কারবারী ক্ষেত্রে বীমার ভূমিকা ও গুরুত্ব – পাঠটি “বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা” বিষয়ের “বীমার মৌলিক ও সাধারণ আধেয়সমূহ” অধ্যায়ের একটি পাঠ। বীমার মৌলিক ও সাধারণ আধেয়সমূহ, হারবারের উৎপাদন শাখাকে শিল্প ও কটন শাখাকে বানিজ্য বলে এবং বাণিজ্যের একটি শাখা আবার ব্যবসায়। এই কারবার তথা শিল্প ও ব্যবসা- বাণিজ্যের সাফল্যের উপর নির্ভর করে দেশের আর্থ-সামাজিক সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন এবং মজবুত ও সমৃদ্ধ অর্থনীতিই দেশের পতাকাকে করে সুনিশ্চিত। আর, কারবারের সাফল্য ত্বরান্বিত করে বীমা। কেননা, কারবারে নিয়োজিত ও সমাবেশকৃত হয় বিপুল সম্পদ-সম্পত্তি।
একটি অসাবধানতা বা অন্যবিধ কারণে কোন বিপুল পরিমাণ সম্পদ-সম্পত্তি হুংস বা বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে যে কোন মুহূর্তে। আর, তা ধ্বংস বা বিনষ্ট হয়ে গেলে, সে প্রতিষ্ঠান তার অস্তিত্বই হারিয়ে ফেলতে পারে চিরতরে। এমন বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যেই একটি বীমাপত্র একান্তই অপরিহার্য। যে কোন দুর্ভোগ বা অনিশ্চিত পরিস্থিতির কারণে বিপুল ক্ষতি সাধিত হয়ে যেতে পারে যা কাটিয়ে ওঠা কোন কারবার প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আদৌ সম্ভব নাও হতে পারে। তারই জন্যে দরকার একটি বীমাপত্রের।
Table of Contents
কারবারী ক্ষেত্রে বীমার ভূমিকা ও গুরুত্ব

- বীমা কারবারী ক্ষেত্রে এরূপ যেসব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে সে সম্পর্কে নিম্নে একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রদান করা হলো।
১. কারবার প্রতিষ্ঠানসমুহ রক্ষা করে (Protects the business concerns) :
একক মালিকানাধীন কারবার থেকে শুরু করে কোম্পানী – এমনকি, রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠানগুলোর যে কোন ক্ষতি রীমাপত্রের বদৌলতে পূরণ হতে পারে; রক্ষা পেতে পারে অনিবার্য বিপর্যয়ের হাত থেকে।
২. কারবারীকে রক্ষা করে (Protects the businessman):
(কোন কারবারী তার জীবনের স্থায়িত্ব সম্পর্কে জানেন না) বলতে পারেন না কখন তার জন্যে তারই স্বাস্থ্যের কি অবস্থা হতে পারে। অথচ, এরূপ এক অজানা কারণের জন্যে অনুপস্থিতিতে কারবারের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। কারবার রক্ষা পেলেই কারবারী রক্ষা পেতে পারেন। আর তা আজ সম্ভবপর হচ্ছে বীমার অবদানে।
৩. ব্যক্তির অনুপস্থিতিজনিত ক্ষতিপূরণ (Indemnification for the absence of key-man) :
মূলধন, দক্ষতা,অভিজ্ঞতা, শক্তি-সামর্থ্য, কর্মক্ষমতা, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা, সুখ্যাতি ইত্যাদি গুন ও যোগ্যতার কারণে (যে ব্যাক্তি কোন কারবার প্রতিষ্ঠানের জন্যে একান্তই অপরিহার্য হয়ে উঠেছেন – তার অনুপস্থিতিতে কারবার প্রতিষ্ঠানটি অপরিমেয় ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। এমন বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে বীমা প্রতিষ্ঠানগুলি বীমাপত্র প্রদান করে থাকে এবং অনিবার্য ধ্বংস থেকে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
৪. কারবারের নিরবচ্ছিন্নতা বজায় রাখতে ভূমিকা ( Role for the continuation of the business) :
যে কোন বিপদ-বিপর্যয় বা দুর্ঘটনা অথবা প্রতিকূল অবস্থার কারণে কারবার প্রতিষ্ঠান এমন খারাপ অবস্থায় পড়তে পারে যে, কারবারই চালানো দুঃসাধ্য হতে পারে বা বন্ধ রাখতে হতে পারে। এসব পরিস্থিতি ও বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে বীমাপত্র গ্রহণ করা থাকলে বীমকারী বীমাদাবীর অর্থ প্রদান করার মাধ্যমে কারবার চালু রাখতে সাহায্য করে থাকে।
৫. ঋণে বা ধারে কারবারী কার্যক্রম সম্প্রসারণ (Enhancement of business activities in credit) :
