আজকের আলোচনার বিষয় “পুনর্বীমা শ্রেণী বিন্যাস ” যা সামাজিক ও অন্যান্য ধরনের বীমাসমূহ অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।
Table of Contents
পুনর্বীমা শ্রেণী বিন্যাস

সাধারণতঃ নিম্নোক্ত তিন প্রকারের পুনর্বীমা প্রচলিত রয়েছে –
১. নির্বাচন বা যাচাইমূলক পুনর্বীমা । Shopping or ‘Street’ Re- Insurance),
২. স্বেচ্ছামূলক পুনর্বীমা ( Facultative Re Insurance) ও
৩. স্বয়ংক্রিয় অথবা সন্ধিমূলক পুনৰীমা ( Automatic or Treaty Re- insurance) I
নিম্নে উক্ত পুনর্বীমাসমূহ সম্পর্কে সংক্ষেপে বর্ণনা প্রদান করা হলো :
১. নির্বাচন বা যাচাইমূলক পুনর্বীমা Shopping or Street Re-insurance
এ ধরনের পুনর্বীমায় প্রতিটি বীমাপত্রকে আলাদাভাবে পুনর্বীমার জন্যে যাচাই বা পরীক্ষা করে দেখা হয়। অর্থাৎ, পুনর্বীমার জন্যে প্রথম বীমাকারী পুনর্বীমার জন্যে উপস্থাপন করলেই যে পুনর্বীমার জন্যে গৃহীত হবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই; বরং, পুনর্বীমা কোম্পানী প্রত্যেকটি বীমাপত্রকে আলাদা আলাদাভাবে বিভিন্ন দিক থেকে পরীক্ষা করে যদি দেখেন কোন বীমাপত্র পুনর্বীমার উপযোগী, তাহলে সেটিকে গ্রহণ করবেন এবং কোনটিকে উপযোগী বা গ্রহণযোগ্য মনে না করলে বাদ দিয়ে দিবেন। তাই, প্রথম বীমাকারী পুনর্বীমার জন্যে উপস্থাপনের সময়ই সর্তকতাসহকারে তা উপস্থাপন করে থাকেন।
সুবিধাসমূহ (Advantages) :
এ বীমাপত্রের সুবিধা যা কিছু তা মূলত : পুনর্বীমাকারীর। কেননা,
(১) পুনর্বীমাকারী একটি একটি করে যাচাই করে গ্রহণযোগ্য মনে করলে গ্রহণ করেন, অনথায় ফিরিয়ে দেন;
(২) পুনর্বীমাকারী নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিই মুখ্য হিসেবে বিবেচনা করেন এবং স্বীয় স্বার্থরক্ষার পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন ;
(৩) ফলে, এখানে তার লাভবান হওয়ার বিষয়টি অনেকটা নিশ্চিত হয়ে যায়। তবে, প্রথম বীমাকারীরও পরোক্ষ কিছু সুবিধার দিক রয়েছে।
তাহলো:
(১) প্রথম বীমাকারী বীমাপত্র গ্রহেণের সময়েই পুনর্বীমায় বিষয়টি ভেবে নিয়ে সতর্কতার সাথে বীমাপত্র গ্রহণ করবেন যাতে পুনর্বীমার জন্যে উপযোগীতা অনেকটা আগেই নিশ্চিত হয় এবং
(২) যেহেতু, পুনর্বীমাকারী পুনর্বীমা প্রদানের সময়েই যাচাই করে নেন, তাতে তার পরবর্তী জটিলতার অবকাশ স্বভাবতঃই কমে যায়।
অসুবিধাসমূহ ( Disadvantages)ঃ
আর, অসুবিধাগুলো মূলতঃ প্রথম বীমাকারীর। কেননা, এধরনের পুনর্বীমা প্রত্যাশী হলে –
(১) তাকে প্রতিটি ক্ষেত্রে ও মুহূর্তে পুনর্বীমাকারীর নির্বাচন মুখাপেক্ষী হয়ে হয় ;
