দাবী পরিশোধ – পাঠটি “বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা” বিষয়ের “জীবন বীমা” অধ্যায়ের একটি পাঠ। জীবন বীমা চুক্তি সম্পাদনের শেষ পর্যায় হচ্ছে—জীবন বীমার দাবীপুরণ বা পরিশোষ। অন্যান্য বীমার ক্ষেত্রেও এ পর্যায়টি থাকে। তবে, জীবন বীমার ক্ষেত্রে পর্যায়টি যেমন নিশ্চিত, অন্যান্য বীমার ক্ষেত্রে ঠিক তেমনটি নয়। কেননা, অন্যান্য বীমার ক্ষেত্রে ক্ষতি সংঘটিত হলেই শুধু ক্ষতি বা দাবী পূরণের প্রশ্ন আসে; তাও আবার বীমাকৃত দুর্ঘটনা বা বিপদ-আপদে ক্ষতি সংঘটিত হলে।
তাইতো, ঐসব বীমা চুক্তিকে ক্ষতিপূরণের চুক্তি বলে। পক্ষান্তরে, জীবন বীমার ক্ষেত্রে ঘটনা সংঘটনের ব্যাপারটি থাকে নিশ্চিত। যেমন : – – বীমাগ্রহীতা বা বীমাকৃত ব্যক্তি যে মেয়াদের জন্যে বীমা গ্রহণ করে থাকেন, সে মেয়াদ যদি তার ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত হয় – তাহলে উক্ত ৫০ ভছর বয়সের মধ্যে তার মৃত্যু না হলে এক সময় তার ৫০ বছর বয়স হবেই।
দাবী পরিশোধ

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, জীবন-বীমায় বস্তুতঃ দু’টি প্রেক্ষিতে দাবী উত্থাপিত হয়। যথা:-
(১) বীমার নির্ধারিত মেয়াদ অতিক্রান্ত হলে বা বীমাগ্রহীতার নির্ধারিত বয়সোত্তীর্ণ হলে বীমাচুক্তি পরিপক্ক (Matured) হয় বিধায় বীমাগ্রহীতা বীমাদাবী উত্থাপন করতে পারেন এবং
(২) চুক্তি নির্ধারিত বীমার মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার আগেই বীমাগ্রহীতার বা বীমাকৃত ব্যক্তির মৃত্যু ঘটলে তথা বীমাগ্রহীতার অকাল মৃত্যুতে বীমাকৃত অর্থ দাবীতে পরিণত হয়। • অর্থাৎ, বীমাদাবী উত্থাপন করা যায়।
[মেয়াদী মৃত্যুতে বীমাদাবী উত্থাপনেয় হয়। কিন্তু, আজীবন-বীমায় বীমাগ্রহীতার মৃত্যু হলেই শুধু বীমা দাবী উত্থাপন করা যায়। আজীবন-বীমায় বীমাগ্রহীতার জীবদ্দশায় বীমাচুক্তি পরিপক্ক (Matured) হনো বিধায় বীমা দাবী উত্থাপন করা যায় না। বিভিন্ন প্রকার জীবন-বীমায় দাবী উত্থাপনের সময় বা পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে বটে, কিন্তু, সাময়িক বীমা সহ আরও দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া জীবন-বীমায় সাধারণভাবে প্রায় সবক্ষেত্রেই বীমা দাবী পরিশোধ করতে হয়।]
সুতরাং, জীবন-বীমায় বীমা দাবী উত্থাপন এক প্রকার নিশ্চিত ব্যাপার। কিন্তু, অন্যান্য বীমার ক্ষেত্রে বীমাকৃত বিপদ-বিপর্যয় সংঘটনে ক্ষতি হলেই কেবল দাবী উত্থাপন করা যায় যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।
যাই হোক, জীবন-বীমার দাবী উত্থাপন ও পরিশোধের জন্যে বীমাকৃত ঘটনা সংঘটনের উপযুক্ত প্রমাণ বীমাকারী বা বীমা প্রতিষ্ঠানের কাছে দাখিল করতে হয়।