আধুনিক কারবারী জগতে অধিকাংশ লেনদেন হয় ধারে। ধারে কারবারী লেনদেন ও কার্যক্রম সম্প্রসারণের পেছনে অনন্য অবদান এই বীমার। কেননা, ধারে বিক্রয়ের মূল্য শোষ অথবা প্রদত্ত ঋণ ও তার সুদ যদি ক্রেতা বা দেনাদার পরিশোধ না করেন, তাহলে কারবারের অপরিমেয় ক্ষতি হয়ে যায়। এসব ক্ষেত্রে, বীমা করা থাকলে বীমাকারী তার ক্ষতিপূরণ করে দেন। সুতরাং, কারবারীগণ ধারে লেনদেন সম্পন্ন করতে বা ঋণ প্রদান করতে বিরত থাকছেন না, বরং, নির্দ্বিধায় তা করছেন বীমার অনন্য অবদানের ফলে।
৬. আমদানী-রপ্তানী ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে (Plays important role in the field of Import & Export) :
দেশের অভ্যন্তরে ধারে লেনদেন সম্পন্ন করতে যতটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকে, ততোধিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকে আমদানী-রপ্তানী ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রেও বীমা তার শাখা বিস্তার করেছে। দিয়েছে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। ধারে রপ্তানী করলে রপ্ততানীকারী স্বভাবতঃই থাকে এক দারুণ দুর্ভাবনায়, যতক্ষণ পাওনা না পান। রপ্তানী ধার বীমার মত ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব ক্ষেত্রেও বীমাকারী বীমাগ্রহীতাকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে থাকেন। ফলে, আমদানী-রপ্তানী ক্রমাগত সম্প্রসারিত হয়ে চলেছে বীমার অবদানে।
৭. শিল্পক্ষেত্রে বীমার ভূমিকা ( Role in the field of Inustry):
কল-কারখানা, যন্ত্রপাতি, দালানকোঠা, কাচামাল সরবরাহের অনিয়মিতা, শ্রমিক কর্মচারী, উৎপাদন বিভ্রাট, বিভিন্ন দুর্যোগময় পরিস্থিতি ইত্যাদি সংক্রান্ত বীমাপত্র চালু করে শিল্প প্রতিষ্ঠানের অনিশ্চয়তা, দুর্ঘটনা, ক্ষতি ইত্যাদি মোকাবেলা করার মাধ্যমে এক অনন্য সম্ভাবনা, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির দ্বার উম্মোচন করে দিয়েছে রীমা। তাছাড়া, বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো সাঞ্চিত তহবিল তথা রিজার্ভ-এর অর্থ বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে খাটানোর মাধ্যমে উন্নয়নে সহায়তা দান করে থাকে।

৮. শ্রমিক-কর্মচারীদের কল্যাণে ভূমিকা পালন করে (Plays role for the welfare of the employees) :
শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মকালীন চাকুরী বা কর্মসংশ্লিষ্ট কোন সুবিধা-অসুবিধার জন্য দায়ভাগে থাকেন নিয়োগকারী বা মালিক পক্ষ। তাই, শ্রমিক কর্মচারীদের বিপদ-আপদে বা দুর্ঘটনাজনিত কোন ক্ষতিপূরণ করে দেয়া অথবা জীবন যাপন ও পরিবার পরিচালনা সংক্রান্ত অনেক অসুবিধায় সাহায্য দেয়া মালিকের পক্ষে প্রকৃতপক্ষে দুঃসাধ্য বলে বীমা প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হন। আর, তাই বীমাকারী শ্রমিক কর্মচারীদের অকালমৃত্যু, কর্মক্ষমতাহীনতা, বৃদ্ধ বয়স ইত্যাকার অবস্থায় জীবন বীমা, দুর্ঘটনা ও অসুস্থতা ভাতা (Benefits) পেনশন সুবিধা ইত্যাদি প্রদানের জন্যে শ্রমিক কর্মচারীদের জন্যে গোষ্ঠী বীমা (Group Insurance) গ্রহন করে থাকেন। ফলে, শ্রমিক- কর্মচারীবৃন্দ অনেক সম্পদে কাজ করতে এবং জীবন যাপন করতে পারে।
৯. কারবারী দক্ষতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে (Helps in increasing the business efficiency) :
কারবারীগণ যদি অনিশ্চয়তা, দুর্ঘটনা, ক্ষতি ইত্যাদির আশংকাজনিত দুশ্চিন্তা, সমস্যা ও ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকতে পারেন তাহলে তাদের সময়, মনোযোগ, শক্তি- সামর্থ্য ইত্যাদি পুরোপুরি কাজে নিয়োজিত করতে পারেন। ফলে, তারা যেমন অনেক বেশী কার্য সম্পন্ন করতে পারেন, তেমনি অধিকতর দক্ষতার সাথে তা সম্পন্ন করতে পারেন। অর্থাৎ, আধুনিক কালে কারবারীগণ বীমা গ্রহণ করে এ ধরনের কামেলা, দুশ্চিন্তা ও সমস্যা থেকে মুক্ত হয়ে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারেন। মোদ্দা কথা, বীমা কারবারের দক্ষতা বৃদ্ধি করে।
