এশিয়া-প্যাসিফিক তথা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের পরিধি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সমসাময়িক বৈশ্বিক বাজারের সাথে তাল মেলাতে সচেষ্ট হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে তারা বেসরকারি বাজার বা প্রাইভেট মার্কেট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করছে। তবে এই আধুনিক এবং উচ্চাভিলাষী বিনিয়োগ ব্যবস্থার সাথে প্রয়োজনীয় সামঞ্জস্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদ্যমান পুরোনো ও অপ্রচলিত প্রযুক্তিগত অবকাঠামো বা লিগ্যাসি সিস্টেমস একটি প্রধান অন্তরায় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে, জটিল বিনিয়োগ পোর্টফোলিওগুলো দক্ষতার সাথে এবং নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে এই অঞ্চলের অধিকাংশ বীমা প্রতিষ্ঠানের বর্তমান আইটি সক্ষমতায় বড় ধরনের ঘাটতি ও সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হচ্ছে।
বৈশ্বিক আর্থিক ও বীমা বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ক্লিয়ারওয়াটার অ্যানালিটিক্স হোল্ডিংস ইনকর্পোরেট এবং এ.এম. বেস্ট কোম্পানি ইনকর্পোরেটের সাম্প্রতিক পৃথক দুটি গবেষণা প্রতিবেদনে এই সংকটের চিত্রটি সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনগুলোর সামগ্রিক তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং শক্তিশালী ডেটা পরিকাঠামো প্রস্তুত না করেই জটিল বিনিয়োগ খাতে মূলধন খাটানোর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো নানাবিধ প্রাতিষ্ঠানিক, প্রযুক্তিগত এবং পরিচালনগত ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে।
বেসরকারি বাজারে বিনিয়োগের রূপরেখা ও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ
ক্লিয়ারওয়াটার অ্যানালিটিক্স হোল্ডিংস-এর পক্ষ থেকে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বীমা খাতের ১৫০ জন উচ্চপদস্থ ও নীতি-নির্ধারক কর্মকর্তার ওপর একটি বিশদ জরিপ পরিচালনা করা হয়। উক্ত জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, এই অঞ্চলের বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ৩.৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক বিনিয়োগ বাজারের গতিপ্রকৃতি বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠানগুলো আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তাদের এই বিশাল সম্মিলিত সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ বা প্রায় ৩৩.৩ শতাংশ অনাগত দিনে বেসরকারি ঋণ বা প্রাইভেট ডেট, বেসরকারি ইক্যুইটি বা প্রাইভেট ইক্যুইটি, অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প এবং অন্যান্য বিকল্প বিনিয়োগের খাতে বরাদ্দ বা স্থানান্তরের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। উল্লেখ্য যে, বর্তমানে এই ধরণের বিকল্প ও বেসরকারি খাতগুলোতে তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ মোট সম্পদের মাত্র ২০ শতাংশ জুড়ে রয়েছে।
বিনিয়োগের এই বিশাল ও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা থাকা সত্ত্বেও, জরিপে অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি বড় অংশ তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। জরিপভুক্ত কর্মকর্তাদের ৯৩ শতাংশই সরাসরি স্বীকার করেছেন যে, তাদের প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান পুরোনো ও মান্ধাতা আমলের প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো সরাসরি তাদের ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি ও সম্প্রসারণের পথকে মারাত্মকভাবে ruddha বা সীমিত করে তুলছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, নতুনভাবে গড়ে তোলা জটিল সম্পদ বা বিকল্প বিনিয়োগের পোর্টফোলিওগুলো সঠিকভাবে তদারকি ও ব্যবস্থাপনা করার ক্ষেত্রে মাত্র ২৩ শতাংশ কর্মকর্তা তাদের বর্তমান প্রযুক্তিগত সিস্টেমের ওপর আস্থা প্রকাশ করতে পেরেছেন। এর বাইরে, মাত্র ৪২ শতাংশ বীমা প্রতিষ্ঠান তাদের ডেটা ইন্টিগ্রেশন বা তথ্য সমন্বয় ব্যবস্থার গুণগত মানকে চমৎকার বা আন্তর্জাতিক মানসম্মত বলে রেটিং দিয়েছে।
ক্লিয়ারওয়াটার অ্যানালিটিক্সের চিফ স্ট্র্যাটেজি অফিসার এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট শেন অ্যাকরয়েড এই বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত ভারসাম্যহীনতার বিষয়ে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে আলোকপাত করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, যেসকল বীমা প্রতিষ্ঠান এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রবৃদ্ধির পরবর্তী ধাপে নেতৃত্ব দিতে চায়, তারা ইতিমধ্যেই নিজেদের সক্ষমতা নিয়ে আত্মমূল্যায়ন শুরু করেছে। তাদের মূল জিজ্ঞাসা হলো—প্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবকাঠামো কি তাদের লক্ষ্যমাত্রার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, এবং এই ক্রমবর্ধমান জটিল ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে টিকে থাকার মতো পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তাদের রয়েছে কি না। তিনি দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করেন যে, বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে স্থায়িত্ব বজায় রাখতে হলে বিদ্যমান প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোর আমূল সংস্কার ও উন্নয়ন অপরিহার্য।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গ্রহণের প্রবণতা ও ডেটা গভর্ন্যান্সের সীমাবদ্ধতা
