দেশের বীমা খাতের অভিভাবক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (IDRA) বীমা কোম্পানিগুলোর নিবন্ধন নবায়ন ফি এক লাফে ৫ গুণ বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত ৪ ফেব্রুয়ারি ‘বীমা ব্যবসা নিবন্ধন ফি বিধিমালা- ২০১২’ সংশোধন করে একটি গেজেট প্রকাশ করা হয়। ২০২৬ সাল থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই বর্ধিত ফি এবং এর গেজেট প্রকাশের সময়কাল নিয়ে খোদ বীমা খাতের বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও আইনি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
Table of Contents
আইনের ব্যত্যয় ও সময়জ্ঞান নিয়ে বিতর্ক
বীমা আইন-২০১০ অনুযায়ী, প্রতিটি বীমা কোম্পানিকে পরবর্তী বছরের ব্যবসা পরিচালনার জন্য পূর্ববর্তী বছরের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে নিবন্ধন নবায়নের আবেদন করতে হয়। সেই নিয়ম মেনে দেশের সকল বীমা কোম্পানি ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ২০২৬ সালের জন্য আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। এমনকি ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর নিবন্ধন নবায়নের সময়সীমাও পার হয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন একটি নির্দিষ্ট বছরের (২০২৬) নিবন্ধন প্রক্রিয়া ও ফি পরিশোধ আইনগতভাবে সম্পন্ন হয়ে গেছে, তখন সেই বছরের জন্য নতুন করে ফি বাড়িয়ে গেজেট প্রকাশ করা বীমা আইনের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এটি অনেকটা “পেছনের তারিখ থেকে আইন কার্যকর” করার মতো বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা প্রশাসনিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী বছরভিত্তিক প্রস্তাবিত ফি বিন্যাস:
| সময়কাল | প্রতি হাজার টাকা গ্রস প্রিমিয়ামে ফি | পূর্ববর্তী হারের তুলনায় বৃদ্ধি |
| বর্তমান হার (২০২৫ পর্যন্ত) | ১.০০ টাকা | – |
| ২০২৬ – ২০২৮ সাল | ২.৫০ টাকা | ২.৫ গুণ |
| ২০২৯ – ২০৩১ সাল | ৪.০০ টাকা | ৪ গুণ |
| ২০৩২ সাল ও পরবর্তী | ৫.০০ টাকা | ৫ গুণ |
ফি বৃদ্ধির কারণ বনাম বাস্তবতা
আইডিআরএ এই ফি বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু যুক্তি দেখিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো আইআইএমএস (IIMS) সার্ভিসের মাধ্যমে গ্রাহকদের বিনামূল্যে তথ্য প্রদান, নিজস্ব ভবন নির্মাণ, শাখা অফিস স্থাপন এবং পেশাদারিত্ব উন্নয়নের জন্য নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (যেমন- বিসিআইআই, বিআইআইএম) গড়ে তোলা।
তবে আইডিআরএ-র নিজস্ব আর্থিক প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা। ২০২১ সালের জুন মাস পর্যন্ত সংস্থাটির তহবিলে ১০৬ কোটি ৬০ লাখ টাকারও বেশি উদ্বৃত্ত ছিল। প্রতি বছর সংস্থাটি কোটি কোটি টাকা কর পরবর্তী মুনাফা করছে। এ অবস্থায় নতুন করে ফি বাড়িয়ে বীমা কোম্পানিগুলোর ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্ক উঠেছে।
আইআইএমএস সার্ভিস ও ‘দুয়ার সার্ভিস’ বিতর্ক
নিবন্ধন ফি বাড়ানোর একটি বড় উদ্দেশ্য হলো গ্রাহকদের বিনামূল্যে এসএমএস প্রদান। ইতিপূর্বে ‘দুয়ার সার্ভিস লিমিটেড’ নামক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে বিতর্কিত চুক্তির মাধ্যমে গ্রাহক প্রতি ৩ টাকা সার্ভিস চার্জ ও এসএমএস প্রতি ৪০ পয়সা ফি নির্ধারণ করা হয়েছিল। বীমা কোম্পানিগুলো শুরু থেকেই এই সেবার বিরোধিতা করে আসছে। কারণ:
কোম্পানিগুলোর নিজস্ব এসএমএস পাঠানোর আধুনিক ব্যবস্থা রয়েছে।
তৃতীয় পক্ষ যুক্ত হওয়ায় গ্রাহকের তথ্যের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
অপ্রয়োজনীয় আর্থিক ব্যয়ের ফলে গ্রাহকদের বোনাস বা কোম্পানির মুনাফা কমে যাচ্ছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই চুক্তি বাতিলের জোর দাবি ওঠে। তবে কর্তৃপক্ষ চুক্তি বাতিল না করে সেবাটির নাম পরিবর্তন করে ‘আইআইএমএস’ রাখে এবং বকেয়া বিল পরিশোধে চাপ সৃষ্টি করে। এখন সেই সার্ভিসের খরচ মেটাতেই মূলত নিবন্ধন ফি বাড়ানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করছেন।
প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও আইনি এখতিয়ার
আইডিআরএ-র দাবি, তারা বীমা সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা ইনস্টিটিউট তৈরি করবে। তবে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইন-২০১০ এর ১৫(খ) ধারা অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষ কেবল প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসমূহের উন্নয়নে “উৎসাহ প্রদান” করতে পারে। সংস্থাটি নিজেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করার আইনি এখতিয়ার রাখে কিনা, তা গেজেটে স্পষ্ট নয়।
৫ বছর বা ১০ বছর পরের নিবন্ধন ফি এখনই নির্ধারণ করে গেজেট প্রকাশের ঘটনা বাংলাদেশের আর্থিক খাতে বিরল। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত বীমা খাতের বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলার পরিবর্তে কোম্পানিগুলোর পরিচালনা ব্যয় বাড়িয়ে দেবে, যার চূড়ান্ত বোঝা গ্রাহকদের ওপরেই চাপবে।
