আজকের আলোচনার বিষয় “এক্সপোর্ট ক্রেডিট ইন্স্যুরেন্স যে সব ঝুঁকি বহন বা পূরণ করে থাকে ” যা সামাজিক ও অন্যান্য ধরনের বীমাসমূহ অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।
এক্সপোর্ট ক্রেডিট ইন্স্যুরেন্স যে সব ঝুঁকি বহন বা পূরণ করে থাকে

প্রথমেই উল্লেখ করা প্রয়োজন যে—এক্সপোর্ট ক্রেডিট ইন্স্যুরেন্স বা রপ্তানী ধার বীমা ব্যবসায়ে মুলতঃ দুধরনের প্রতিষ্ঠান নিয়োজিত থাকে; যথা :- সরকারী ও বেসরকারী বীমা প্রতিষ্ঠান। সরকারী মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণাধীনে পরিচালিত বীমা প্রতিষ্ঠান স্বভাবতঃই বেসরকারী বীমা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অধিকতর ঝুঁকি বহন করতে পারে বা করে থাকে। ঝুঁকিরও আবার প্রকারভেদ রয়েছে। যথা : (১) বাণিজ্যিক ঝুঁকি (Commercial Risk), (২) অস্বীকৃতি বা পরিহরণ অথবা বর্জন ঝুঁকি (Repudiation Risk) এবং (৩) রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি | Political and Economic Risk) ইত্যাদি।
উক্ত সকল ধরনের ঝুঁকিই সরকারী নিয়ন্ত্রণে রপ্তানী ধার বীমার ক্ষেত্রে পরিচালিত বীমা প্রতিষ্ঠান সমূহই সাধারণতঃ বহন করে থাকে। কিন্তু, এ বিষয়ে পরিচালিত বেসরকারী বীমা প্রতিষ্ঠানসমূহ উক্ত সকল ধরনের ঝুঁকি সচরাচর বহন করে না।
বেসরকারী মালিকানায় রপ্তানী ধার বীমার ক্ষেত্রে পরিচালিত বীমা প্রতিষ্ঠানসমূহ সাধারনতঃ বাণিজ্যিক ঝুঁকিই বহন করে থাকে; আমদানীকারক বা ক্রেতা কর্তৃক পণ্য গ্রহণে অস্বীকৃতিজনিত ঝুঁকি (The Repudiation Risk) যা আপত্তি বা বিতর্কমূলক পরিস্থিতির উদ্ভব করে এমন ঝুকিও যেমন গ্রহণ করে না, তেমনি কোন রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ঝুঁকি (Political or Economic Risk). যা সুবিপুল পরিমাণের হতে পারে—তেমন ঝুঁকিও বহন করে না। বেসরকারী রপ্তানী ধার বীমা প্রতিষ্ঠানসমূহ যেসব বাণিজ্যিক ঝুঁকি বহন বা ক্ষতি পূরণ করতে নিশ্চয়তা দিয়ে থাকে তা হচ্ছে সংক্ষেপে :
(ক) ক্রেতার বা আমদানীকারকের দেউলিয়াত্ব বা অন্যবিধ কারণে রপ্তানীকৃত পণ্য মূল্য পরিশোধে অক্ষমতাজনিত ঝুঁকি ও
(খ) রপ্তানীকৃত পণ্য সামগ্রীর মূল্য—যে ক্ষেত্রে ক্রেতা বা আমদানীকারক মূল্য পরিশোধের ওয়াদাকৃত সময়ের পরেও ৯০ দিনের মধ্যে পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়। এ ধরনের ঝুঁকিকে বলা হয় বিলম্বিত ব্যর্থতা (Protracted default) ঝুঁকি।
উল্লেখ্য যে–দেউলিয়ার সংজ্ঞা নির্দেশ করা অনেক সময় বিতর্কমূলক হয় অনেক 1 দেশে এতদসম্পর্কিত মোকদ্দমার ফয়সালা অত্যন্ত দীর্ঘ সময় সাপেক্ষ এবং তা অত্যধিক ব্যয় সাপেক্ষও ঘটে—এসব কারণে উক্ত বিলম্বিত সময় পর্যন্ত রপ্তানীকারক অপেক্ষা করেও সমস্যা এড়িয়ে মূল্য প্রাপ্তির চেষ্টা করে থাকেন। এ ধরনের বিলম্বের পরেও মূল্য পাওয়া না গেলে তজনিত ঝুঁকি লাঘবের জন্যে বীমা প্রতিষ্ঠানসমূহের সাথে রপ্তানীকারক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে থাকেন।
প্রসঙ্গত : আরও উল্লেখ্য যে-বেসরকারী বীমাকারী সাধারণতঃ যতটা পণ্য বিক্রয়কৃত ও হস্তান্তরিত হয়েছে, কেবল তারই ঝুঁকি বহন করতে স্বীকৃত হন।
সরকারী মালিকানায় পরিচালিত রপ্তানী ধার বীমা ব্যবস্থায় যেসব ঝুঁকি বহনের নিশ্চয়তা থাকে, তা সংক্ষেপে নিম্নে বর্ণিত হলো :
১। ধারে রপ্তানীকৃত পণ্য সামগ্রীর যাবতীয় বাণিজ্যিক ঝুঁকি।
