ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণকারী উপাদানসমূহ – পাঠটি “বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা” বিষয়ের “ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা” অধ্যায়ের একটি পাঠ। জীবন বীমার ক্ষেত্রে যেসব বিষয় বা উপাদান মৃত্যুহার বা মৃত্যুর সম্ভাবনা বৃদ্ধি কার, সেসব উপাদানই প্রকৃতপক্ষে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ বা বৃদ্ধি করে। এগুলোকে আবার কোন মানুষের আয়ুষ্কাল নিয়ন্ত্রণকারী উপাদানও বলা হয়। এতদব্যতীত কিছু উপাদান রয়েছে যা ঝুঁকি হ্রাস-বৃদ্ধি করে। যেসব বিষয় বা উপাদান ঝুঁকি বৃদ্ধি বা নিয়ন্ত্রণ করে তাদের সম্পর্কে নিম্নে সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলোঃ –
Table of Contents
ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণকারী উপাদানসমূহ

১। বয়স (Age):
জীবন বীমার ক্ষেত্রে বীমাগ্রহীতার বয়স ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণকারী একটি অন্যতম উপাদান। আমাদের দেশে দশ বছরের নীচে অথবা পঞ্চাশ বছরের উপরে বয়স যাদের, তাদের মৃত্যুর সম্ভাবনা বেশী এবং যাদের বয়স এর মাঝখানে, তাদের মৃত্যুর সম্ভাবনা স্বাভাবিক কারণেই কম থাকে। সুতরাং, বয়ঃক্রম যে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রকারী একটি উপাদান তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। তবে, বয়ক্রম নির্ধারণও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
যেমন : – কাটায় কাটায় ৩২ বছর দু’একজনের ক্ষেত্রে কখনও ঘটনাচক্রে হতে পারে কিন্তু প্রায় ক্ষেত্রেই তা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে তাই বীমাকারীগণ ৩১ বছর ৬ মাস পূর্তির দিন থেকে ৩২ বছর ৫ মাস ২৯ দিন যাদের বয়স তাদের ৩২ বছর বয়ঃক্রমের আওতাভূক্ত করেছেন। আবার, ৩২ বছর ৬ মাস থেকে ৩৩ বছর ৫ মাস ২৯ দিন পর্যন্ত হলো বয়ঃক্রম নির্ধারণ করা হয়। ৩৩ বছরের কোঠা।
২। শারীরিক গঠন (Build):
শারীরিক বা দৈহিক গঠন বলতে দেহের উচ্চতা, ওজন, ওজনের বটন এবং বুকের ব্যাপ্তি বা প্রসারতা ইত্যাদিকে বুঝায়। উক্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলির তথা দেহের সব কিছুরই একটা আনুপাতিক বন্টন, হ্রাস- বৃদ্ধি ও প্রত্যাশিত পরিমাণ এবং ফটন থাকে। যদি তা না থাকে তাহলেই বুঝা তথা পরীক্ষায় ধরা পড়ার যে, শরীরের কোথাও কোন গোপন ব্যাধি রয়েছে। বয়সের প্রেক্ষিতে তা বিচাৰ্থী। যেমনঃ- অল্প বয়সে প্রত্যাশিত ওজনের চেয়ে কম এবং বেশী বয়সে বেশী ওজন হলে তা শরীরের জন্যে ক্ষতিকারক। এ বিষয়গুলি মানুষের মৃত্যুহার ও আয়ুষ্কাল তথা ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের জন্যে অন্যতম উপালন।
৩। স্বাস্থ্যগত অবস্থা (Physical Condition) :
