ঝুঁকির শ্রেণীবিভাগ – পাঠটি “বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা” বিষয়ের “ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা” অধ্যায়ের একটি পাঠ। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ‘ঝুঁকি’—মাত্রা, প্রকৃতি, অবস্থা ইত্যাদির প্রেক্ষিতে বিভিন্ন রকম হতে পারে যা বিভিন্ন গ্রন্থকারগণ বিভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে তুলে ধরেছেন। বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও ধারা— প্রকরণ মোতাবেক নিম্নে একটি ছকের সাহায্যে ঝুঁকির শ্রেণী: বিন্যাস দেখানো হলে –

Table of Contents
ঝুঁকির শ্রেণীবিভাগ
ক. বিশুদ্ধ ও দূরকল্পনামূলক ঝুঁকি (Pure and Speculative Risk) :
যে ঝুঁকিতে কোন বীমাকৃত উপাদান বা বিষয়বস্তুর ক্ষতি তথা আর্থিক ক্ষতি সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা বিদ্যমান থাকে এবং শুধু প্রস্তাবান্তর্ভূক্ত দুর্ঘটনাটি ঘটলেই আর্থিক ক্ষতি সংঘটিত ও অনিবার্য হয় – সে ধরনের ঝুঁকিকেই বলা হয় বিশুদ্ধ ঝুঁকি। আর, যে ক্ষেত্রে কোন আর্থিক ক্ষতি তথা দুর্ঘটনা সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা নয় – বরং, কোন ঘটনা সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা বিদ্যমান থাকে এবং ঘটনাটি ঘটলে লাভ লোকসান যে কোনটাই হতে পারে – তেমন কোন অনিশ্চয়তাকে দূরকল্পনামূলক ঝুঁকি হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। এমন ধরনের অনিশ্চয়তাকে যদিও প্রকৃত অর্থে ঝুঁকি বলা যায় না। কেননা, এতে থাকে কেবল জুয়াপ্রবণ একটি কারবারী সাহসী কর্ম প্রয়াস মাত্র।
খ. মৌলিক ও বিশেষ ঝুঁকি (Fundamental & ParticularRisk) :
যেসব ঝুঁকি সাধারণতঃ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অথবা সামাজিক পরস্পর নির্ভরতা থেকে উদ্ভূত হয়ে থাকে, সেসব ঝুঁকিকেই বলা হয় মৌলিক ঝুঁকি। যদিও এ ধরনের ঝুঁকি অবিমিশ্র প্রাকৃতিক আকস্মিক ঘটনাসমূহ থেকেও উদ্ভূত হতে পারে। শিল্প ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বেকারত্ব, যুদ্ধ, মুদ্রাস্ফীতি, রাজনৈতিক ক্ষমতা বদল, খামখেয়ালীপনা, পরিবর্তিত রীতিনীতি, কুসংস্কার – এগুলো প্রায় সবই মৌলিক ঝুঁকির উৎস হিসেবে কাজ করে এবং এগুলো সামাজিক পরস্পর নির্ভরতা থেকেই উদ্ভূত হয়ে থাকে। ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, প্লাবন, ঝড়-ঝঞ্চা ইত্যাদি আবার প্রাকৃতিক আকস্মিক দুর্ঘটনাজনিত মৌলিক ঝুঁকির উৎস।
তাহলে দেখা যায় যে, মৌলিক ঝুঁকি সামাজিক ও প্রাকৃতিক – এ দু’ধরনের দুর্যোগ – দুর্ঘটনার জন্যেই সৃষ্ট হয়ে থাকে। মৌলিক ঝুঁকি সংক্রান্ত ক্ষতি সাধারণতঃ উৎস ও পরিণতিতে অব্যক্তিক। অর্থাৎ, এ ধরনের ক্ষতি কোন ব্যক্তি দ্বারা সংঘটিত হয় না এবং এর প্রভাব পড়ে একটি পুরো শ্রেণীর উপর।
