বাংলাদেশে বীমা কারবারের প্রধান প্রধান সমস্যা বা অন্তরায়সমূহ – নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা” বিষয়ের ” বীমার মৌলিক ও সাধারণ আধেয়সমূহ ” বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ।
Table of Contents
বাংলাদেশে বীমা কারবারের প্রধান প্রধান সমস্যা বা অন্তরায়সমূহ

বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের আগে যেহেতু পাকিস্তানের অংশ ছিল এবং তারও আগে অবিভক্ত উপমহাদেশের অংশ ছিল। সে কারণেই তার প্রায় সব কিছুরই একটি পুরোনো সূত্র রয়েছে যা পাকিস্তান ও অবিভক্ত বৃটিশ ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিবৃত্ত থেকে দেখে নিতে হয়। অন্যথায়, বর্ণনা পূর্ণাঙ্গতা প্রাপ্ত হয় না। তাই, বাংলাদেশের বীমা ব্যবসায়ের উৎস ও ক্রমবিকাশের ধারার সাথে সাথে তার সমস্যাধারার সম্পৃক্ততা রয়েছে বিধায় তন্নিরীখেই বীমা ব্যবসায়ের সমস্যাবলীর একটি সংক্ষিপ্ত ক্রমালোচনা নিম্নে প্রদান করা হলো :
১. দেশ বিভূক্তিজনিত সমস্যা :
পাক-ভারত বিভক্তির আগে বীমার যতটুকু অগ্রসরতা ছিল আমাদের বাংলাদেশ ভূ-খণ্ডে বলতে গেলে তার কিছুই ছিল না। সুতরাং,দেশ বিভাগের পরে বীমার ক্ষেত্রে শূন্যতা দেখা দেয়।
২. স্বাধীনতার অব্যবহিত পরবর্তী সমস্যা :
বলতে গেলে বাংলাদেশে পাক-শাসন কালেই বীমা ব্যবসায়ের পত্তন হয় যা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরই স্বাভাবিক কারণে আবার আপৎকালীন সমস্যার সম্মুখীন হয়। কেননা, অনেক উদ্যোক্তাই ছিলেন সাবেক পশ্চিম পাকিস্তানের।
৩. অর্থনৈতিক কাঠামো ও নীতিমালাজনিত সমস্যা :
স্বাধীনতার আগে বীমা ব্যবসায় ছিল সবটাই ব্যক্তিমালিকানায়। কিন্তু, স্বাধীনতার পরেই নানাকারণে সরকার বীমা প্রতিষ্ঠানগুলিকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেন। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই রাষ্ট্রপতির আদেশ বলে বীমা প্রতিষ্ঠানগুলিকে ৫টি সংস্থার অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং ১৯৭৩ সালে অবার উক্ত ৫টি সংস্থাকে মাত্র দুটি সংস্থার আওতায় আনা হয় যা (১) জীবন বীমা কর্পোরেশন ও (২) সাধারণ বীমা করর্পোরেশন নামে অভিহিত হয়। সুতারাং, ব্যক্তি মালিকানা থেকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার স্বাভাবিক প্রয়োজনেই নতুন কাঠামো নির্মাণ ও নীতিমালা প্রণয়ন করতে হয় যা ছিল রীতিমত একটি জটিল সমস্যা।
৪. পরিকল্পনা তথা প্রশাসনিক সমস্যা :
জাতীয়করণকৃত বীমা প্রতিষ্ঠানসমূহের জন্যে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা হয়ে পড়ে প্রচুর জটিলতা সাপেক্ষ ও আয়াসসাধ্য ব্যাপার।
৫. ব্যবস্থাপনা ও সংগঠনের সমস্যাঃ
নতুন কাঠামোর আওতায় নতুন নীতিমালা ও পরিকলপনার ভিত্তিতে বীমা সংস্থাসমূহের ব্যবস্থাপনা এবং সংগঠনও নতুন নতুন অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয়; তার মধ্যে ব্যবস্থাপনীয় ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাব ইত্যাদি ছিল অন্যতম।
৬. উপযুক্ত শিক্ষার অপ্রতুলতা:
আজও পর্যন্ত আমাদের দেশে বীমা সম্পর্কিত উপযুক্ত শিক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা হয়নি। শুধু দেশের কতিপয় বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে বীমা সম্পর্কিত অতি সামান্য পাঠ্যক্রম অন্তর্ভূক্ত হয়েছে; অথচ, এ বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে আরও ব্যাপক ও বিশেষায়িত শিক্ষার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
