মে ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের শেষ সপ্তাহে বৈশ্বিক বিমা বাজারে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আনুষ্ঠানিক সূচনা, সেবার পরিধি সম্প্রসারণে নতুন কৌশলগত অংশীদারিত্ব, জলবায়ু ঝুঁকির কারণে ফসলের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের মতো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। গত ২৫ মে থেকে ২৯ মে পর্যন্ত সময়ে বিমা খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের গ্রাহকসেবা উন্নত করতে এবং বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেছে। এই সপ্তাহের প্রধান প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক পোর্টালের উন্মোচন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে বিমা সেবা পৌঁছে দেওয়ার নতুন উদ্যোগ।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সূচনা এবং জলবায়ু ঝুঁকির ক্ষতিপূরণ
ক্যাথে নামের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানটি তাদের সদস্যদের জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল বিমা প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে। এই নতুন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সদস্যরা তাদের সহযোগী বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ভ্রমণ, স্বাস্থ্য, গৃহ, মোটরগাড়ি এবং ব্যক্তিগত দুর্ঘটনাজনিত ঝুঁকির বিমা সেবা সরাসরি গ্রহণ করতে পারবেন। ক্যাথে তাদের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, এই প্ল্যাটফর্মটি মূলত একটি একক ডিজিটাল পোর্টাল হিসেবে কাজ করবে, যেখানে সদস্যরা অত্যন্ত সহজে বিভিন্ন বিমার শর্তাবলী পর্যালোচনা ও ক্রয়ের সুযোগ পাবেন। এছাড়া, এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে যোগ্য কেনাকাটার বিপরীতে এশিয়া মাইলস বা বিশেষ রিওয়ার্ড পয়েন্ট অর্জন করা যাবে। প্রতিষ্ঠানটি আরও নিশ্চিত করেছে যে, এই পোর্টালের মাধ্যমে পলিসি ব্যবস্থাপনা এবং বিমার দাবি নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় গ্রাহক সহায়তাও প্রদান করা হবে।
একই সপ্তাহে ভিয়েতনামের সেন্ট্রাল হাইল্যান্ডস বা কেন্দ্রীয় পার্বত্য অঞ্চলের কফি চাষিদের জন্য জলবায়ুজনিত কারণে বিশেষ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। ডব্লিউটিডব্লিউ-এর অন্তর্ভুক্ত উইলিস এবং গ্লোবাল প্যারামেট্রিক্স জানিয়েছে, ২০২৫-২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের চাষের মরসুমে অতিরিক্ত ও ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে সেখানে কফি ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এর আগে ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দের শেষের দিকে বাও মিন ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশনের সাথে একটি উচ্চ-বৃষ্টিপাত সংক্রান্ত বিশেষ বিমা পলিসি সক্রিয় করা হয়েছিল। সেই পূর্বনির্ধারিত সূচকের ভিত্তিতেই ক্ষতিগ্রস্ত কফি চাষিদের এই বিমার অর্থ বা ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়েছে।
কৌশলগত অংশীদারিত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা
ভারতের বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে শ্রীরাম জেনারেল ইন্স্যুরেন্স এবং পিরামল ফাইন্যান্স একটি নতুন কৌশলগত অংশীদারিত্বের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য হলো ভারতের আধা-শহুরে এবং গ্রামীণ বাজারগুলোতে বিমা সেবার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা। শ্রীরাম জেনারেল ইন্স্যুরেন্স তাদের সেবার পরিধি বাড়াতে পিরামল ফাইন্যান্সের বিশাল শাখা নেটওয়ার্ক এবং গ্রাহক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কাজে লাগাবে। এর ফলে ভারতের ২৬টি রাজ্যজুড়ে বিস্তৃত পিরামল ফাইন্যান্সের ৭০১টি শাখা এবং ১৩,০০০-এরও বেশি পিন কোড বা ডাক অঞ্চলে শ্রীরাম জেনারেল ইন্স্যুরেন্সের বিভিন্ন সাধারণ বিমা পণ্য গ্রাহকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