আবেদনকারীর দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণ শক্তি, হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, পাকযন্ত্র, কিডনী, স্নায়বিক প্রক্রিয়া ইত্যাদি নিয়েই স্বাস্থ্যগত অবস্থা বুঝায়। এগুলির উপর নির্ভর করেই বিশেষজ্ঞগণ প্রস্তাবিত বীমাগ্রহীতার আয়ুকাল সম্পর্কে ধারণা করতে পারেন। এগুলোর কোন অসঙ্গতি বা ত্রুটি স্বাস্থ্য বিপর্যয় নির্দেশ করে এবং স্বভাবতঃই স্বাস্থ্যগত অবস্থা ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের উপাদান হিসেবে কাজ করে।
৪। ব্যক্তিগত ইতিবৃত্ত (Personal History) :
প্রস্তাবিত বীমাগ্রহীতার (ক) অতীত অভ্যাস, (খ) স্বাস্থ্যগত বিবরণ, (গ) পূর্বতন পেশা, (ঘ) বীমা সংক্রান্ত ইতিবৃত্ত ইত্যাদির সমষ্টিই হলো তার ব্যক্তিগত বিবরণ। ব্যক্তিগত ইতিবৃত্ত যদি ভাল হয়, তাহলে ঝুঁকি কম থাকে। আর, ব্যক্তিগত ইতিবৃত্ত যদি খারাপ হয়, তাহলে ঝুঁকি বেশী থাকে স্বাভাবিক কারণেই।
[(ক) মদ্যপান যদি তার অতীত অভ্যাস হয় অথবা
(খ) বিগত ৫ বছর যাবৎ যদি প্রস্তাবিত বীমাগ্রহীতা কোন মারাত্মক রোগে ভুগে থাকেন অথবা (গ) ইতিপূর্বে তিনি কোন বিপদজনক অথবা অস্বাস্থ্যকর পেশায় নিয়োজিত
ছিলেন অথবা (ঘ) ইতিমধ্যে যদি তিনি কোন বীমা প্রতিষ্ঠানের সাথে বীমাকৃত হয়ে থাকেন, সে ক্ষেত্রে বা তার বীমাপত্র গ্রহণের ব্যাপারে সন্দেহজনক অবস্থার সৃষ্টি হয়ে থাকে এবং এরূপ ক্ষেত্রে স্বভাবতঃই ঝুঁকির মাত্রা বেড়ে যায়। ]
- সুতরাং, বীমাগ্রহীতার ব্যক্তিগত ইতিবৃত্ত ঝুঁকি নিরূপণ ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একটি অন্যতম উপাদান।
৫। পারিবারিক ইতিহাস (Family History) :
ব্যক্তিগত ইতিবৃত্তের ন্যায় প্রস্তাবিত বীমাগ্রহীতার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের স্বাস্থ্য, অভ্যাস, পেশা ইত্যাদি সংক্রান্ত ইতিবৃত্ত ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের উপাদান। কেননা, এগুলো পারস্পরিকভাবে একটি অপরটিকে প্রভাবিত করে থাকে। যেমনঃ- যেসব রোগ বৈশিষ্ট্যগতভাবে বংশানুক্রমিক, সেগুলি স্বভাবতঃই ঝুঁকির মাত্রা প্রভাবিত বা বৃদ্ধি করে।
৬। পেশা (Occupation) :
প্রস্তাবিত বীমাগ্রহীতার পেশা আর একটি অন্যতম উপাদান যা ঝুঁকি প্রভাবিত করে। প্রথমতঃ কাজের প্রকৃতি এমন বিপদজনক হতে পারে যে, সম্ভাব্য বীমাগ্রহীতা যে কোন সময় দুর্ঘটনা কবলিত হতে পারেন। দ্বিতীয়তঃ পেশাটির কর্ম পরিবেশ এমন হতে পারে যে, বীমাগ্রহীতার নৈতিক মধ্যপতন ঘটতে পারে। তৃতীয়তঃ প্রস্তাবিত বীমাকৃত ব্যক্তি কর্মরত অবস্থায় রাসায়নিক বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন। এ ছাড়াও, নোংরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, পেশাগত রোগ, অতিরিক্ত কর্ম ও দায়িত্ব ভারাক্রান্ত হলে মানসিক ও স্নায়বিক চাপজনিত কারণে প্রস্তাবিত বীমাকৃতের আয়ুষ্কাল প্রভাবিত করে থাকে।
৭। আবাস (Residence) :
সম্ভাব্য বীমাকৃতের আবাস ঝুঁকির মাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী আর একটি উপাদান। আবাস যদি কোন প্রতিকূল জলবায়ু অঞ্চলে হয় বা কোন অস্বাস্থ্যকর এলাকায় হয় অথবা চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যরক্ষা সুবিধার অভাব রয়েছে এমন দুর্গম এলাকায় হয়, তাহলে ঝুঁকির মাত্রা যে বেশী হবে তা বলাই বাহুল্য।
৮। বর্তমান অভ্যাস (Present habits) :