৭. প্রশিক্ষণের অভাব :
বীমা ব্যবসায়ে নিয়োজিত নির্বাহী ও কর্মচারীবৃন্দের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্যে ১৯৭৩ সালের আগে প্রকৃতপক্ষে আমাদের এখানে তেমন কোন ব্যবস্থাই ছিল না। ১৯৭৩ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ ইন্সিওরেন্স এ্যাকাডেমী প্রতিষ্ঠা করে সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বটে; কিন্তু, তার সম্প্রসারণ ও উৎকর্ষ সাধনের প্রত্যাশিত সুযোগের অভাবে প্রশিক্ষন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা রয়েছে এখনও। তবে, সরকার অনুকূল ও সহায়ক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এবং সংশ্লিষ্ট সকলের আস্তরিক প্রচেষ্টা থাকলে সেসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
৮. নীতিমালা ও পরিকল্পনা প্রনয়নের সমস্যা :
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্বাধীনতার পরে বাস্তব কারণেই বীমা প্রতিষ্ঠানসমূহকে জাতীয় তথা সরকারী মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণাধীনে নেয়া হয়; অথচ ইতিপূর্বে এ ধরনের কারবার ছিল ব্যক্তি মালিকানায়। ফলে, সম্পূর্ণ একটি নতুন প্রেক্ষাপটে নীতিমালা ও পরিকল্পনা প্রনয়নে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।
৯. পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সমস্যা :
স্বভাবতঃই বীমা ব্যবসায়ের ক্ষেত্রেও সরকার কর্তৃক অনুসৃত নীতিমালা ও তদনুযায়ী প্রণীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নেও নতুন নতুন সমস্যার মোকাবেলা করে এগুতে হয়।
১০. রাজনৈতিক পট-পরিবর্তন ও অস্থিতিশীলতা :
স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘদিন যাবৎ আমাদের দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছিলনা একের পর এক চলছিল রাজনৈতিক পট পরিবর্তন যা ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নীতি নির্ধারণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন, কর্মধারা পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্যে এক অবিরাম সমস্যা হয়ে ছিল।
১১. ব্যক্তি মালিকানাধীন বীমা প্রতিষ্ঠানের আত্মপ্রকাশ:
ব্যক্তি মালিকানাধীন বীমা প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতিষ্ঠা ও ক্রমবর্ধমান সংখ্যা উক্ত সমস্যারই বহিঃপ্রকাশ। যদিও তা কোন ক্ষতিকর অবস্থা সৃষ্টি করেনি। বরং, প্রকারান্তরে অর্থনীতির জন্যে হয়েছে অনেকাংশে সহায়ক।
১২. মিশ্র অর্থনীতির সমস্যা :
কোন দেশের অর্থনীতিকে সংহত ও শক্ত করতে হলে তা নিদ্দিষ্ট একটি পন্থায় এগিয়ে নেয়া বিধেয়। সমাজবাদী ও ধনবাদী— এ উভয়বিধ ব্যবস্থার একাধারে বিদ্যমানতা আহবান করে জটিলতা ও সংকট যাকে বলা যায় মিশ্র অর্থনীতির সংকট। আর, সে সংকট স্বাভাবিক কারনেই অন্যান্য ক্ষেত্রের মত বীমা ব্যবসায়ের ক্ষেত্রেও সমভাবে বিদ্যমান।
১৩. বীমাপত্রধারীদের দাবী মিটানোর জটিলতা :
আমাদের দেশের বীমা প্রতিষ্ঠানগুলির— বিশেষতঃ জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানের বীমাগ্রহীতাদের দায় মেটানোর ক্ষেত্রে অনুসৃত নিয়মকানুন বীমাগ্রহীতাদের ভোগান্তির কারণ হিসেবে আজও পরিলক্ষিত হয় যা নিঃসন্দেহে বীমা ব্যবসায়ের উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি অন্যতম অন্তরায় বা সমস্যা।