বিমা খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান টোকিও ম্যারিন হোল্ডিংস আগামী এক দশকে নিজেদের একটি ঐতিহ্যবাহী বিমা কোম্পানি থেকে বিস্তৃত সমাধান প্রদানকারী অংশীদার হিসেবে রূপান্তরের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। প্রতিষ্ঠানটি “অ্যাসপিরেশন ২০৩৫” বা “আকাঙ্ক্ষা ২০৩৫” শিরোনামে একটি নতুন ১০ বছর মেয়াদী কৌশলগত রূপরেখা প্রকাশ করেছে। টোকিও ম্যারিন হোল্ডিংসের প্রেসিডেন্ট এবং গ্রুপ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসাহিরো কোইকে এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। এই পরিকল্পনার মূল অর্থনৈতিক লক্ষ্য হলো আগামী ২০৩৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে কোম্পানির সমন্বিত নিট আয় দ্বিগুণেরও বেশি করা এবং বিশ্ববাজারে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করা। ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দের ৫.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৮৮১.৫ বিলিয়ন জাপানি ইয়েনের বেসলাইন বা ভিত্তিকে অতিক্রম করে ২০৩৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে এই বার্ষিক নিট আয় ১০.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১.৭ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েনে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
চলতি সপ্তাহে বৈশ্বিক বিমা বাজারের প্রধান প্রধান ঘটনা, আর্থিক লক্ষ্যমাত্রা এবং সেবামূলক খাতের বিবরণ নিচের তালিকায় বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হলো:
| বিমা খাতের প্রধান প্রতিষ্ঠান | গৃহীত উদ্যোগ ও কৌশলগত রূপরেখা | সেবার পরিধি ও আর্থিক লক্ষ্যমাত্রা | তথ্যসূত্র ও দাপ্তরিক উৎস |
| ক্যাথে | সমন্বিত ডিজিটাল বিমা প্ল্যাটফর্মের আনুষ্ঠানিক উন্মোচন | ভ্রমণ, স্বাস্থ্য, গৃহ, মোটরগাড়ি এবং ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা বিমা | প্রাতিষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি |
| উইলিস ও গ্লোবাল প্যারামেট্রিক্স | ভিয়েতনামের কফি চাষিদের জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান | ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের বিমা দাবি নিষ্পত্তি | বাও মিন ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন |
| শ্রীরাম জেনারেল ইন্স্যুরেন্স | পিরামল ফাইন্যান্সের সাথে নতুন কৌশলগত ব্যবসায়িক চুক্তি | ভারতের ২৬টি রাজ্যের ৭০১টি শাখা ও ১৩,০০০ পিন কোডে সম্প্রসারণ | শ্রীরাম জেনারেল করপোরেট অফিস |
| টোকিও ম্যারিন হোল্ডিংস | ১০ বছর মেয়াদী “আকাঙ্ক্ষা ২০৩৫” কৌশলগত রূপরেখা | বার্ষিক নিট আয় ৫.৬ বিলিয়ন ডলার থেকে ১০.৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীতকরণ | মাসাহিরো কোইকে (প্রধান নির্বাহী) |
প্রান্তিক বাজারে বিমার প্রসারে নতুন সম্ভাবনা
শ্রীরাম জেনারেল ইন্স্যুরেন্স এবং পিরামল ফাইন্যান্সের এই যৌথ উদ্যোগ ভারতের ছোট শহরগুলোতে ক্ষুদ্র বিমা বা সাধারণ বিমার প্রসারে একটি বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। সাধারণত গ্রামীণ এবং আধা-শহুরে অঞ্চলের মানুষ প্রাতিষ্ঠানিক বিমা সেবার বাইরে থেকে যায়। পিরামল ফাইন্যান্সের স্থানীয় শাখাগুলোর মাধ্যমে এখন সাধারণ মানুষ তাদের গবাদিপশু, ফসল, মোটরগাড়ি ও স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় সহজে পলিসি গ্রহণ করতে পারবে। অন্যদিকে, টোকিও ম্যারিনের মতো বড় বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের এই রূপান্তর প্রক্রিয়া প্রমাণ করে যে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের কারণে বিশ্বজুড়ে বিমা কোম্পানিগুলো তাদের সনাতন ধারা পরিবর্তন করে আধুনিক ও বহুমুখী সেবার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
