আজকের আলোচনার বিষয় “ক্ষতির অব্যবহিত বা নিকটতম কারণ নীতি ” যা নৌ বা সামুদ্রিক বীমা অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।
ক্ষতির অব্যবহিত বা নিকটতম কারণ নীতি

নৌ-বীমার ক্ষেত্রে বীমাকৃত বিপদ-অর্থাৎ, বীমাপত্রে উল্লেখিত বিপদ বা বিপদসমূহ ঘটলে বীমাকারী তজ্জনিত ক্ষতি পূরণ হিসেবে রীমাদাবী পরিশোধ করতে দায়বদ্ধ থাকেন। কিন্তু, পরস্পর সম্পর্কযুক্ত কয়েকটি কারণ বা কারণচক্র যদি উক্ত বিপদ বা দুর্ঘটনা সংঘটনের জন্য দায়ী হয় যার কিছু বীমাকৃত এবং কিছু বীমাকৃত নয়, তা হলেই অসুবিধা সৃষ্ট হয়, অনুসন্ধানের প্রয়োজন হয় – ক্ষত বা দুর্ঘটনার জন্য নিকটতম কারণ কোনটি এবং তা বীমাকৃত কিনা।বীমাকৃত কারণে বিপদ সংঘটিত হলে বীমাকারী দায়গ্রহণে বাধ্য; অন্যথায় নয়।
এ কারণেই ক্ষতির নিকটতম কারণ মতবাদটির প্রবর্তন হয়েছে। এ মতবাদ সম্পর্কে বিভিন্ন গ্রন্থকার ও বীমা বিশারদ বিভিন্ন অভিমত দিয়েছেন। তবে, সকলের অভিমতেরই মূল কথা হচ্ছে— যদি অনেকগুলি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত কারণেই ক্ষতিটি সংঘটিত হয়ে থাকে – তবে, দায়গ্রহণের জন্যে বীমাকারীকে এই মর্মে নিশ্চিত হতে হবে যে – কোনটি নিকটতম কারণ এবং তা বীমাকৃত কিনা, নিকটতম অর্থাৎ সঠিক যে কারণে বিপদ সংঘটিত হয়েছে তা বীমাকৃত হয়ে থাকলে বা বীমাপত্রে উল্লেখিত থাকলে বীমাগ্রহীতা ক্ষতিপূরণ পাবে।
কিন্তু, দূরবর্তী কোন কারণে বিপদ ঘটলে বীমাকারী দায় গ্রহণে বাধ্য হবেন না। এ জন্যেই বলা হয়েছে – ক্ষতিপুরণের জন্যে নিকটতম কারণের দিকে তাকাও-দূরবর্তী কারণের দিকে নয় ( Look to the proximate and not to the remote cause or Causa Proxima non-remota spectatur.)।নিকটতম কারণ প্রসঙ্গে সামুদ্রিক ক্ষতি সংক্রান্ত আইনের ৫৫ ধারায় বলা হয়েছে যে – “বীমাকারী তখনই ক্ষতির জন্য দায়ী থাকবেন যখন সামুদ্রিক বিপদ বা ঝড়-কভার মত সম্ভাব্য কারণে বীমাকৃত পন্যের ক্ষতিপূরণ দানের জন্যে দায়ী থাকবেন না।
সামুদ্রিক বীমা আইনে উল্লেখ রয়েছে যে সংশ্লিষ্ট আইনের সংবিধি সাপেক্ষে এবং বীমাপত্রে বিকল্প বা বিপরীত কিছু না থাকলে নিকটতম বীমাকৃত কোন বিপদের জন্যে সংঘটিত ক্ষতিপুরণ করে দেয়ার জন্যে বীমাকারী দায়বদ্ধ থাকেন। কিন্তু, এছাড়া নিকটতম নয় এমন কোন কারণে সংঘটিত বিপদের ক্ষতিপুরণে বীমাকারী দায়বদ্ধ নন (According to Marine Insurance Act.. “Subject to the provisions of the Act and unless the policy otherwise provides the in surer is liable for any loss proximately caused by a peril insured against, but subject to as aforesaid he is not liable for any loss which is not proximately caused by a peril insured against “)
ডোভার (Dover)-এর মতে- নিকটতম কারণই ক্ষতির কারণ ক্ষতির নিকটতম হলেও সময়মত হতে হবে এমন নয়, কিন্তু, যথার্থতায় থাকতে বা ২.৩ হবে। ক্ষতির কারণ নির্ধারণে দুরবর্তী কারণ সমূহ পরিহার করা হতে পারে, তথাপিও এ মতবাদকে যথাযথ অর্থেই বর্ণনা করতে হবে। (The Causa Proxima of a loss is the cause of the loss, proximate to the loss, not necessarily in time, but inefficiency while remote causes may be disregarded in determining the cause of a loss, the doctrine must be inter preted with good sense.”)]
এ প্রসঙ্গে Lord Sumner বলেছেন—“নিকটতম কারণ প্রকৃত বা সাধারণ জ্ঞানপ্রসূত কারণ নির্ণয়জনিত কষ্ট পরিহারের উপায় নয় ( Proximate cause is not a device to avoid the trouble of discovering the real cause or the common sense cause.”)
