বীমা সংগঠনের প্রকারভেদ | বীমার মৌলিক ও সাধারণ আধেয়সমূহ | বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা

বীমা সংগঠনের প্রকারভেদ | বীমার মৌলিক ও সাধারণ আধেয়সমূহ, যুগ ও সভ্যতার প্রয়োজনে কালক্রমে বিভিন্ন ধরনের বীমা প্রতিষ্ঠান বিকাশ লাভ করে। সভ্যতার যতই পরিবর্তন ও উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে, বীমা ব্যবসায়ের ক্ষেত্রেও ততই নতুন নতুন উদ্যোগ ও অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়েছে। ক্রম বিকাশের ধারায় যেসব বীমা সংগঠন অদ্যাবধি সাধারণভাবে উন্মেষ ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে নিম্নে তাদের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রদান করা হলোঃ —

বীমা সংগঠনের প্রকারভেদ | বীমার মৌলিক ও সাধারণ আধেয়সমূহ | বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা

 

বীমা সংগঠনের প্রকারভেদ | বীমার মৌলিক ও সাধারণ আধেয়সমূহ | বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা

 

(১) পারস্পরিক সমিতি ( Mutual Association) :

বীমা ব্যবসায়ের প্রাথমিক পর্যায়ের সংগঠন হিসেবেই পারস্পরিক সমিতি উম্মেষ লাভ করে : আধুনিক সমবায় সংগঠন (Co-operative Insurance organisation যার রূপান্তর। কোন এক সময় একটি গোষ্ঠী যা কিছু সংখ্যক লোক পারস্পরিকভাবে তাদের নিজেদের জীবন এবং / অথবা সম্পদ-সম্পত্তির ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে একত্রিত হয়ে যে সমিতি গঠন করেন । তাই পারস্পরিক সমিতি নামে অভিহিত হয়।

পারস্পরিক সমিতির সদস্যবৃন্দ একাধারে বীমাকারী ও বীমাগ্রহীতা হিসেবে পরিগণিত হতেন। সমিতির সদস্যবৃন্দ প্রত্যেকেই ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণ করতে পারেন এবং ব্যবসায় থেকে অর্জিত মুনাফায়ও অংশ গ্রহণ করে থাকেন। সমিতির মূল উদ্দেশ্য সদস্যবৃন্দের পারস্পরিক জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতি লাঘব করা বা কাটিয়ে ওঠা ; মুনাফা অর্জন মূল বিষয় নয় বরং, আনুষঙ্গিক।

(২) লয়েডস্‌ সমিতি ( Lloyd’s Association) :

লয়েডস্ সমিতি পৃথিবীর মধ্যে একটি প্রাচীনতম ও বৃহত্তম বীমা প্রতিষ্ঠান। এডওয়ার্ড লয়েড-এর কফি ঘরে বসেই এ সমিতির সৃষ্টি। অষ্টাদশ শতাব্দীতে বৃটিশ রাজ পরিবার সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীগণ আমেরিকা, কানাডা ও অন্যান্য দেশের সাথে জাহাজযোগে ব্যবসা বাণিজ্য করতেন। সমুদ্রে জাহাজ ডুবে গেলে বা জাহাজ এবং/অথবা পণ্য-সামগ্রীর ক্ষতি হলে কিভাবে মালিকগণ পারস্পরিকভাবে প্রত্যেকে প্রত্যেককে সাহায্য করতে পারেন, তার উপায় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমেই কফি হাউজে বসে লয়েডস সমিতির জন্ম।

উক্ত ব্যবসায়ীদের রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের উপর বিশেষ প্রভাব থাকায়ই এ প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্যে আইন পাশ করা হয়। ১৮৭১ খৃষ্টাব্দে সমিতির সদস্যদের একটি প্রতিষ্ঠানের আওতাধীনে এবং দীর্ঘস্থায়িত্ব প্রদানের ভিত্তিতে অনুমোদন প্রদান করে তার পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্যে লয়েডস আইন (Lloyd’s Act, 1871) প্রণীত হয়। লয়েডস বীমা সংস্থা ( Lloyd s Corporation)—টিকে ক্রমাগতভাবে নৌ-বীমার পাশাপাশি অন্যান্য বীমার ক্ষেত্রেও ব্যবসায় পরিচালনার জন্যে সম্প্রসারিত করা হয়।