(২) তাকে বীমাপত্র গ্রহণে খুবই সতর্ক হতে হয় যা ব্যবসাকে সম্প্রসারিত না করে বরং সংকুচিত করে দিবে।
তবে, পুনর্বীমাকারীরও কিছু অসুবিধা থাকে। যেমন—
(১) তার অতি আনুষ্ঠানিকতা পুনর্বীমাগ্রহীতাদের নিরুৎসাহিত ও বিমুখ করে ফেলে এবং
(২) ফলে, সম্প্রসারণের সম্ভাবনা ও সুযোগ সংকুচিত হতে থাকে ।
২. স্বেচ্ছামূলক পুনর্বীমা Facultative Re-insurance:
এ ধরনের পুনর্বীমার ক্ষেত্রে বীমার দায় ( Liability) -এর একটি নির্দিষ্ট অংশ মূল বা প্রথম বীমাকারী নিজ দায়িত্বে রেখে অবশিষ্ট অংশ অন্য কোম্পানীর কাছে বীমাকরণের জন্যে দাখিল করেন। সাধারণতঃ এ ধরনের প্রত্যেকটি প্রস্তাবের সাথে মূল বীমা প্রস্তাবের সাথে সংশ্লিষ্ট সব কাগজপত্রের অনুলিপি পুনর্বীমাকারীর কাছে বিবেচনার জন্যে পাঠাতে হয় এবং সেই সাথে মূল বীমাকারীর দায়িত্বে রাখা অঙ্কের পরিমাণও জানিয়ে দিতে হয়। পুনর্বীমা কোম্পানী সব পরীক্ষা করার পর ইচ্ছা করলে প্রস্তাব গ্রহগও করতে পারেন এবং ফেরতও দিতে পারেন। এই গ্রহণ বা অগ্রাহ্যকরণ যেহেতু পুনর্বীমাকারীর ইচ্ছার উপর নির্ভর করে, তাই এ ধরনের পুনবীমাকে স্বেচ্ছামূলক বা ঐচ্ছিক নবীমা হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে।
পুনর্বীমা প্রস্তাব গৃহীত হলে পুনর্বীমাকারী মূল প্রস্তাবের অনুলিপির উপর পুনর্বীমাকৃত দায়ের পরিমাণ লিখে স্বাক্ষর দান করে অথবা পুনর্বীমাপত্র প্রদান করে এ ধরনের চুক্তি সম্পাদন করতে পারেন। তবে, পুনর্বীমাকরণ চিঠা দ্বারাই সাধারণতঃ পুনর্বীমা করা হয়। পুনর্বীমাকারী কোন বীমাপত্রের কতটা ঝুঁকি গ্রহণ করবেন তা এই চিঠাতেই লিখে দেন। বীমাগ্রহীতার নাম, ঠিকানা, পেশা বীমাকৃত মূল্য, ঝুঁকির প্রকৃতি, প্রিমিয়ামের হার, শর্ত এবং অর্পণকারী বীমাকারী কর্তৃক রক্ষিত দায় ইত্যাদি এই চিঠায় বিবৃত হয়। আজকাল অবশ্য টেলিফোনের মাধ্যমেও পুনর্বীমা করা হয়। তবে, পরে টেলিফোনের মাধ্যমে প্রদত্ত প্রস্তাব লিখিতভাবে প্রদান ও গ্রহণের মাধ্যমে চূড়ান্তকরণ হয়।
স্বেচ্ছামূলক পুনর্বীমার সুবিধাসমূহ ( Advantages of Facultative Re-insurance ) :
(১) এ ধরনের পুনর্বীমায় প্রথম থেকেই ঝুঁকির বোঝা বণ্টনপূর্বক গ্রহণ করা হয় এবং দুই বা ততোধিক বীমাকারীর উপর ঝুঁকি ছড়িয়ে দেয়া হয় বিধায় শুরুতেই বীমাকারীগণ হাল্কা বোধ করেন।
(২) পুনর্বীমার বিষয়টি পুনর্বীমাকারীর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল বিধায় অর্পণকারী কোম্পানী নিয়ত সতর্কতায় কাজ করে এবং
(৩) পুনর্বীমা করার অসুবিধার কথা মনে করে অবাঞ্ছিত ঝুঁকি গ্রহণের ইচ্ছা প্রদমিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়।