বীমা খাতের সামগ্রিক ব্যবসায়িক মডেলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ভূমিকা এবং এর প্রভাব মূল্যায়ন করতে এ.এম. বেস্ট কোম্পানি ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে একটি জরিপ পরিচালনা করে, যা পরবর্তী সময়ে প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ করা হয়। এই গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বিমা খাতের প্রায় ৬০ শতাংশ উত্তরদাতা এই বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন যে, আগামী এক থেকে তিন বছরের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি তাদের প্রচলিত ব্যবসায়িক মডেলকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দেবে এবং একটি বড় ধরনের রূপান্তর বা রি-শেপ ঘটাবে। এআই প্রযুক্তির এই অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে অঞ্চলের ৬৬ শতাংশ বীমা প্রতিষ্ঠান আগামী ১২ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে এআই সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত খাতে তাদের বার্ষিক বাজেট বা ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
তবে বিনিয়োগের এই আগ্রহের বিপরীতে প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত প্রস্তউতির অভাব এখানেও একটি বড় দেয়াল হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এ.এম. বেস্ট-এর জরিপ থেকে জানা যায়, বিপুল আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও মাত্র ২০ শতাংশ বীমা প্রতিষ্ঠান বর্তমানে তাদের কার্যক্রমে এআই ব্যবহারের উন্নত বা অগ্রসর পর্যায়ে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে।
এই মন্থর গতির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এ.এম. বেস্ট-এর ইন্ডাস্ট্রি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিক্স বিভাগের সিনিয়র ডিরেক্টর শ্রীধর মানিয়েম তার প্রাতিষ্ঠানিক মন্তব্যে জানিয়েছেন যে, এআই প্রযুক্তির সঠিক কার্যকারিতা সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে মানসম্মত তথ্যের ওপর। যদি মূল ডেটা বা তথ্যের গুণগত মান দুর্বল হয়, তথ্যসমূহ যদি বিভিন্ন পুরোনো ও বিচ্ছিন্ন সিস্টেমে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বা খণ্ডিত অবস্থায় থাকে, কিংবা তথ্যের ওপর যদি উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণ বা প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি না থাকে, তবে এআই ব্যবস্থা ত্রুটিপূর্ণ, অসংলগ্ন এবং অবিশ্বস্ত ফলাফল প্রদান করতে পারে। তিনি আরও যোগ করেন যে, যেসকল বীমা প্রতিষ্ঠানের ডেটা গভর্ন্যান্স বা তথ্য শাসন ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো অত্যন্ত শক্তিশালী এবং যাদের আধুনিক তথ্য ব্যবস্থা রয়েছে, তারা অন্যান্যদের তুলনায় অনেক সহজে এবং সফলভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিকে নিজেদের মূল চালিকাশক্তি ও অপারেশন্সের সাথে একীভূত বা ইন্টিগ্রেট করতে সক্ষম হবে।
এআই বিনিয়োগের মূল চালিকাশক্তি ও প্রধান পরিচালনগত প্রতিবন্ধকতাসমূহ
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত সুনির্দিষ্ট কিছু বাণিজ্যিক সুফল পাওয়ার উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিতে মূলধন বিনিয়োগ করছে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করার পেছনে প্রধানত তিনটি মূল লক্ষ্য ও চালিকাশক্তি কাজ করছে:
কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি: জরিপে অংশ নেওয়া ৬৮ শতাংশ উত্তরদাতার মতে, প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বা কর্মীদের কর্মক্ষমতা, কাজের গতি এবং সার্বিক উৎপাদনশীলতা বাড়ানোই তাদের প্রধান ও প্রথম লক্ষ্য।
পরিচালন ব্যয় হ্রাস: প্রায় ৪৭ শতাংশ বীমা প্রতিষ্ঠান তাদের দৈনিক ও দীর্ঘমেয়াদী পরিচালন খরচ কমিয়ে এনে আর্থিক সাশ্রয় নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে এআই ব্যবহারের পক্ষে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করেছে।
ঝুঁকি মূল্যায়ন ও নিখুঁত মূল্য নির্ধারণ: আনুমানিক ৩৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান উন্নত আন্ডাররাইটিং বা বীমা ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে এবং গ্রাহকদের জন্য সঠিক ও লাভজনক প্রিমিয়াম মূল্য নির্ধারণের জন্য এআই প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে আগ্রহী।
তবে লক্ষ্য যতই সুদূরপ্রসারী হোক না কেন, এই উদ্দেশ্যগুলো সফলভাবে বাস্তবায়নের পথে বড় ধরণের প্রযুক্তিগত বাধা বা ব্যারিয়ার্স চিহ্নিত করেছে এ.এম. বেস্ট কোম্পানি। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে যে, এআই প্রযুক্তি পূর্ণাঙ্গভাবে গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধান তিনটি প্রতিবন্ধকতা হলো—ডেটার উপযোগিতা বা সঠিক প্রস্তুতি, সাইবার নিরাপত্তা ও গ্রাহকের তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা, এবং প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান পুরোনো লিগ্যাসি সিস্টেমের সাথে নতুন এআই প্রযুক্তির সফল সমন্বয় সাধনের জটিলতা।
অনুরূপভাবে, ক্লিয়ারওয়াটার অ্যানালিটিক্সের প্রতিবেদনেও তথ্যের এই সমন্বয়হীনতা এবং জটিল সম্পদের পোর্টফোলিও পরিচালনায় প্রযুক্তিগত অক্ষমতার চিত্রটি উঠে এসেছে। পরিশেষে বলা যায়, এই অঞ্চলের বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য তাদের পুরোনো ও দুর্বল প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর আধুনিকায়ন এবং ডেটা পরিকাঠামোর আমূল সংস্কার সাধন না করে দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধি অর্জন করা এবং বেসরকারি বাজারের জটিল বিনিয়োগ সামলানো একটি অত্যন্ত কঠিন ও বড় চ্যালেঞ্জ।