লয়েড সমিতি ব্যক্তি বা একক বীমাকারীদের যৌথ সংগঠন যাদের দায়গ্রাহক হিসেবেও অভিহিত করা হয় এবং যা সিণ্ডিকেট নামেও পরিচিত হয়। কোন বীমাকারী লয়েড সমিতির সদস্য হতে চাইলে তাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি জমা দিতে হয়। সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগে প্রথমেই প্রস্তাবিত সদস্যের আর্থিক সংগতি সম্পর্কে সমিতি অনুসন্ধান করে সন্তুষ্ট হলে তবেই অন্তর্ভুক্ত করে নেন।

সমিতি কেবলমাত্র নিয়ন্ত্রণকারী ও পরামর্শদানকারী সংস্থা। কেউ বীমাপত্র গ্রহণ করতে বা বীমাগ্রহীতা হতে চাইলে সমিতির কাছে প্রস্তাব না দিয়ে সমিতির অধীন সদস্য বীমাকারী বা দায়গ্রাহকদের কাছে প্রস্তাবদান করবেন। যদি কোন দায়গ্রাহক বীমাদাবী পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন, তাহলে সমিতি উক্ত দায়গ্রাহক কর্তৃক পূর্বজমাকৃত সিকিউরিটির অর্থ থেকে বীমা দাবী পরিশোধ করে দেয়। সংস্থাগতভাবে লয়েড সমিতি অথবা সমিতির অন্যান্য সদস্যবৃন্দ কোন একজন দায়গ্রাহকের দায় পরিশোধে কখনই বাধ্য নন; বরং প্রত্যেকে যার যার দায় পরিশোধের জন্যে ওয়াদাবদ্ধ থাকে।

 

(৩) স্ব-বীমা (Self Insurance) :

এম, এন, মিশ্র-এর মতে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নিজস্ব উদ্যোগে সৃষ্ট তহবিল থেকে ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদ-সম্পত্তির ক্ষতিপুরণের জন্যে যে পরিকল্পনা নেয়া হয়, তা স্ব-বীমা বলে (The plan by an individual or concern sets up a private fund out of which to pay losses is termed Self Insurance”)। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানটিও সম্ভাব্য ঝুঁকিজনিত ক্ষতিপুরণের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট সময় অন্তর নির্দিষ্ট পরিমাণের অর্থ জমা করতে থাকে।

যদিও স্ব বীমা প্রকৃতপক্ষে কোন বীমা নয়। কেননা, এতে কোন ঝুঁকি গ্রহণ বা অন্যকে ঝুঁকি বর্তানো অথবা অন্যান্য অনেকের মধ্যে ঝুঁকি বন্টন হয় না; এতে ক্ষতিপূরণের জন্যে একটি ব্যবস্থা রাখা হয় মাত্র। এখানে বীমাকৃত ব্যক্তি নিজেই নিজের বীমাকারী। এই ধরনের ব্যবস্থা তখনই লাভজনক হয়, যখন একই সম্ভাব্য ঝুঁকির অনেকগুলি বিষয়বস্তু থাকে।

এ ধরনের ব্যবস্থা কতগুলি কারণে লাভজনক হয়ে থাকে। যেমনঃ – এতে যে টাকা জমাকৃত হয়, তা তার নিজেরই থাকে এবং উক্ত জমাকৃত টাকা তিনি অন্যত্র কোন লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করতে পারেন। উপরস্তু, তাকে কোন প্রতিনিধি রাখার খরচ বহন করতে হয় না এবং এর জন্যে আলাদা কোন অফিস রাখতে হয় না। ফলে, বিনিয়োগে অধিক প্রাপ্তি এবং নির্বাহী ব্যয় সর্বনিম্ন হওয়ায় ব্যবস্থাটি লাভজনক হয়ে থাকে।