স্বেচ্ছামূলক পুনর্বীমার অসুবিধাসমূহ (Disadvantages of Facultative Re-insurance):
(১) এ ধরনের পুনর্বীমা ব্যবস্থা অত্যন্ত ঝামেলাপূর্ণ। কেননা, এতে প্রত্যেক বীমপত্রের জন্যে পৃথক বীমাকরণের প্রস্তাব তৈরী করতে হয়, এবং সব কাগজপত্রের অনুলিপি প্রদান করতে হয়।
(২) প্রতিটি বীমাপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে এবং আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে অনেক সময় লেগে যায়।
(৩) এরূপ বীমার ক্ষেত্রে বীমা কোম্পানীসমূহের একের উপর অন্যের নির্ভরশীলতা বেড়ে যায়।
(৪) অনেক সময় ঝুঁকি গ্রহণের পর আকাঙ্খিত অংশের পুনর্বীমা গৃহীত না হলে ক্ষতির শিকার হতে হয় এবং
(৫) এ সব অসুবিধার কারণে উৎসাহ কমে যায়।
স্বেচ্ছামূলক পুনর্বীমায় পুনর্বীমাকারীর স্বেচ্ছামূলক ভূমিকা এবং জটিলতা ও সময় সাপেক্ষতা একে ক্রমাগত অপ্রিয় করে তুলেছে এবং এই অবকাশে সন্ধিমূলক বীমাপত্রের উম্মেষ লাভ ঘটেছে।
৩.স্বয়ংক্রিয় বা সন্ধিমূলক পুনর্বীমা (Automatic or Treaty Re-insurance):
প্রকৃতপক্ষে, স্বেচ্ছামূলক পুনর্বীমার অসুবিধা বা সীমাবদ্ধতাসমূহের কারণেই সন্ধিমূলক পুনর্বীমার প্রবর্তন করা হয়েছে। কেননা, স্বেচ্ছামূলক পুনর্বীমায় অর্পণকারী বীমা কোম্পানীকে পুনর্বীমা করা যাবে কিনা এই মর্মে নিয়ত সন্দিগ্ধতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়। তাছাড়া, এটি সময় ও অতি আনুষ্ঠানিকতা সাপেক্ষও বটে
সন্ধিমুলক পুনর্বীমায় প্রত্যক্ষ বা অর্পণকারী । Ceding) বীমা কোম্পানী ও পুনর্বীমা কোম্পানী এই মর্মে একটি পারস্পরিক সমঝোতা বা সন্ধি অথবা চুক্তিতে আবদ্ধ হয় যে অর্পণকারী বীমাকারী কর্তৃক ঝুঁকির অগৃহীত অংশ পুনর্বীমা কোম্পানী গ্রহণ করবে। পুনর্বীমাকারী কোম্পানী একাধিক হলে প্রারম্ভ থেকেই তাদের মধ্যে এই মর্মে সমঝোতা থাকে যে, এক কোম্পানী যেসব বীমাপত্র গ্রহণ করবে, সেসব বীমার মোট বীমাকৃত অর্থে নির্দ্দিষ্ট পরিমাণ অঙ্ক পর্যন্ত অন্য কোম্পানী বা কোম্পানীসমূহ পুনবীমা করতে বাধ্য থাকবে। এ বীমার ক্ষেত্রে পুনর্বীমাকারী ঝুঁকি গ্রহণে অস্বীকার করতে পারে না। এ ধরনের বীমার ক্ষেত্রে পুনর্বীমাকারী প্রথাগত অনুসন্ধান ছাড়াই পুনবীমার ঝুঁকি গ্রহণ করেন। কেননা, পুনবীমাকারী মনে করেন যে অর্পণকারী বা প্রত্যক্ষ বীমা কোম্পানী অবশ্যই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বীমাপত্র গ্রহণ করেছে। সন্ধিমূলক পুনর্বীমা আবার নিম্নোক্ত কয়েক ধরনের হতে পারে –
(১) নির্ধারিত অংশ-বহন সন্ধি (Quota Sharing Treaty).