যাই হোক, পাশাপাশি বিশেষ ঝুঁকি সাধারণতঃ ব্যক্তিক ঘটনা—দুর্ঘটনা থেকেই উদ্ভূত হয়ে থাকে এবং এর প্রভাব অনুভূত হয় একদেশীকৃত ফলাফলে [In located consequences)। মূলত: এগুলো কারণ ও ফলাফল – ক্ষেত্রেই ব্যক্তিক। ব্যাংক ডাকাতি, ঘর আগুনে পুড়ে যাওয়া, জাহাজ বিপদগ্রস্ত হও অথবা কোন উত্তাপক বা চুল্লির বিস্ফোরণ ইত্যাদি সংক্রান্ত আর্থিক ক্ষতির অনিশ্চয়তা বিশেষ ঝুঁকির অন্তর্ভুক্ত।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে – মৌলিক ঝুঁকি ও বিশেষ ঝুঁকি প্রকৃতিগতভাবে অনেকটা ভিন্নতর। অর্থাৎ, এ দুধরনের ঝুঁকির মধ্যে বেশ পার্থক্য রয়েছে যা উপরের আলোচনায় কিছুটা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু, এদের মধ্যকার সে পার্থক্য সব সময় সুনিদ্দিষ্ট থাকে না এবং কোন এক ধরনের ঝুঁকি অবস্থা ভেদে অন্য ধরনের ঝুঁকি হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। কেননা, জ্ঞান, প্রযুক্তি, সামাজিক অবস্থা ইত্যাদির পরিবর্তন হচ্ছে নিয়ত।
যেমন : এক সময় বেকারত্বকে বিশেষ ঝুঁকি হিসেবে গণ্য করা হতো। কেননা, তখন অনেকেই মনে করতেন যে, ব্যক্তিগত শৈথিল্য ও অদক্ষতার কারণে বেকারত্ব সৃষ্টি হয়। কিন্তু সে ধারণা পাল্টে গিয়েছে। এখন বেকারত্বকে একটি মৌলিক ঝুঁকি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। কারণ, আজ এটি প্রায় সর্বজন স্বীকৃত যে, অধিকাংশ বেকারত্ব সৃষ্টি হয় সামগ্রিক অর্থনৈতিক পদ্ধতির ত্রুটিপূর্ণ প্রয়োগ ও কর্মধারার ফলে। তাই, বেকারত্বের দায়-দায়িত্ব এখন ব্যক্তিক পর্যায় থেকে সামাজিক পর্যায়ে নিয়ে বিবেচিত হচ্ছে।
আবার, একই ধরনের পরিবর্তন সাধিত হয়েছে শিল্পীয় দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে। এক সময়, কোন শ্রমিক দুর্ঘটনার শিকার হলে তাকে মনে করা হতো উক্ত শ্রমিক অথবা নিয়োগকারীর ত্রুটি হিসেবে। কিন্তু, বর্তমানে কলকারখানায় শ্রমিকের উপর সৃষ্ট দুর্ঘটনাকে শিল্পীয় পদ্ধতির ত্রুটি হিসেবে সমধিকভাবে গণ্য করা হচ্ছে। ফলতঃ এখন শিল্পীয় দুর্ঘটনার ক্ষতিকে মৌলিক ঝুঁকির আওতাভুক্ত করা হচ্ছে।
গ. বীমাযোগ্য ও বীমা অযোগ্য ঝুঁকি (Insurable and Un- Insurable Risk) :
যেসব ঝুঁকির বিরুদ্ধে বীমা করা যায় তাকে বীমাযোগ্য ঝুঁকি এবং যেসব ঝুঁকির বিরুদ্ধে বীমা করা যায় না বা হয় না তাকে বীমা অযোগ্য ঝুঁকি বলা হয়। যেমনঃ একটি অল্প মূল্যের কলম হারিয়ে যাওয়ার মত নগণ্য ক্ষতি অথবা ক্যান্সারে আক্রান্ত শেষ পর্যায়ের একজন রোগীর জীবনে বিদ্যমান প্রায় নিশ্চিত ঝুঁকি বীমাযোগ্য নয়। পক্ষান্তরে, স্বাভাবিক কোন ক্ষতি বীমাযোগ্য (এ সম্পর্কে পরবর্তীতে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে)।
বীমাযোগ্য ঝুঁকিকে আবার তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা : –
(1) উত্তম আদর্শিক ঝুঁকি (Super-standard Risk )
(II) আদর্শিক ঝুঁকি (Standard Risk) এবং
(III) উপ— আদর্শিক ঝুঁকি (Sub-standard Risk)।