১৪. জনসাধারণের আস্থাহীনতা :
উপরোক্ত এবং অন্যান্য কিছু কিছু সঙ্গত কারণে আজও পর্যন্ত বীমা প্রতিষ্ঠানসমূহ প্রত্যাশিত মাত্রায় জনসাধারণের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। অর্থাৎ, একদিকে যেমন বীমা ব্যবসায় সর্বস্তরের মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেনি; অন্যদিকে, যতটুকু পরিচয় ঘটেছে তার অনেকাংশই জটিলতার ভীতি ও সংশয়ের দৃষ্টিতে পরিদৃষ্ট।
১৫. প্রাচীন পন্থা :
আমাদের দেশে এখনও পর্যন্ত বীমা ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে অনেক পুরোনো নিয়মকানুন ও পদ্ধতি অনুসৃত হয়। অথচ, উন্নত বিশ্বে তা সমধিক মাত্রায় উৎকর্ষপ্রাপ্ত হয়েছে।
১৬. বাস্তবানুগ কর্মপন্থার অভাব :
অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রের মতই বীমা ব্যবসায়ের ক্ষেত্রেও আমাদের দেশে বাস্তবে বিদ্যমান সমস্যা ও অবস্থার সাথে সামঞ্জস্য রেখে অধিকাংশ সময়ে কর্মপন্থা নির্ধারিত হয় না যা এ ব্যবসায়ের উন্নয়নের পথে এখনও একটি অন্তরায়।
১৭. প্রশাসন, ব্যবস্থাপনা ও সংগঠন কাঠামো :
আমাদের দেশের অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রের মতই বীমা প্রতিষ্ঠানসমূহে (রাষ্ট্রায়ত্ব) প্রশাসন, ব্যবস্থাপনা এবং সংগঠন কাঠামোতে পদ-বিন্যাস ও বন্টনজনিত অসামঞ্জস্য বিদ্যমান এবং নিম্নপর্যায়ে কর্মীর অভাব বিশেষভাবে পরিলক্ষিত।
১৮. অহেতুক অপচয় :
আমাদের দেশে বীমা প্রতিষ্ঠানেও কাজের চেয়ে লোক তার চেয়েও বেশী আয়েসী ও বিলাসী আয়োজনের উপর গুরুত্ব দিয়ে – প্রারম্ভিক পর্যায়েই ব্যয়ভার বাড়িয়ে তোলা হয়েছে যা বাস্তব কার্যপরিচালনায় সমস্যার সৃষ্টি করেছে।
১৯. নৈতিকতার বিপর্যয় :
সাধারণভাবেই আলোচিত ও পরিদৃষ্ট যে, আমাদের দেশে নৈতিকতার অবক্ষয় একটি দারুণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতারাং স্বাভাবিক কারণেই তা আমাদের দেশের বীমা ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে সমভাবে বিদ্যমান এবং তা বীমাকারীদের জন্যে অপ্রত্যাশিত মাত্রায় ঝুঁকি বৃদ্ধি করে রাখে।
২০. জন সাধারণের শিক্ষা ও চেতনার মান :
আমাদের দেশের জনসাধারণের শিক্ষা ও চেতনার মান এতটা নিচে যে অনেকেই আজও পর্যন্ত বীমা ব্যবসায়ের সাথে পরিচিত নন যা নিঃসন্দেহে বীমা ব্যবসা সম্প্রসারনের ক্ষেত্রে একটি অন্যতম অন্তরায়।
২১. সার্বিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা :
বীমা ব্যবসায়ও দেশের অর্থনীতির অন্তর্ভুক্ত একটি বাস্তব ব্যবস্থা। সুতরাং, দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন সাধিত হলে তার সকল অংশেরই উন্নয়ন সম্ভব হয়। যেখানে আমাদের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতা এখনও বিদ্যমান, সেখানে অতি সংগত কারণে তারই আওতাভুক্ত বীমা ব্যবসা সামগ্রিক অবস্থার আওতায়ই থাকবে — সেটাইতো স্বাভাবিক।
এতদ্সত্ত্বেও উপসংহারে আশা নিয়েই বলা যায় যে সামগ্রিক অবস্থার মধ্যে থেকেও আমাদের দেশে বীমা ব্যবসায় বেশ সমৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। সাধারণ বীমা কর্পোরেশন লাভজনক প্রতিষ্ঠান, জীবনবীমা কর্পোরেশন সম্ভাবনার পথে অগ্রসরমান এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলি পাশাপাশি আশাব্যঞ্জক কাজ করে চলছে।
