ভারতের ব্যাংকিং খাতে আমানত বিমা প্রিমিয়াম নির্ধারণে দীর্ঘদিনের একক হার পদ্ধতির অবসান ঘটতে যাচ্ছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই) ঘোষণা দিয়েছে, আগামী ১ এপ্রিল থেকে ব্যাংকগুলোর আমানত বিমা প্রিমিয়াম তাদের নিজস্ব ঝুঁকি প্রোফাইলের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে। নতুন এই কাঠামো বাস্তবায়ন করবে ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স অ্যান্ড ক্রেডিট গ্যারান্টি করপোরেশন (ডিআইসিজিসি)।
১৯৬২ সাল থেকে ভারতে আমানত বিমা প্রিমিয়াম নির্ধারিত হয়ে আসছিল একক বা ফ্ল্যাট রেটে। বর্তমানে ব্যাংকগুলোকে ‘অ্যাসেসেবল ডিপোজিট’-এর প্রতি ১০০ রুপির বিপরীতে ১২ পয়সা হারে প্রিমিয়াম পরিশোধ করতে হয়। অর্থাৎ ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, সম্পদের গুণগত মান কিংবা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মান—কোনো কিছুর ভিত্তিতেই প্রিমিয়ামে পার্থক্য করা হতো না। প্রশাসনিক দিক থেকে এটি সহজ হলেও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় দক্ষ ও দুর্বল ব্যাংকের মধ্যে কোনো পার্থক্য সৃষ্টি করত না বলে মনে করছে আরবিআই।
নতুন কাঠামোর আওতায় ব্যাংকগুলোর আর্থিক ও তদারকি-সংক্রান্ত সূচকের ভিত্তিতে ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হবে। এর মধ্যে মূলধনের শক্তিমত্তা (Capital Strength), সম্পদের গুণগত মান (Asset Quality), আয়ক্ষমতা (Earnings), তারল্য পরিস্থিতি (Liquidity) এবং কোনো ব্যাংক ব্যর্থ হলে আমানত বিমা তহবিলে সম্ভাব্য ক্ষতির মাত্রা বিবেচনায় নেওয়া হবে। এসব সূচক মিলিয়ে ব্যাংকের ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণ করা হবে এবং সেই অনুযায়ী প্রিমিয়াম বাড়ানো বা কমানো হবে।
আরবিআই দুই ধরনের ঝুঁকি মূল্যায়ন মডেল প্রবর্তন করেছে।
| মডেল | প্রযোজ্য ব্যাংক | বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|
| টিয়ার ১ | তফসিলভুক্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক (আঞ্চলিক গ্রামীণ ব্যাংক ছাড়া) | উন্নত আর্থিক ও তদারকি সূচকের ভিত্তিতে মূল্যায়ন |
| টিয়ার ২ | আঞ্চলিক গ্রামীণ ব্যাংক ও সমবায় ব্যাংক | কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় পৃথক ঝুঁকি মূল্যায়ন |
প্রিমিয়াম সমন্বয়ের ক্ষেত্রে একটি ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। কার্ড রেটের (মূল নির্ধারিত হার) তুলনায় ঝুঁকিভিত্তিক প্রণোদনা সর্বোচ্চ ৩৩.৩৩ শতাংশ পর্যন্ত সীমিত থাকবে। অর্থাৎ কোনো ব্যাংকের ঝুঁকি কম হলে প্রিমিয়াম হ্রাস পাবে, আর ঝুঁকি বেশি হলে তা নির্ধারিত সীমার মধ্যে বাড়তে পারে।
এছাড়া “ভিন্টেজ ইনসেনটিভ” নামে একটি বিশেষ প্রণোদনাও রাখা হয়েছে। কোনো ব্যাংক দীর্ঘ সময় ধরে আমানত বিমা তহবিলে অবদান রাখলেও বড় ধরনের দাবি পরিশোধের প্রয়োজন না হলে তারা সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত ছাড় পেতে পারে। কার্যকর প্রিমিয়াম নির্ধারণে কার্ড রেটের ওপর ঝুঁকিভিত্তিক সমন্বয় ও ভিন্টেজ প্রণোদনা—উভয়ই বিবেচিত হবে।
তবে পেমেন্টস ব্যাংক ও লোকাল এরিয়া ব্যাংকগুলো আপাতত বিদ্যমান কার্ড রেটেই প্রিমিয়াম প্রদান করবে। পর্যাপ্ত তথ্যের ঘাটতির কারণে তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকিভিত্তিক কাঠামো এখনই প্রযোজ্য হচ্ছে না। একইভাবে, তদারকি বা সংশোধনমূলক ব্যবস্থার আওতায় থাকা নগর সমবায় ব্যাংকগুলো সংশ্লিষ্ট বিধিনিষেধ থেকে বেরিয়ে এলে নতুন কাঠামোর আওতায় আনা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকিভিত্তিক প্রিমিয়াম কাঠামো ব্যাংকগুলোর মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা বাড়াবে এবং শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় উৎসাহ জোগাবে। এর ফলে আমানতকারীদের সুরক্ষা আরও জোরদার হওয়ার পাশাপাশি আমানত বিমা তহবিলের স্থিতিশীলতাও বৃদ্ধি পাবে। দীর্ঘ ছয় দশকের পুরোনো কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে ভারতীয় ব্যাংকিং খাত এখন একটি অধিকতর পরিশীলিত ও দায়বদ্ধ ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে।