[প্রসঙ্গতঃ বলা প্রয়োজন যে – ঝুঁকি নিরূপণের জন্যে মূলতঃ দু’টি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। যথা : (ক) বিচার পদ্ধতি এবং (খ) আংকিক মূল্যায়ন পদ্ধতি। দ্বিতীয় পদ্ধতিটিতে ঝুঁকি নিরূপণের জন্যে একটি গাণিতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় এবং এ পদ্ধতির প্রেক্ষিতেই ঝুঁকির আর একটি স্তর ও শ্রেণী বিন্যাস দেখানো হয়। এ পদ্ধতিতে সাধারণ মাত্রার ঝুঁকি চিহ্নিতকরণে ১০০ নম্বরে আদর্শিক ঝুঁকির মধ্যবিন্দুটি স্থাপন করা হয়।
অতঃপর একটি বিবরণীতে যেসব বিষয় ও উপসর্গ ঝুঁকি বৃদ্ধি করে (শারিরীক অসামঞ্জস্যপূর্ণ গঠন, অস্বাস্থ্যকর এলাকায় আবাস ইত্যাদি) সেগুলিকে একটি কলামে (বামে) এবং যেসব বিষয় ও উপসর্গ ঝুঁকি হ্রাস করে, সেগুলিকে অন্য কলামে (ডানে) সন্নিবিষ্ট করে দেখানো হয়। এতে দু’কলামের সমীকরণে ফলাফল যদি ঝুঁকি হ্রাস করে ৭৫ নম্বরের নীচে নিয়ে আসে, তাহলে তা হবে উত্তম আদর্শিক ঝুঁকি, ফলাফল যদি ঝুঁকির মাত্রাকে ৭৫ থেকে ১২৫ নম্বরের মধ্যে রাখে তাহলে তা আদর্শিক ঝুঁকি, ১২৫ থেকে ৫০০ নম্বরের মধ্যে ঝুঁকি থাকলে তা উপ— আদর্শিক ঝুঁকি এবং তদুর্দ্ধ ঝুঁকি বীমা অযোগ্য ঝুঁকি হিসেবে পরিগণিত হয়। উল্লেখ্য যে ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রসঙ্গে পরবর্তীতে কিছুটা বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে।]
এসব ঝুঁকি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত শ্রেণী বিন্যাস এক নজরে নিম্নরূপ :-
(i) আদর্শিক ঝুঁকি (Standard Risk) : ঝুঁকি মূল্যায়নের আংকিক পদ্ধতি অনুসারে আদর্শিক মান (Standard Number) ১০০ এবং তার পূর্বাপর ২৫ নম্বরের ব্যাপ্তি সীমা অর্থাৎ, ৭৫ থেকে ১২৫ নম্বর হচ্ছে আদর্শিক ঝুঁকির প্রসার। এটি সাধারণ বা স্বাভাবিক মাত্রার ঝুঁকি।
(ii) উত্তম আদর্শিক ঝুঁকি (Super Standard Risk) : ৭৫ নম্বরের নীচের মাত্রার ঝুঁকিকে উত্তম আদর্শিক ঝুঁকি বলা হয়। বীমাকারীর জন্যে এটি হচ্ছে সর্বাধিক প্রত্যাশিত ঝুঁকি। কেননা, এখানে ঝুঁকি সর্বনিম্ন।
(iii) উপ আদর্শিক ঝুঁকি (Sub-standard Risk) : ১২৫ থেকে ৫০০ নম্বর – এর সীমায় নিদ্ধারিত ঝুঁকিকে উপ-আদর্শিক ঝুঁকি হিসেবে বিন্যস্ত করা হয়েছে। বিপদ সঙ্কুল পেশায় নিয়োজিত ও জীবিকায় অভ্যস্ত এবং মৃত্যু প্রবণ বয়ঃক্রমের মানুষের জীবন এ জাতীয় ঝুঁকির কোঠায় শ্রেণী বিন্যস্ত হয়ে থাকে।
[ প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য যে, Denenberg ও তাঁর সহগ্রন্থকারগণ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা-সমূহ (Economic Uncertaintles) এবং ঝুঁকির প্রকরণসমূহ (Classifications of risk) একাধারে তুলে ধরেছেন। দৃষ্টিভঙ্গী হলো এই যে, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি (আর্থিক ক্ষতির অনিশ্চয়তা। (Uncertainty of financial. loss) তো পরস্পর অবিচ্ছেদ্য এবং একই বিষয়ের এপিঠ-ওপিঠ।
