আজকের আলোচনার বিষয় “নৌ-বীমার দাবী পরিশোধ” যা নৌ বা সামুদ্রিক বীমা অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।সম্পত্তি বীমা সাধারণতঃ ক্ষতিপুরণের চুক্তি তথা বীমা ব্যবস্থা। অর্থাৎ, বীমাকৃত যা চুক্তিতে উল্লেখিত বিপদ-বিপত্তি সংঘটনে ক্ষতি হলেই বীমাকারী বা বীমা কোম্পানী বীমাগ্রহীতাকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করে। কিন্তু, ক্ষতি না হলে ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন আসে না। তাইতো, এ ধরনের বীমাচুক্তিকে ক্ষতিপুরণের চুক্তি বলা হয়। উল্লেখ্য যে ক্ষতি হলেই তা সবক্ষেত্রে পুরণ করা হয় না, যদি উক্ত ক্ষতির কারণের বা বিপদের বিরুদ্ধে বীমাগ্রহণ করা না হয়।
Table of Contents
নৌ-বীমার দাবী পরিশোধ

নৌ-বীমাও যেহেতু সম্পত্তি বীমা, সেহেতু এক্ষেত্রেও উপরোক্ত কথাগুলি একইভাবে প্রযোজ্য। প্রসঙ্গত আরও উল্লেখ্য যে, ক্ষতি মাত্রা ও পরিমাণে গুলতঃ দুধরনের হতে পারে। যথা : (১) সামগ্রিক ক্ষতি Total Loss) ও (২) আংশিক ক্ষতি (Partial Loss or Average) । [ আবার, এ দুটোরও উপ-বিভাগ রয়েছে। যেমন : সামগ্রিক ক্ষতি দুধরনের হতে পারে- (ক) প্রকৃত সামগ্রিক ক্ষতি [Actual Total Loss) ও (খ) উদ্ধারযোগ্য সামগ্রিক ক্ষতি । Constructive Total Loss)।
আবার, আংশিক ক্ষতি প্রধানতঃ দুধরনের হতে পারে – (১) বিশেষ আংশিক ক্ষতি (Particular Average) (২) সাধারণ আংশিক ক্ষতি (General Average) । বিভিন্ন ধরনের সম্ভাব্য ক্ষতি সংঘটিত হলে তা পূরণের বা আদায়ের পন্থাসমূহের মধ্যে যেমন বেশ কিছু সাদৃশ্য স্বাভাবিক কারণেই বিদ্যমান, তেমনি বেশ কিছু পার্থক্যও বিদ্যমান থাকে।যাই হোক, সাধারণভাবে যে সব আনুষ্ঠানিকতা পালন ও পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, সে সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু বর্ণনা নিম্নে প্রদান করা হলো :
১। বীমাপত্র সংক্রান্ত প্রমাণাদি উপস্থাপন ( To submit relavant evidence regarding the polley ) :
বীমাদানী উপস্থাপনের আগেই বীমাগ্রহীতাকে তার বীমাপত্রের সপক্ষে প্রমাণাদি হাজির করতে হয়। কেননা, ক্ষতি ও খরচ সমন্বয়ে নীমাদাবী কত হবে তা নির্ধারণের জন্যেই বীমার বিষয়বস্তুর মূল্য প্রকৃতি, শর্তাবলী, বীমাযোগ্য স্বার্থ ইত্যাদি বিষয়ে বীমাকারীকে বিবেচনা করতে হয়। এতদুদ্দেশ্যেই কয়েকটি প্রয়োজনীয় দলিলপত্র পেশ করা দরকার হয়।
২। দাবীর বিজ্ঞপ্তি (Notice of Claim ) :
বীমাগ্রহীতা কর্তৃক বীমাপার উপস্থাপন করার জন্যেই রীমাকারীকে ক্ষতির ব্যাপারে বিজ্ঞপ্তি প্রদান এবং তদনুযায়ী কর্মপন্থা গ্রহণ করলেই বীমাকারী ক্ষতির দায় স্বীকার করে নিয়েছেন বলে মনেকরা যায় না। কেননা, এজনো ক্ষতি সংক্রান্ত তথ্য প্রমাণাদি উপস্থাপন এবং বীমাকারীর প্রতিনিধি কর্তৃক জরীপের প্রতিবেদন প্রস্তুতকরণ সাপেক্ষে তাতে স্বাক্ষরকরণ ইত্যাদি কার্য সম্পাদন অপরিহার্য।