প্রস্তাবকারীর চলতি জীবনধারা বা অভ্যাসও ঝুঁকি হ্রাস-বৃদ্ধি করতে পারে। যেমন : – অতিরিক্ত মদ্যপ বা ধূমপায়ীর আয়ুষ্কাল দ্রুতগতিতে হ্রাস পেতে থাকে।
৯। নৈতিক চরিত্র (Morals) :
প্রস্তাবিত বীমাগ্রহীতার নৈতিক চরিত্র ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণকারী আর একটি উপাদান। বিপদ সাধারণতঃ দুই প্রকার। যথা : – নৈতিক বিপদ (Moral Hazard) ও প্রাকৃতিক বিপদ (Physical Hazard)। (1) নৈতিক বিপদ বা বিপর্যয়ই নৈতিক ঝুঁকির উৎস। কারও চারিত্রিক বিপর্যয় বিশেষতঃ যৌন অসদাচরণ বা বদভ্যাস দুরারোগ্য রোগ-ব্যাধি ডেকে আনে এবং আয়ুষ্কাল হ্রাস করে। তাই, কোন কুখ্যাত দুশ্চরিত্র লোকের প্রস্তাব কোন বীমাকারী গ্রহণ করেন না।

১০। বংশ ও জাতীয়তা (Race and Nationality):
জাতিভেদে মানুষের আয়ুষ্কাল বা মৃত্যুহার বিভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন :- বংশের লোকদের মৃত্যু হার কম এবং নিম্ন সম্প্রদায়ের লোকদের মৃত্যুহার বেশী। : বংশ ও উচ্চ ধারণা করা হয়। আবার, নিরক্ষীয় অঞ্চলের দেশগুলোর লোকদের মৃত্যুহার বেশী হয়ে থাকে। তাই, বংশ ও জাতীয়তাও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণকারী একটি উপাদন।
১১। নারী ও পুরুষ ভেদ (Sex):
নারীদের পুরুষ অপেক্ষা মৃত্যুহার বেশী হয়। কেননা, প্রসবকালীন বিপদই তাদের আয়ুষ্কাল হ্রাস ও মৃত্যুহার বৃদ্ধির অ কারণ। তাছাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদির অভাব, সংকীর্ণ ও পরিপন্থী পরিবেশগত কারণে তাদের আয়ুষ্কাল ক্ষতিগ্রস্ত হয় যা ঝুঁকি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
১২। আর্থিক মর্যাদা (Economic Status) :
প্রস্তাবকারীর পারিবারিক এবং কারবারী আর্থিক অবস্থা ও মর্যাদা প্রস্তাবিত বীমাপত্রের মূল্যের সাথে বিচার করে দেখা বাঞ্ছনীয়। কেননা, প্রস্তাবিত বীমাগ্রহীতা প্রস্তাবিত মূল্যের বীমাপত্র অনুযায়ী আর্থিক প্রতিশ্রুতি পালনে সক্ষম হবেন কিনা তা দেখা দরকার। তাছাড়া, উচ্চ আর্থিক মর্যাদা সম্পন্ন লোকের মৃত্যুহারও কম হয়ে থাকে।
১৩। প্রতিরক্ষা সার্ভিস (Defence Service) :
জীবনরক্ষাকারী বা নিরাপত্তামূলক কৌশলবৃদ্ধি হওয়া সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত প্রতিরক্ষা পেশাকেই সবচেয়ে বিপদজনক পেশা হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। তাই এ পেশায় ঝুঁকি সর্বাপেক্ষা বেশী।
১৪। বীমা পরিকল্পনা (Insurance Plan) :
কিছু কিছু বীমা পরিকল্পনা বা পত্রই বৈশিষ্ট্যগতভাবে অধিকতর ঝুঁকি বহন করে এবং সে কারণেই ঐ ধরনের বীমাপত্র শুধু প্রথম শ্রেণীর জীবনের জন্যেই প্রদান করা হয়ে থাকে। যেমন: বহুমুখী বীমাপত্র (Multipurpose policy)। এ ধরনের বীমাপত্র বহুবিধ সুবিধানদানকারী বিধায় অধিক মাত্রায় ঝুঁকি বহন করে থাকে। সুতরাং, বীমাপত্রের ধরন বা বৈশিষ্ট্যই আবার ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণকারী একটি উপাদান। মোটামুটিভাবে, উপরোক্ত বিষয়গুলিই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণকারী উপাদান।
