আজকের আলোচনার বিষয় “এক্সপোর্ট ক্রেডিট ইন্স্যুরেন্স বা রপ্তানী ধার বীমা ” যা সামাজিক ও অন্যান্য ধরনের বীমাসমূহ অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।
এক্সপোর্ট ক্রেডিট ইন্স্যুরেন্স বা রপ্তানী ধার বীমা

প্রারম্ভেই উল্লেখ্য যে—এক্সপোর্ট ক্রেডিট ইনস্যুরেন্স বা রপ্তানী ধার বীমা মূলতঃ একের মধ্যে দুই ( Two in one) বা দু’য়ে এক অথবা দুয়ে মিলে এক। অর্থাৎ, রপ্তানী বীমা (Export Insurance) ও ধার বীমা (Credit Insurance) মিলিত হয়ে রপ্তানী ধার বীমা ( Export Credit Insurance) হয়েছে। আবার, যদি বলা হয় যে—রপ্তানী বীমার মধ্যেই অথবা রপ্তানী বীমার প্রকার বিশেষই হলো রপ্তানী ধার বীমা—তাও যেমন বলা যায়; তেমনই যদি বলা হয় যে—ধার বীমার প্রকার বিশেষই রপ্তানী ধার- বীমা, তাও অযৌক্তিক নয়।
কেননা, ‘ধার বীমা’ শিরোনামে রপ্তানী ধার বীমা যেমন অন্তর্ভুক্ত, বর্ণিত ও বিশ্লেষিত হয়ে থাকে : আবার, তেমনই ‘রপ্তানী বীমা’ অধ্যায়ে বা মূল শিরোনামে রপ্তানী ধার- বীমা সম্পর্কে সবিস্তারে বর্ণনা ও আলোচনা করা হয়ে থাকে—যেহেতু তা রপ্তানী বীমারই অর্ন্তগত। সুতরাং, রপ্তানী ধার- বীমার সংজ্ঞাও দু’য়ের সমন্বয় বিধান সাপেক্ষে প্রদেয়।
রপ্তানী বীমা বলতে—রপ্তানী ব্যবসা সংক্রান্ত সম্ভাব্য যে কোন অসুবিধা, অনিশ্চয়তা ও সমস্যা তথা ঝুঁকি লাঘব বা দুরীকরণ অথবা মোকাবেলার জন্যে বীমা ব্যবস্থাকে রপ্তানী বীমা বলা হয়। পক্ষান্তরে, আধুনিককালে কারবার তথা ব্যবসা- বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সম্পাদিত ধারে লেনদেনের বেলায় সম্ভাব্য যে অনিশ্চয়তা বা সমস্যা তথা ঝুঁকি লাঘব বা দুরীকরণের উদ্দেশ্যে যে বীমা ব্যবস্থা উদ্ভব হয়েছে, তাই ধার বীমা [ Credit Insurance) নামে অভিহিত। তাহলে, স্বভাবতঃই ধারে পণ্য সামগ্রী রপ্তানী করা হলে তার বিনিময় মূল্য পাওয়ার ক্ষেত্রে রপ্তানীকারকের যে অনিশ্চয়তা তথা ঝুঁকি বিদ্যমান থাকে তা দুরীকরণ বা লাঘবকরণের উদ্দেশ্যে যে বীমা ব্যবস্থা তাকেই রপ্তানী ধার -বীমা বলা যায়।
যেহেতু, অন্যান্য বীমা প্রতিষ্ঠান রপ্তানী ধার সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি বহন করে না বা ধারে রপ্তানীকৃত পণ্য সত্তারের সম্ভাব্য ক্ষতি সংক্রান্ত দায় গ্রহণ করে না- তাই এ জাতীয় বীমা ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটে এবং তা মূলতঃ ও প্রায়শঃ সরকারী উদ্যোগে ও পৃষ্ঠপোষকতায় হয়ে থাকে। কেননা, দেশের রপ্তানী বৃদ্ধি হলে যেমন ব্যবসায়ীদের উন্নতি হয় তেমনই দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির অগ্রগতিও সাধিত হয়।
১৯৬২ সালের মার্চ মাসে তৎকালীন পাকিস্তানে রপ্তানী ধার- বীমা নামে একটি স্কীম নেয়া হয়েছিল যা শতকরা ৭৫ ভাগ বাণিজ্যিক ও শতকরা ৮৫ ভাগ রাজনৈতিক ঝুঁকি বহন করত এবং অবশিষ্ট ঝুঁকি নিয়ে রপ্তানী ধার- বীমার গোড়াপত্তন ঘটে। তারপর, ক্রমাগত তা ফ্রান্স, কানাডা, সুইডেন, জার্মান, জাপান, নরওয়ে ইত্যাদি দেশগুলিতে বিস্তার লাভ করতে থাকে।
প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর সময়ে দ্রব্য সামগ্রীর দুষ্প্রাপ্যতার সুযোগে বিক্রেতা প্রভাবিত বাজার সৃষ্টি হয়ে যায় এবং রপ্তানীর ক্ষেত্রেও উত্তরোত্তর প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। আর, এ প্রতিযোগিতার ফলেই রপ্তানীর ক্ষেত্রেও ধারে লেনদেন শুরু হয়ে যায়। ধারে লেনদেন সম্পাদনে স্বভাবতঃই বেশ কিছু অনিয়মিতা ও অনিশ্চয়তা দেখা দেয় যা রপ্তানীকারকদের বেশ বিপর্যয়ের মধ্যে নিপতিত করে। অর্থাৎ, বন্যা, ঝড়- ঝঞ্চা ইত্যাদি সাধারণ সমস্যা ছাড়াও বাড়তি বেশ কিছু বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি দেখা দিতে থাকে।যেমন :(১) ক্রেতা বা আমদানীকারকের কোন বিদেশী মুদ্রার সংকট, (২) রাজনৈতিক বিক্ষোভ, শঙ্গামা, যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ ইত্যাদি রাজনৈতিক ঝুঁকি।

এসব কারণে রপ্তানী ধার- বীমার উদ্ভব হয় এবং ক্রমাগত তা জনপ্রিয়তা লাভ করতে থাকে। সে সময়ে যুক্তরাজ্যে রপ্তানী ধার -বীমা মূলতঃ দু’টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে।যথা :(১) সাধারণতঃ যুক্তরাজ্যে উৎপাদিত পণ্য সামগ্রী রপ্তানীর ক্ষেত্রে সমগ্র বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকির দায় গ্রহণের জন্যে সরকারের নিয়ন্ত্রণে রপ্তানী ধার জামিন বিভাগ (Export Credit Guarantee Department) এবং (২) কেবলমাত্র বাণিজ্যিক ঝুঁকির দায় গ্রহণের জন্যে ব্যবসা ক্ষতিপূরণ কোং লিঃ (Trade Indemnity Company Limited) নামে একটি যৌথ মূলধনী কোম্পাণী রপ্তানী ধার- বীমা ব্যবসায়ে নিয়োজিত থাকে।