এসব কার্য সম্পাদনের সাথে সাথে বীমাগ্রহীতাকে ক্ষতিগ্রস্ত দ্রব্যসামগ্রী | বুঝে নিতে হয়। অন্যথায়, বীমাকারীর দায়ের বোঝা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে এবং যার দায় বীমাকারী গ্রহণে বাধ্য নন। চুরির মত দুর্ঘটনার বেলায় বীমাগ্রহীতাকে বীমাকারীর কাছে ঝুঁকি শেষ হওয়ার দিন থেকে পরবর্তী ১০ দিনের মধ্যেই বিজ্ঞপ্তি প্রদান করতে হয়। বীমাদানীর ক্ষেত্রে বিজ্ঞপ্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
৩। বীমাদাবীর জন্যে প্রয়োজনীয় দলিলপত্র ( Documents required for claim) :
বীমাদারী করার সময় সাধারণভাবে নিম্নে বর্ণিত দলিলপত্র পেশ করতে হয় :-
১। বীমাপত্র বা বীমার প্রমানপত্র ( Insurance Policy or Certificate) :
বীমাদাবী করতে বীমাপত্র অথবা এতদসংক্রান্ত প্রমাণপত্র বীমাকারীর দপ্তরে উপস্থাপন করতে হয়।
২। চালানী রসিদ বা বহনপত্র ( Bill o Lading) :
চালানী রসিদে জাহাজযোগে পরিবাহিত পণ্যসামগ্রীর বিবরণ লিপিবদ্ধ থাকে। তাই, এ দলিলখানা ও বীমাদাবীর সময় জমা দিতে হয়।
৩। চালান ( Invoice) :
জাহাজস্থিত পণ্য সামগ্রী বিক্রয় তথা রপ্তানীর শর্তাবলী ও নিয়মাবলী এতে বর্ণিত থাকে এবং পণ্যদ্রব্যাদির পুরো হিসেব ও মূল্য নিরূপণের তথ্যাদিও এ দলিল থেকে পাওয়া যায় বলে চালান বীমাদাবীর জন্যে একান্ত অপরিহার্য ও সহায়ক।
৪। প্রতিবাদপত্র (Copy of protest) :
জাহাজ ডুবে যাওয়া বা দুর্ঘটনার কারণে সৃষ্ট ক্ষতিপূরণ দাবী বা বীমাদাবী করার সময় কাপ্তান কর্তৃক প্রদত্ত একটি প্রতিবাদপত্র জমা দিতে হবে। কেননা, জাহাজ ও পণ্যের নিরাপত্তার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সব কিছু করা হয়েছিল এবং কোন অবহেলার কারণে এরূপ দুর্ঘটনা ঘটেনি বলে উক্ত প্রতিবাদ পত্রে যথাবিহিত বর্ণনা লিপিবদ্ধ থাকে।

৫। বিক্রয় বিল বা হিসেব ( Account Sales or Bill of Sales) :
এ দলিলটিতে বিক্রয় সংক্রান্ত একটি হিসেব সন্নিবিষ্ট থাকে। এর মাধ্যমে মোট পণ্য মূল্য এবং বিক্রয়কৃত পণ্যমূল্যের মধ্যে পার্থক্যটুকু নিরূপণ করতে সুবিধে হয় বলে এটিও গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
৬। স্থলাভিষিক্ততার পত্র ( Letter of Subrogation) :
বীমাকারী কর্তৃক বীমাকৃত ব্যক্তি বা বীমাগ্রহীতাকে সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দানের পরে উচ্চারযোগ্য বা উদ্ধারকৃত পণ্যসামগ্রী বা সম্পত্তির মালিকানা যে বীমাগ্রহীতা থেকে বীমাকারীর কাছে চলে আসে তার প্রমাণপত্র এ দলিলটি। দায়গ্রাহক বা বীমাকারী তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে যদি ক্ষতিপুরণ আদায় করতে অসুবিধের সম্মুখীন হন সেক্ষেত্রে এ দলিলটি খুবই অপরিহার্য ও সহায়ক হয়।