নিকটতম কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা নিতে নিম্নে বর্ণিত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মামলার ঘটনা বর্ণিত হলোঃ
১৮৮৩ খৃষ্টাব্দে Cory vs Burr মামলার বিবরণে জানা যায় যে – একটি – বীমাকৃত জাহাজ, জাহাজের কাপ্তানের প্রতারণা ও অসাধুতার জন্যে স্পেনীয় রাজস্ব অধিকারীকগণ কর্তৃক স্পেনীশ বন্দরে বন্দী ও অবরোধ করে রাখা হয়।জাহাজযুক্ত করতে জাহাজ মানিকের অনেক অর্থ ব্যাচিত হয়। এক্ষেত্রে দেখা যায় যে – উক্ত ক্ষতির দুটি কারণ বিদ্যমান। একটি হলো কাপ্তানের প্রতারণা ও অসাধুতা এবং অপরটি হলো — জাহাজ বন্দী ও অবরোধগ্রস্ত হওয়া। এখানে জাহাজ বন্দী ও অবরোধগ্রস্ত হওয়াই প্রত্যক্ষ কারণ বিধায় তাকে নিকটতম কারণ বলে গণ্য করা হয় এবং তা বীমাপত্রে উল্লেখিত ছিল বলে বীমাকারী দায়বহনে বাধ্য হন।
কেননা, জাহাজ বন্দী ও অবরোধগ্রস্ত না হলে মালিকের এ ক্ষতি হতো না। তবে, কাপ্তানের প্রতারণা ও অসাধুতা পরোক্ষ কারণ হলেও কিন্তু সে কারণেই মূলতঃ জাহাজবন্দী ও অবরোধগ্রস্ত হয়। তথাপি, একটু পরোক্ষ হওয়ার জন্যেই তা নিকটতম কারণ হিসেবে গণ্য হয়নি।ঠিক উপরোক্ত ক্ষেত্রের মত আর একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, একটি সমুদ্রগামী জাহাজের তলা ইঁদুরে কেটে ফেলেছিল; তাতে জাহাজ ছিদ্র হয়ে পানি উঠে কিছু পণ্য নষ্ট হয়।
এক্ষেত্রেও ক্ষতির জন্যে দু’টি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত কারণ বিদ্যমান।একটি জাহাজ ইঁদুরে কাটা এবং অপরটি পানি ওঠা। পণ্যের ক্ষতি তার জন্যে পানি ওঠাই প্রত্যক্ষ কারণ বলে গণ্য হবে। কেননা, পানি না উঠলে পণ্য নষ্ট হতো না। তবে, পানি ওঠার জন্যে তো মূল কারণ ইঁদুরে জাহাজ কাটা। অথচ তা, পরোক্ষ বলেই এখানে নিকটতম কারণ হিসেবে গণ্য নয়। পানি ওঠা যদি বীমাকৃত বিপদের অর্ন্তভুক্ত থাকে অথবা উক্ত বিপদ যদি বীমাকৃত থাকে তাহলে তারজন্য বীমাকারী ক্ষতিপূরণ প্রদানে দায়বদ্ধ থাকবেন; অন্যথায় নয়।
সমজাতীয় আরও একটি ঘটনা এখানে প্রনিধানযোগ্য। এ ঘটনার বিবরণে উল্লেখ রয়েছে যে, প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারণে একটি সমুদ্রগামী জাহাজের কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলো। ফলে, তা মেরামতের জন্যে জাহাজের কাপ্তান জাহজটিকে ফিরিয়ে এনে প্রত্যাবর্তনের বন্দরেই ভেড়াতে বাধ্য হলো। কেননা, জাহাজ মেরামতের জন্যে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন তা কাপ্তানের কাছে ছিল না। কাপ্তান বাধ্য হয়েই বীমাকৃত কিছু পণ্য বিক্রয় করে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে জাহাজ মেরামত করে নিলেন।
এ ক্ষেত্রেও ক্ষতির দু’টি কারণ বিদ্যমান; একটি তহবিল এবং অপরটি সম্ভাব্য সামুদ্রিক বিপদ। তবে, তহবিলই যেহেতু এ ক্ষতির আপাতঃ বা প্রত্যক্ষ কারণ, তাই তাকে নিকটতম কারণ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তহবিলের অভাবজনিত সম্ভাব্য বিপদ বীমাকৃত হলে তার দায় বহন করতে দায়গ্রাহক বা বীমাকারী বাধ্য। অনদিকে, সম্ভাব্য সামুদ্রিক বিপদ এড়ানোর চেষ্টাই জাহাজ মেরামতের জন্যে মূল কারণ। তাই, তা নিকটতম কারণ হিসেবে গণ্য হয় না।

সবিশেষে ক্ষতির নিকটতম কারণ প্রসঙ্গে ইংরেজী নৌ-বীমা আইনের কয়েকটি বিষয় উল্লেখ্য –
(ক) বীমাগ্রহীতা বা বীমাপত্রধারীর ইচ্ছাকৃত অসদাচরণের কারণে সৃষ্ট কোন ক্ষতির জন্যে বীমাকারী দায় গ্রহণে বাধ্য নন
(খ) সে রকম কিছু বলা না থাকলে বীমাকারী বিলম্বের জন্যে কোন দায় গ্রহণে বাধ্য নন এবং
(গ) বীমাচুক্তিতে অন্যরকম কোন ব্যবস্থা না থাকলে বীমাকারী বীমাকৃত বিষয়ের সাধারণ ক্ষয়ক্ষতি, ছিত্র, ভাঙ্গন, অন্তর্নিহিত ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্যে সূর বা সম্ভাব্য কোন ক্ষতির জন্যে দায়বদ্ধ হন না।
মোদ্দা কথা হলো এই যে – ক্ষতিপুরণের জন্যে দাবী করলেই তা গ্রাহ্য হবে না, যদি তা বীমাকৃত বিপদ বা কারণে অথবা এমন কোন কারণ যা নিকটতম অথবা বীমাকৃত না হয়।