(i) বিভিন্ন সম্পদ-সম্পত্তি থাকে (II) সম্পদ-সম্পত্তি বিভিন্ন স্থানে থাকে (iii) সম্পদ-সম্পত্তি বিভিন্ন ঝুঁকির অধীনে থাকে ও (iv) একস্থানে বেশী ঝুঁকি এবং অন্যস্থানে কম ঝুঁকি থাকে এরূপ অবস্থা ও প্রেক্ষিতে এ জাতীয় ব্যবস্থা সফলভাবে কার্যকর হয়। তাই, সীমিত পরিসরে ঝুঁকি ও সম্পদের ক্ষেত্রে এরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ সমীচীন নয়।

(৪) একক মালিকানাধীন বীমা প্রতিষ্ঠান বা একক বীমাকারী (Individual Insurer):

অন্যান্য কারবার তথা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মত বীমা ব্যবসাও কোন এক ব্যক্তির উদ্যোগে ও প্রচেষ্টায় গঠিত, পরিচালিত এবং নিয়ন্ত্রিত হতে পারে, যদি তার প্রয়োজনীয় মেধা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকে। তবে, বীমা ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে একক উদ্যোগ ও মালিকানা খুব কমই পরিদৃষ্ট হয়। কেননা, এটি বেশ জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা।

(৫) অংশীদারী বীমা সংগঠন (Partnership Insurance Organisation):

বীমার ক্ষেত্রে অংশীদারী কারবার একটি অন্যতম প্রাচীন পন্থা ঘটে। এ ক্ষেত্রে যৌথ মূলধনী কারবারের উন্মেষপূর্ণ কালে অংশীদারী কারবারহ পরিচালিত হতো বেশী। তবে, যেহেতু অংশীদারী কারবারে অংশীদারদের দায় সাধিত্ব থাকে অসীম এবার ক্ষেত্রে ব্যাপক কোন ক্ষতি সংঘটিত হলে কোন অংশীদারকে বা অংশীদারদের সীমাহীন আর্থিক দায়ের বোঝা বইতে হয় বলে কালক্রমে ভিন্ন চিন্তার ফলশ্রুতিতে কোম্পানী গঠণের উদ্যোগ শুরু হয়।

(৬) অননুমোদিত কোম্পানী (Un-incorporated Companies ) :

অংশীদারী কারবারের অসুবিধা এড়াতে বীমা কারবারীগণ ভিন্ন পন্থা হিসেবে কোম্পানী গঠনের মাধ্যমে বীমা ব্যবসায় চালাতে চেষ্টা নিলেন। তবে, তখনও কোম্পানী আইন প্রণীত না হওয়ায় বৃটিশ রাজ সেদেশে এরূপ অননুমোদিত বীমা কোম্পানী গঠন ও পরিচালনার অনুমতি দেন। কিন্তু, পরবর্তী কালে যৌথ মূলধনী কারবারের ব্যাপক প্রচলনের ফলে এ ধরনের অননুমোদিত কোম্পানী কালক্রমে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

(৭) যৌথ মূলধনী কোম্পানী (Joint Stock Companies) :

বীমার ক্ষেত্রেও অন্যান্য কারবারের ন্যায় যৌথ মূলধনী কোম্পানী ব্যাপক জনপ্রিয়তায় প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হতে থাকে। বীমার ক্ষেত্রেও যারা কোম্পানী গঠনের জন্যে মূলধন সরবরাহ করেন, তারাই তার প্রকৃত মালিক এবং তারাই কোম্পানীর ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণ করে থাকেন। তাদের শেয়ার বা ষ্টক হোল্ডার বলা হয়। তারা তাদের মধ্য থেকে কোম্পানী পরিচালনার জন্যে একটি পরিচালনা পর্ষদ গঠন করেন।

