেক্ষেত্রে বীমাগ্রহীতা মাসুলের বীমাপত্র ক্রয় করে থাকলে সে বীমাকারীর কাছ থেকে ক্ষতির প্রকৃত অংশটাই দাবী করতে পারেন।
খ. সাধারণ আংশিক ক্ষতি (General Average):
বীমার বিষয়বস্তু একাধিক হলে অথবা একটি সমগ্র বিষয়বস্তুর বিভিন্ন অংশ বিভাজ্য হলে সবক’টি বিষয় বস্তুই অথবা সমগ্র বিষয়বস্তুর অংশসমূহের প্রতিটি অংশেরই অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাকে সাধারণ আংশিক ক্ষতি বলা হয়। Brikley Vs. Presgave মামলায় সাধারণ আংশিক ক্ষতি প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে— “জাহাজ ও পণ্য রক্ষার জন্যে যে সকল অসাধারণ ক্ষতি সংঘটিত হয় অথবা অর্থব্যয় করা হয়, তা সাধারণ আংশিক ক্ষতির পর্যায়ে পড়ে এবং উক্ত ক্ষতি সংশ্লিষ্ট পক্ষকে আনুপাতিক হারে অবশ্যই বহন করতে হবে।”
সাধারণ আংশিক ক্ষতি বলে তখনই গণ্য হবে যখন –
১। ক্ষতি সাধারণত : অস্বাভাবিক প্রকৃতির হবে, অর্থাৎ, সমুদ্রে জাহাজ চলাকালীন স্বাভাবিক কোন ক্ষতিকে এর আওতাভুক্ত করা যাবে না;
২। ক্ষতি সামুদ্রিক বিপদ থেকেই হতে হবে যা সাধারণ বিপদ থেকে অনেক ভয়াবহ। সমগ্র যাত্রাটি হতে হবে বিপদাপন্ন এবং তা প্রকৃত পক্ষেই ঘটতে হবে;
৩। ক্ষতি কোন আকস্মিক দুর্যোগের কারণে হলে চলবেনা; ৪। ক্ষতি অবশ্যই যুক্তি সঙ্গত হতে হবে;
৫। ক্ষতি কোন ব্যক্তি বা পক্ষবিশেষের স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে সংঘটিত হলে চলবে না এবং
৬। ক্ষতি কোন ব্যক্তিবিশেষের কারণে সংঘটিত হতে পারবে না।
সাধারণ আংশিক ক্ষতি দু’ধরনের হতে পারে –
(i) পণ্য বা সম্পত্তির ক্ষতি ( Sacrifices of property) : জাহাজ হালকা বা বিপদমুক্ত করতে যদি পণ্য বা অন্য কোন সম্পত্তি বিনষ্ট অথবা ত্যাগ করতে হয় অথবা পণ্য ফেলে দিতে হয়, তাহলে তাকে সম্পত্তি ক্ষতি বলে।
(ii) গচ্ছা ( Expenditure) : জাহাজ এবং পণ্যাদি রক্ষা করতে যদি অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়, তাকেই বলে গচ্ছা। যেমন : জাহাজ বিকল হয়ে পড়লে অন্য কোন জাহাজের সাহায্যে যদি টেনে নিতে হয় তাহলে তার যে খরচ হয় তাকে গচ্ছা বলা যাবে।

বিশেষ আংশিক -ক্ষতি ও সাধারণ আংশিক- ক্ষতি ছাড়াও কিছু আনুষঙ্গিক খরচ- ক্ষতি সংশ্লিষ্ট যে কোন পক্ষকে, বিশেষতঃ বীমাকারীকে বহন করতে হয় যা আংশিক- ক্ষতির বেলায়ই এ ধরনের খরচগুলি করতে হয় যেমন :—
১। বিশেষ খরচাবলী ( Special charges: ) বিষয়বস্তুর নিরাপত্তা বা রক্ষার জন্যে বীমাগ্রহীতার বা তার প্রতিনিধি যদি কোন অর্থ ব্যয় করে থাকে, তাকেই বিশেষ খরচাবলী বলে। তবে, এধরনের ব্যয় অযৌক্তিক ও ব্যক্তিবিশেষের স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে হতে পারবে না এবং তা গন্তব্য বন্দরে পৌছার আগেই ব্যয়িত হতে হবে।
২। রক্ষা প্রাপ্তি ব্যয় ( Salvage charges ) : জাহাজ, পণ্য অথবা অন্যান্য সম্পদ-সম্পত্তি উদ্ধারের জন্যে যদি কেউ কোন কার্য করে তাহলে, তাকে বা তাদের যে পুরস্কার প্রদান করা হয়, তাই মূলতঃ রক্ষাপ্রাপ্তি ব্যয়। তবে, উদ্ধারকারী পক্ষকে অবশ্যই তৃতীয় পক্ষ হতে হবে, উদ্ধারকারীর সাহায্য হতে হবে প্রয়োজনীয় ও উপকারী এবং উদ্ধারকারী পক্ষকে অবশ্যই বুদ্ধিমত্তা ও উদ্যম সহকারে কার্য সম্পন্ন করতে হবে।
এ ছাড়াও, রয়েছে প্রতিকম্পিত ব্যয় । Substituted expenses) আনুক্রমিক ক্ষতি ( Successive loss) ইত্যাদি। তবে, মোটামুটি ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতিগুলি সম্পর্কে কিছুটা আলোচনা করা হলো।