২। রপ্তানীকৃত পণ্য-সামগ্রী ক্রেতা কর্তৃক গ্রহণে অস্বীকৃতি আপনজনিত ঝুঁকি বা বর্জন ঝুঁকি (Repudiation Risk)। এ জাতীয় ঝুঁকি বেসরকারী বীমা প্রতিষ্ঠানসমূহ বহন করতে রাজী হয় না। কেননা, ক্রেতা আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও পণ্য গ্রহণে অস্বীকার করে কতকগুলো বিশেষ পরিস্থিতিতে যেমন : প্রেরিত পণ্য যদি সময়মত না পাঠানো হয় বা পৌঁছে সে ক্ষেত্রে ক্রেতার পণ্য গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন এবং এরূপ বিতর্কমূলক ক্ষেত্রে সরকারী বীমা প্রতিষ্ঠানই সীমিত পরিমাণ ঝুঁকি বহন বা পুরণ করতে নিশ্চয়তা দিয়ে থাকে।
৩। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি : রপ্তানী ধার বীমায় নিম্নে বর্ণিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকিসমূহ বহন তথা পূরণ করতে নিশ্চয়তা দেয়া হয় :
(ক) রপ্তানী লাইসেন্স-এর বাতিল বা অপনয়ন ও রপ্তানী পণ্যের উপর বিধি নিষেধ আরোপ সংক্রান্ত ঝুঁকি।
(খ) ক্রেতার দেশে অকস্মাৎ কোন বৈধ আমদানীর অনুমতি বাতিল অথবা বিক্রয়ের চুক্তি গঠনের অব্যবহিত পরেই আইন বা অফিসিয়াল নিয়ম-কানুন পরিবর্তনের কারণে পণ্যের অদানী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি।
(গ) ক্রেতার দেশে রপ্তানীকৃত পণ্যের মূল্য পরিশোধের জন্যে কোন কারণে অর্থ প্রেরণ বা তহবিল স্থানান্তর বন্ধ, নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ার ঝুঁকি ; যেমনঃ ক্রেতার দেশে ব্যবসায়ের অর্থ পরিশোধের ভারসাম্যজনিত কারণে অর্থ প্রেরণ নিষিদ্ধ হয়ে পড়লে, তাকে এরূপ ঝুঁকির আওতার গণ্য করা হয়।
(ঘ) রপ্তানীকারক ও আমদানীকারকের দেশের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার ঝুঁকি।
(ঙ) ক্রেতার দেশে যুদ্ধ, শত্রুতা, গৃহযুদ্ধ, বিদ্রোহ, বিপ্লব ইত্যাদি সংক্রান্ত ঝুঁকি।
(চ) রপ্তানীকারক ও আমদানীকারকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এমন অন্য যে কোন বাহ্যিক কারণ সংক্রান্ত ঝুঁকি।
এছাড়া, ক্রেতা যদি কোন বিদেশী সরকার হয় অথবা বিক্রয় চুক্তির কার্যকারিতা প্রশ্নে ক্রেতার দেশের সরকার কোন প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে থাকলে, সেক্ষেত্রেও সরকারী রপ্তানী ধার বীমা প্রতিষ্ঠান ঝুঁকি বহন করে থাকে এবং ক্ষতিপূরণও করে থাকে যদি রপ্তানীকারক চুক্তির শর্ত ভঙ্গ না করে অথবা রপ্তানীকারকের নিয়ন্ত্রণাধীন কোন কর্তব্য পালনে অবহেলা না থাকে।

সরকারী বীমা প্রতিষ্ঠান যেসব ক্ষেত্রে ঝুঁকি বহন করে না তা সংক্ষেপে নিম্নে বর্ণিত হলো:
(ক) অন্য কোন সরকারী বিভাগ বা বাণিজ্যিক বীমাকারী কর্তৃক যে ক্ষতি বীমাকৃত হয়ে থাকে বা হতে পারে ;
(খ) যে কোন বীমা চুক্তি সংক্রান্ত বিষয় থেকে উদ্ভূত কোন ক্ষতি ;
(গ) বিক্রয় চুক্তি সম্পাদনকালীন আমদানীকারকের কোন প্রাধিকার (Authority) থাকা; প্রয়োজন— সেরূপ প্রাধিকার লাভে আমদানীকারকের ব্যর্থতা বা অক্ষমতা থেকে উদ্ভূত কোন ক্ষতি;
(ঘ) রপ্তানীকারকের কোন প্রতিনিধি বা রপ্তানীকারকের ব্যাংকের দেউলিয়াত্ব অথবা রপ্তানীকারকের প্রতিনিধি বা ব্যাংকের কোন ত্রুটির জন্যে সৃষ্ট কোন ক্ষতি।
মোট কথা, উপরোক্ত ঝুঁকি বা ক্ষতিসমূহের জন্যে সরকারী রপ্তানী ধার বীমা ব্যবস্থায় ক্ষতিপূরণ দানের কোন নিশ্চয়তা প্রদান করা হয় না।]
রপ্তানী ধার বীমার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যে (United kingdom) মূলতঃ দু’টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যথা : (১) সরকারী মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণাধীনে Export Credit Guarantee Department (3) Trade Indemnity Company Limited নামে একটি পাবলিক কোম্পানী। উপরের আলোচনায় মূলতঃ উক্ত প্রতিষ্ঠান দু’টি কর্তৃক অনুসৃত নীতি ও পদ্ধতিকে আদর্শ হিসেবে ধরে নেয়া হয়েছে।