এসব ব্যাপারে বীমাপত্রধারীদের কোন ভূমিকা থাকে না এবং তারা মুনাফাও ভোগ করতে পারেন না। তবে, জীবন বীমার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কোম্পানীতে সুযোগ রাখলে বীমাপত্রধারীগণ মুনাফায় অংশগ্রহণ করতে পারেন যাদের মুনাফায় অংশগ্রহণকারী বা মুনাফাভোগী বীমাপত্রধারী (Participating policyholders) বলা হয়। উপমহাদেশে বীমা ব্যবসায় জাতীয়করণের আগে ১৯৩৮ সালের বীমা বিধি ( Insurance Act, 1938) অনুযায়ী বীমাপত্রধারীগণ কর্তৃক কোম্পানীর পরিচালনা পর্ষদের এক-চতুর্থাংশ সদস্য মনোনীত হতেন যারা তাদের প্রতিনিধি হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন। তখন, সাধারণতঃ মুনাফার ৫% ভাগ শেয়ার হোল্ডারদের মধ্যে এবং ৯৫% ভাগ বীমাপত্রধারীদের মধ্যে বটিত হতো।

 

বীমা সংগঠনের প্রকারভেদ | বীমার মৌলিক ও সাধারণ আধেয়সমূহ | বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা

 

(৮) সমবায় বীমা সংগঠন (Co-operative Insurance Organisation) :

সমবায় সমিতি আইন Co-operative Societies Act) বীমা ব্যবসায় অনুমোদিত ও নিবন্ধিত হয়ে থাকে, তাকে সমবায় বীমা সংগঠন বলা হয়। এ ধরনের বীমা প্রতিষ্ঠানকে তাই সমবায় ধীমা সমিতিও বলা হয়। এ জাতীয় বীমা সংগঠন পারস্পরিক বীমা সমিতির মতই মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় না, বরং সদস্যদের পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা তথ্য ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধানের প্রয়াসে গঠিত ও পরিচালিত হয়ে থাকে। এ উপমহাদেশে ১৯৩৮ সালের বীমা সংবিধি মোতাবেক সমবায় বীমা সংগঠনগুলি পরিচালিত হতো। কিন্তু পরবর্তী কালে ভারত ভূ-খণ্ডে বীমা ব্যবসায়ের জাতীয়করণের পরে এ ধরনের বীমা সংগঠন বিলুপ্ত হয়ে যায়।

(৯) রাষ্ট্রীয় বীমা ( State Insurance) :

অনেক সময় রাষ্ট্র বা কোনদেশের সরকার বীমার মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে থাকেন এবং জনসাধারণের কল্যাণ বিধানের উদ্দেশ্যে পরিচালনা করেন। সরকারী বা রাষ্ট্রীয় মালিকানা এবং নিয়ন্ত্রণাধীনে যে বীমা ব্যবসায় পরিচালিত হয়, তাকে রাষ্ট্রীয় বীমা বলা হয়। পূর্বে যেসব বিষয় জনস্বার্থের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং যেসব ক্ষেত্রে ব্যক্তি মালিকগণ বীমা ব্যবসা পরিচালনায় অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ বা সুবিশাল ক্ষেত্র বলে অথবা অন্যান্য কারণে আগ্রহী হতেন না, সেসব বিষয় ও ক্ষেত্রে রাষ্ট্র বা সরকার বীমা ব্যবসায় পরিচালনা করতেন।

যেমনঃ – সামাজিক নিরাপত্তা বীমা, বেকারত্ব বীমা, শস্য বীমা, যুদ্ধ বীমা, রপ্তানী ঋণ বীমা, বিমানপোত বীমা ইত্যাদি। কিন্তু, বর্তমানে পৃথিবীর অনেক দেশে সমগ্র বীমা ব্যবসাকেই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীনে নেয়া হয়েছে। ফ্রান্স, জাপান, মেক্সিকো, ভারত প্রভৃতি দেশেও বীমা ব্যবসাকে অধিকাংশে বা সর্বাংশে জাতীয়করণ করে নেয়া হয়েছে। আমাদের দেশে স্বাধীনতার পরে বীমা ব্যবসাকে জাতীয়করণ করা হয়েছিল। তবে, ইদানিং ব্যক্তি মালিকানায়ও বেশ কিছু সংখ্যক বীমা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হচ্ছে।

মোটামুটিভাবে, উপরোক্ত বীমা সংগঠনগুলিই বীমা ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে পরিদৃষ্ট হচ্ছে।

Leave a Comment