তারা যে শ্রেণী বিন্যাস দেখিয়েছেন তার মধ্যে উপরোক্তগুলি ছাড়াও দ্বৈতিক (Static) ও গতিশীল ( Dynamic) অবস্থা ও বিষয়বস্তু ভিত্তিক অনিশ্চয়তা এবং হিসাবযোগ্য বা পরিমাপযোগ্য (Calculable or measurable) ও হিসাব বা পরিমাপ অযোগ্য (Incalculable or Non-measurable) অনিশ্চয়তার বিষয়ে সমধিক গুরুত্ব সহকারে বিবৃত করেছেন— এমনকি, জুয়া-অনিশ্চয়তা (Wagering Uncertainty)-র উল্লেখ করেছেন।
তাই, সে সম্পর্কেও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা প্রদান করা হলো। তাদের মতে কোন স্থায়ী ও স্থিতিশীল সম্পত্তি বাস্তবভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে অথবা প্রতারণা, চুরি ইত্যাদি অসৎ কর্মের ফলে ঐরূপ সম্পত্তি হস্তান্তরিত হলে বা বেহাত হলে স্থৈতিক অনিশ্চয়তাজনিত ক্ষতি তথা ঝুঁকির সৃষ্টি হয়; পক্ষান্তরে, যখন কোন প্রবহমান বা গতিশীল অর্থনৈতিক কর্মপ্রক্রিয়ার ফলে পণ্যদ্রব্যদি বা সেবার মূল্য হ্রাসপ্রাপ্ত হয়, তখন পরিবর্তনীয় বা গতিশীল অবস্থাজনিত আর্থিক ক্ষতি তথা ঝুঁকির উদ্ভব হয় (যদিও এ ব্যাপারে অনেক বিস্তৃত ব্যাখ্যার অবকাশ থেকে যায়)। আর, পরিমাপযোগ্য ও পরিমাপ অযোগ্য অনিশ্চয়তা বিষয়টি নামেই কিছুটা ব্যাখ্যাত। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, Frank H Knight) পরিমাপযোগ্য অনিশ্চয়তাকেই শুধু ঝুঁকি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন— পরিমাপ অযোগ্য (Non-measurable) অনিশ্চয়তাকে ঝুঁকি হিসেবে স্বীকার করেননি।
তবে, উক্ত গ্রন্থকারগণ তাঁর সাথে একমত হতে পারেননি। তাঁদের মতে “Measurement is a matter of relativity. with some phenomena being more measurable and others being less measurable Few singificant economic uncertainties may be considered to be either absolutely measurable or absolutely rion measurable (পরিমাপন হচ্ছে একটি আপেক্ষিকতার বিষয়, যেখানে কোন কোন ব্যাপার হতে পারে অধিক পরিমাপযোগ্য, আবার কোন কোনটি হতে পারে কম পরিমাপনযোগ্য।
এমন কিছু গুরুপূর্ণ অর্থনেতিক অনিশ্চয়তা আছে যা হতে পারে সম্পূর্ণ পরিমাপযোগ্য অথবা সম্পূর্ণ পরিমাপ অযোগ্য)। সুতরাং, সব পরিমাপ অযোগ্য অনিশ্চয়তাই ঝুঁকির আওতা থেকে পরিহার্য নয়। তবে, বাজী অনিশ্চয়তা (Wagering Uncertainties) কে শ্রেণী হিসেবে দেখানে হলেও তা সংগত কারণেই ঝুঁকি হিসেবে গণ্য হয় না। এছাড়া, আর্থিক ক্ষতি সংক্রান্ত নয়—এমন ধরনের ক্ষতির অনিশ্চয়তাকেও ঝুঁকি বলা যায় না।] ঝুঁকির শ্রেণী:

বিন্যাস প্রশ্নে অন্যান্য অনেক বিষয়ের মতই এখন তিন্নিমতের পচুর অবকাশ রয়ে গিয়েছে এবং ঝুঁকির শ্রেণী বিন্যাস করার ক্ষেত্রে ঝুঁকির বৈশিষ্ট্য, প্রকৃতি ইত্যাদি অবশ্যই বিচার্য। তাই, যে সব প্রকরণ সম্পর্কে তেমন ভিন্নমত পরিদৃষ্ট, সেগুলিকেই মূলতঃ ছক-বিন্যস্ত করে দেখানো হলো।