(২) উদ্বৃত্ত দায় বহন সন্ধি (Surplus Treaty),
(৩) ক্ষতির অতিরিক্ত অংশ বমন সন্ধি (Excess of Loss Treaty) এবং
(৪) সমষ্টিগত ব্যবস্থা (Pool or Syndiate System)
নিম্নে উক্ত উপ-শ্রেণীভেদসমূহ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রদান করা হলো :
(১) নির্ধারিত অংশ বহন সন্ধি (Quota Sharing Treaty) :
এ ধরনের বীমায় মূল বীমাকারী প্রত্যেক বীমার ভাল বা খারাপ যে কোন নির্ধারিত অংশ গ্রহণ করে অপর নির্ধারিত অংশ (একইভাবে ভাল বা মন্দ) অন্য কোন বীমা কোম্পানীর সাথে চুক্তির মাধ্যমে পুনর্বীমা করে নেন। এ ধরনের চুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হয় বলে একে অনেক সময় স্বয়ংক্রিয় পুনর্বীমাও বলা হয়।
(২) উদ্বৃত্ত দায় বহন সন্ধি ( Surplus Treaty) :
এ ধরনের পুনর্বীমা ব্যবস্থায় প্রত্যেক বীমাকারী নিজ আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে প্রত্যেক বীমাপত্রের উপর সর্বোচ্চ কত টাকা পর্যন্ত নিজ দায়িত্বে রাখতে বা বহন করতে সক্ষম হবেন তা স্থির করে নেন। এরূপ ধার্যকৃত বা রক্ষিত অংশের পরে অপর অংশের পুনর্বীমাকরণের উদ্দেশ্যে এক বা একাধিক পুনর্বীমা কোম্পানীর সাথে চুক্তি করা হয়। মূল বীমাকারী কর্তৃক রক্ষিত বা অংশের পরে অবশিষ্টাংশের দায়ের পরিমাণ ধার্য অঙ্ক অপেক্ষা বেশী হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনর্বীমা কোম্পানীর দায়িত্বে চলে যায় যার জন্যে এর নাম হয়েছে উদ্বৃত্ত বা অতিরিক্ত দায় বহন সন্ধিমূলক ব্যবস্থা।
(৩) ক্ষতির অতিরিক্ত অংশ বহন সন্ধি ( Excess of Loss Treaty) :
এ ধরনের পুনর্বীমায় মূল বীমাকারী শতকরা হারের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট সব বীমাকৃত অঙ্কের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অঙ্ক নিজ দায়িত্বে রাখেন এবং অবশিষ্টাংশ ক্ষতির অতিরিক্ত অংশ হিসেবে পুনর্বীমাকারী গ্রহণ করেন।
(৪) সমষ্টিগত ব্যবস্থা (Pool or Syndicate System) :
এ ধরনের পুনবীমা ব্যবস্থায় কোন বিশেষ শ্রেণীর ঝুঁকির সকল বীমাপত্রের প্রিমিয়াম কয়েকটি বীমা কোম্পানী মিলে একই তহবিলে জমা করে। এরূপ জমাকৃত মোট তহবিল থেকে সংশ্লিষ্ট শ্রেণীর বীমার সম্পূর্ণ দায় পরিশোধ করার পরে লাভ বা ক্ষতি হলে তা এরূপ ঝুঁকিতে অংশগ্রহণকারী বীমা কোম্পানীসমূহ সমষ্টিগতভাবে আনুপাতিক হারে বন্টন করে নেয়।

সন্ধিমূলক পুনবীমার সুবিধাসমূহ Advantages of Automatic or Treaty Re-insurance
(১) এ ধরনের পুনর্বীমা ব্যবস্থায় পুনবীমাগ্রহীতাকে পুনর্বীমা করার জন্যে পুনর্বীমাকারীর ইচ্ছার উপর নির্ভর করতে হয় না বা তার পেছনে অহেতুক দৌড়াতে হয় না। কারণ, প্রারম্ভেই তা সন্ধিমূলক পন্থায় পারস্পরিকভাবে গ্রহণ করা হয়।
(২) মূল বীমাকারীকে বৃহত্তর ঝুঁকি বহনের আর্থিক অসুবিধায় পড়তে হয়না । কারণ, অতিরিক্ত ঝুঁকির অংশ অন্যান্য পুনর্বীমাকারীদের মধ্যে হস্তান্তরিত করা হয়।
(৩) এ ধরনের বীমা ব্যবস্থায় আনুষ্ঠানিকতা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ঝামেলা কম বিধায় সময় ও অর্থের অপচয় হয় না।
(৪) এ ধরনের পুনর্বীমায় সংশ্লিষ্ট বীমা কোম্পানীসমূহের মধ্যে কোন অহেতুক প্রতিযোগিতার অবকাশ থাকেনা। কারণ, কোম্পানীসমূহ সমঝোতার মাধ্যমেই পারস্পরিক প্রতিযোগিতা দূর করে নেয়।
(৫) নতুন ও কম তহবিল সম্পন্ন কোম্পানীসমূহের জন্যে এ ধরনের পুনর্বীমা ব্যবস্থা উপযোগী। কেননা, এখানে পুনর্বীমা গ্রহণের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা থাকে না।
