ডিজিটাল রূপান্তরে চাপে হংকংয়ের বীমা শিল্প

হংকংয়ের বীমা খাত বর্তমানে সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সংশ্লিষ্ট হুমকি এবং দ্রুত ডিজিটাল সেবার ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সরবরাহকারী ও অংশীদার প্রতিষ্ঠানের দুর্বল সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে বাড়তি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপ ও শিল্পভিত্তিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রযুক্তিনির্ভর সেবার চাহিদা বাড়লেও অনেক বীমা প্রতিষ্ঠান এখনো পুরোনো পেমেন্ট অবকাঠামো ও ম্যানুয়াল কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল রয়েছে।

নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আর্থিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান Adyen N.V.-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হংকংয়ের গ্রাহকেরা এখন বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকেও ই-কমার্স ও রাইড-হেইলিং প্ল্যাটফর্মের মতো দ্রুত, সহজ এবং নির্বিঘ্ন ডিজিটাল অভিজ্ঞতা প্রত্যাশা করছেন। জরিপে অংশ নেওয়া ৪১ শতাংশ গ্রাহক জানিয়েছেন, বীমা সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে তারা এখন গ্রাহক অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

Adyen-এর হংকং প্রধান কাই ট্যাং প্রতিবেদনে বলেন, বর্তমান সময়ে গ্রাহকেরা শুধু বিভিন্ন বীমা প্রতিষ্ঠানের সেবার তুলনা করছেন না; বরং তারা নিজেদের ব্যবহৃত জনপ্রিয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর মানদণ্ডেও বীমা সেবাকে মূল্যায়ন করছেন। তিনি বলেন, গ্রাহকেরা এখন এক ক্লিকের মাধ্যমে প্রিমিয়াম পরিশোধ, দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি এবং সহজে পলিসি ব্যবস্থাপনার সুবিধা প্রত্যাশা করেন।

প্রতিবেদনটি ২ হাজার হংকংভিত্তিক গ্রাহক এবং বীমা শিল্পের ২০৪ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মতামতের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠানের পুরোনো প্রযুক্তি ব্যবস্থা এখনো নতুন গ্রাহক অন্তর্ভুক্তি, প্রিমিয়াম সংগ্রহ এবং বীমা দাবির নিষ্পত্তির গতি কমিয়ে দিচ্ছে।

জরিপে অংশ নেওয়া অর্ধেকের বেশি বীমা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তারা এখনো ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সময় ও সম্পদ ব্যয় করছে। এছাড়া ৯৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠান স্বীকার করেছে যে, কিছু লেনদেনের ক্ষেত্রে তারা এখনো চেকের মতো পুরোনো পেমেন্ট পদ্ধতি ব্যবহার করছে, যদিও গ্রাহকদের মধ্যে ডিজিটাল লেনদেনের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।

অংশগ্রহণকারী বীমা প্রতিষ্ঠানের প্রায় অর্ধেক মনে করছে, আগামী পাঁচ বছরে তাৎক্ষণিক ও নির্বিঘ্ন ডিজিটাল সেবার চাহিদা তাদের জন্য বড় প্রতিযোগিতামূলক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে তরুণ গ্রাহকদের মধ্যে মোবাইলভিত্তিক সেবা ও দ্রুত লেনদেনের প্রত্যাশা বৃদ্ধির কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রযুক্তি আধুনিকায়নের দিকে আরও গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।

প্রতারণা ও জালিয়াতির ঝুঁকিও বীমা শিল্পের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। Adyen জানিয়েছে, ৭৪ শতাংশ বীমা প্রতিষ্ঠান বলেছে যে জালিয়াতির কারণে তাদের বার্ষিক আয়ের প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হচ্ছে। তবে অনেক প্রতিষ্ঠান মনে করছে, অতিরিক্ত কঠোর নিরাপত্তা যাচাই ব্যবস্থা চালু করলে বৈধ গ্রাহকদের লেনদেনের গতিও ধীর হতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সহস্রাব্দ প্রজন্মের বা মিলেনিয়াল গ্রাহকদের ৯২ শতাংশ জানিয়েছেন, লেনদেনের গতি ও সুবিধা বাড়লে তারা দ্বিস্তর নিরাপত্তা যাচাইকরণ বা টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন গ্রহণ করতে প্রস্তুত। তা সত্ত্বেও মাত্র ২৮ শতাংশ বীমা প্রতিষ্ঠান বর্তমানে এআইভিত্তিক জালিয়াতি শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। অন্যদিকে ৫২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এআই প্রযুক্তি বাস্তবায়নের ব্যয় বেশি মনে করায় এখনো এ ধরনের প্রযুক্তি গ্রহণে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে।

অন্যদিকে QBE Insurance Group Ltd.-এর পৃথক এক জরিপে দেখা গেছে, হংকংয়ের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো এআই ব্যবহারের বিষয়ে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় বেশি আশাবাদী হলেও সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এখনো উল্লেখযোগ্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি অংশীদার এবং বহিরাগত সেবা প্রদানকারীদের দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বড় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

QBE Asia-এর আঞ্চলিক সাইবার প্রধান স্যাম রাসেল-ভিক প্রতিবেদনে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু নিজেদের সাইবার প্রতিরক্ষা নিয়ে ভাবলেই যথেষ্ট নয়। তাদের সরবরাহকারী ও অংশীদার প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা দুর্বলতাও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে, কারণ সাইবার অপরাধীরা এখন অংশীদারিত্বভিত্তিক নেটওয়ার্কের দুর্বলতাকে কাজে লাগাচ্ছে।

জরিপে অংশ নেওয়া হংকংয়ের ৯৬ শতাংশ ব্যবসা ও প্রযুক্তি খাতের নেতা মনে করেন, আগামী দুই বছরে এআই তাদের ব্যবসায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বৈশ্বিক পর্যায়ে এই হার ৯২ শতাংশ। বর্তমানে ৮১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে এবং আরও ১৭ শতাংশ ভবিষ্যতে এ প্রযুক্তি গ্রহণের পরিকল্পনা করছে।

এআই ব্যবহারের প্রধান কারণ হিসেবে ৫৬ শতাংশ উত্তরদাতা পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেছেন। এছাড়া ৫১ শতাংশ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, ৪৩ শতাংশ কার্যগত নমনীয়তা, ৩৮ শতাংশ উদ্ভাবন সক্ষমতা বৃদ্ধি, ৩৮ শতাংশ প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অর্জন এবং ২৬ শতাংশ রাজস্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনার কথা বলেছেন।

তবে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি সাইবার হামলার ঝুঁকিও বাড়ছে। QBE-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে হংকংয়ের ৫৯ শতাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান অন্তত একটি সাইবার ঘটনার মুখোমুখি হয়েছে। আক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৮ শতাংশ এক বা একাধিক দিনের জন্য ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বিঘ্নের শিকার হয়েছে।

এসব ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ১০০ থেকে ২ হাজার কর্মীসংবলিত হংকংয়ের ২২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এখনো সাইবার বীমা গ্রহণ করেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

Leave a Comment