জীবনবিমা দাবিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি

বাংলাদেশের জীবনবিমা খাতে ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে দাবি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। তবে বিপুল অঙ্কের বকেয়া দাবি এবং বিপুল সংখ্যক পলিসিধারীর অপেক্ষা এখনও খাতটির কাঠামোগত দুর্বলতা ও আস্থার সংকটকে পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে দেয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের অনিরীক্ষিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়কালে জীবনবিমা খাতে মোট দাবি দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে কোম্পানিগুলো ৮ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। ফলে অনিষ্পন্ন দাবির পরিমাণ এখনও ৪ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা। এই সময়ে দাবি নিষ্পত্তির হার বেড়ে ৬৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা আগের প্রান্তিকে ছিল মাত্র ৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক প্রান্তিকে প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি অগ্রগতি হলেও পুরো চিত্রে ঘাটতি রয়ে গেছে।

জীবনবিমা দাবি নিষ্পত্তির সারসংক্ষেপ (২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিক)

সূচকপরিমাণ
মোট দাবি১৩,১৫৮ কোটি টাকা
নিষ্পত্তিকৃত দাবি৮,৭৫৫ কোটি টাকা
অনিষ্পন্ন দাবি৪,৪০৩ কোটি টাকা
নিষ্পত্তির হার৬৭ শতাংশ

পলিসির সংখ্যার দিক থেকেও অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে। মোট ২৮ লাখ ৪৩ হাজার মেয়াদোত্তীর্ণ পলিসির মধ্যে ১৬ লাখ ৫৮ হাজার পলিসির দাবি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। তবে এখনো প্রায় ১১ লাখ ৮৫ হাজার পলিসিধারী তাদের প্রাপ্য অর্থ পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন, যা গ্রাহক আস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, বছরের শেষ প্রান্তিকে সাধারণত ব্যবসার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, যার ফলে কোম্পানিগুলোর নগদ প্রবাহ তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হয়। এই অতিরিক্ত তারল্য দাবি নিষ্পত্তিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি বৃদ্ধি এবং লাইসেন্স নবায়নের শর্ত কঠোর হওয়ায় অনেক কোম্পানি দ্রুত দাবি পরিশোধে বাধ্য হয়েছে।

বিমা বিশেষজ্ঞ এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির পরামর্শক এস এম জিয়াউল হক বলেন, সাধারণত বছরের শেষ প্রান্তিকে মোট ব্যবসার প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়, যেখানে অন্যান্য প্রান্তিকে তা ২০ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকে। এ কারণে ওই সময়ে কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং তারা তুলনামূলকভাবে বেশি দাবি নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয়।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, এখনো প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জীবনবিমা কোম্পানি দাবি পরিশোধে ধীরগতি বা অনীহা প্রদর্শন করছে, যা পুরো খাতের সুনাম ও আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে কিছু প্রতিষ্ঠান দ্রুত ও সময়মতো দাবি পরিশোধ করে ইতিবাচক উদাহরণ তৈরি করেছে।

প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি প্রায় সম্পূর্ণ বা অত্যন্ত উচ্চ হারে দাবি নিষ্পত্তি করেছে। একটি আন্তর্জাতিক জীবনবিমা কোম্পানি ৯৮ শতাংশেরও বেশি দাবি পরিশোধ করেছে। একইভাবে প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স এবং গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশের মধ্যে দাবি নিষ্পত্তি করেছে। এসব প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ও উন্নত আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে মাত্র তিন থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধ করতে সক্ষম হচ্ছে।

অন্যদিকে দুর্বল পারফরম্যান্সকারী কোম্পানিগুলোর ওপর বিশেষ নিরীক্ষা, গ্রেডিং ব্যবস্থা এবং কঠোর তদারকি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি অনিয়মিত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নতুন আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।

সব মিলিয়ে, দাবি নিষ্পত্তির হার বৃদ্ধি পেলেও দীর্ঘদিনের বকেয়া, কিছু প্রতিষ্ঠানের ধীরগতি এবং কাঠামোগত দুর্বলতা জীবনবিমা খাতে পূর্ণ আস্থা পুনরুদ্ধারের পথে এখনো বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।

Leave a Comment