প্রথমতঃ বীমার মেয়াদ শেষ হলে বা বীমাগ্রহীতার নির্ধারিত বয়স উত্তীর্ণ হলে, অন্যান্য পাওনাসহ বীমার অর্থ সরাসরি বীমাগ্রহীতাকে বা তার কোন মনোণীত ব্যক্তিকে পরিশোধ করা হয়। তবে, সেক্ষেত্রে বীমাগ্রহীতা বা বীমাকৃত ব্যক্তির বয়সের প্রমাণপত্র চাওয়া হয়। বয়সের প্রমাণপত্র চুক্তিকালীন প্রদান করাই বিধেয়। তখন না দেয়া হয়, দাবী উত্থাপন কালীন বা তার আগে যেকোন সময় তা দেয়া যায়।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, প্রকৃত বয়স বর্ণিত বয়স অপেক্ষা কম হলে, প্রদত্ত কিস্তির অতিরিক্ত অর্থ বীমার দায় বা দাবী পরিশোধের সময় ফেরত দেয়া হয়; আর, প্রকৃত বয়স যদি বর্ণিত বয়স অপেক্ষা বেশী হয়, তাহলে প্রদত্ত কিস্তির অর্থের যত টাকার বীমা করা সম্ভব হতো, বীমাকৃত টাকাকে তত টাকায় কমিয়ে আনা হয় অথবা যত টাকা কিস্তি কম দেয়া হয়েছে তা সুদসহ পরিশোধ্য বীমাদাবীর বা দায়ের অংক থেকে কেটে রাখা হয়।
এসব জটিলতার জন্যেই বয়সের প্রমাণপত্র চুক্তিকালীন দেয়াই বিধেয়। আর, রীমাগ্রহীতার জীবৎকালেই বীমার দায় পরিশোধ্য হলে, মেয়াদ শেষ হওয়ার কিছুদিন আগে থেকেই বীমাকারী বীমাগ্রহীতা পরস্পর যোগাযোগের মাধ্যমে দাবী পরিশোধের প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে রাখতে পারেন যাতে দাবী উত্থাপনের সাথে সাথে বা অনতিবিলম্বে পরিশোধ করা সম্ভব হয়।
দ্রঃকোন ব্যক্তি নিজের জীবনের জন্যে বীমাপত্র গ্রহণ করলে তিনি একাধারে বীমাপত্রধারী বা বীমাগ্রহীতা (Insurance Policy-holder) ও বার্মীকৃত (Insured,বীমাকৃত ব্যক্তি (Insured Person)। আর, অন্যের জীবনের জন্যে বীমাপত্র গ্রহণ করলে, তিনি বীমাপত্রধারী বা বীমাগ্রহীতা হন বটে, কিন্তু বীমাকৃত হন না; বরং, যার বা যাদের জন্য বীমাগ্রহণ করা হয়, তিনি বা তারাই হন বীমাকৃত ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ (Insured Person or Persons)।

দ্বিতীয়তঃ মৃত্যুতে পরিশোধযোগ্য বীমা দাবীর ক্ষেত্রে, বীমাগ্রহীতা বা বীমাকৃত ব্যক্তির মৃত্যুর সন্তোষজনক প্রমাণপত্র দাখিল করতে হয় এবং দাবীদারের অধিকার সম্পর্কেও উপযুক্ত প্রমাণ দাখিল করতে হয়। এতদুদ্দ্যেশ্যে, নিম্নে বর্ণিত প্রমাণপত্র/প্রমাণপত্রসমূহকে গ্রহণযোগ্য ও সন্তোষজনক বলে মনে করা হয়ঃ-
ক. বীমাগ্রহীতার মৃত্যুর প্রমাণ ( Proof of death of the insured) : বীমাগ্রহীতার মৃত্যুর প্রমাণে যেসব প্রমাণপত্রকে আইনগতভাবে সন্তোষজনক বলে গণ্য করা হয় –
(i) বীমাগ্রহীতার মৃত্যুর সময় চিকিৎসারত চিকিৎসক প্রদত্ত মৃত্যু সনদপত্র (Death Certificate);
(ii) স্থানীয় সংস্থা বা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সংগৃহীত বীমাগ্রহীতার মৃত্যুর প্রমাণপত্র
(iii) বীমাগ্রহীতার সাথে পরিচিত এবং তার মৃত্যুর সময় উপস্থিত ছিলেন এমন কোন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি প্রদত্ত প্রমাণপত্র এবং
(iv) মৃত বীমাগ্রহীতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় তথা মৃত্যু পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা সমূহে (Funeral or After death formalities) উপস্থিত ছিলেন, এমন কোন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি প্রদত্ত প্রমাণপত্র।
উক্ত প্রমাণপত্রসমূহ থেকে৷ যদি যথার্থভাবে প্রতীয়মান হয় যে, সংশ্লিষ্ট বীমাগ্রহীতার মৃত্যু আত্মহত্যা বা কোন ষড়যন্ত্রমূলক মৃত্যু ছিলনা বরং তা ছিল স্বাভাবিক মৃত্যু, তাহলে বীমাকারী যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে প্রকৃত উত্তরাধিকারী বা সঠিক দাবীদারকে বীমাকৃত অর্থ বা বীমাদাবী পরিশোধ করে থাকেন।
