বোনাসের সংজ্ঞা ও শ্রেণী বিন্যাস

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়  বোনাসের সংজ্ঞা ও শ্রেণী বিন্যাস যা জীবন বীমা অধ্যায়ের অর্ন্তভুক্ত।

বীমা প্রতিষ্ঠানসমূহ সঞ্চয়কৃত তহবিল থেকে দায় ও ব্যয় নির্বাহ করে যে অর্থ থাকে তাকে উদ্বৃত্ত বলে। উক্ত উদ্বৃত্ত থেকে বিভিন্ন খাতে যথার্থ সঞ্চিতি সৃষ্টি বা রাখা এবং প্রয়োজনীয় কোন ব্যয় নির্বাহের পর যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে তাকে মুনাফা বলে। এই মুনাফা শেয়ার হোল্ডার এবং পলিসিহোল্ডার বা বীমাপত্রধারীদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়া হয়। কিন্তু, সব ধরনের বীমাপত্রধারীদেরই মুনাফার অংশ দেয়া হয়।

বোনাসের সংজ্ঞা ও শ্রেণী বিন্যাস

 

বোনাসের সংজ্ঞা ও শ্রেণী বিন্যাস

 

না। শুধু মুনাফাযুক্ত বীমাপত্রধারীকেই মুনাফার অংশ দেয়া হয়, আর, এই মুনাফার অংশ বীমাপত্রধারীদের মধ্যে প্রদানকেই বোনাস প্রদান নামে অভিহিত করা হয়। তাই, বলা যায় যে উদ্বৃত্তের যে অংশ (মুনাফা) মুনাফাযুক্ত বীমাপত্রধারীদের মধ্যে বিতরণ করা হয় তাকেই বেনাস (তখনতস) বলা হয়। এই বোনাস সাধারণতঃ প্রতি বছরই দেয়া হয়; তবে, কোন কোন সময় ৩ বা ৫ বছর অন্তর অন্তরও দেয়া হয়ে থাকে। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে মুনাফা না হলে বোনাস প্রদান করা হয় না।

অধিকর, বোনাস প্রদানের পদ্ধতি এবং পরিমাণও হয়েছে বিভিন্ন প্রতিযোগিতাপূর্ণ বীমাকারবারের তাগিদেই। প্রদত্ত ছকটির সাহায্যে বোনাসের প্রকারভেদ সম্পর্কে স্পষ্টতর ধারণা নেয়া যেতে পারে।বিভিন্ন প্রকার বোনাস সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রদান করা হলো: –

১। তাৎক্ষণিক বোনাস (Immediate Bonus) :

বীমাকারী কর্তৃক বোনাস ঘোষণার সাথে সাথে অথবা ঘোষণার পর কোন নির্দিষ্ট সময়াস্তে যে বোনাস তাকেই তাত্ক্ষণিক বোনাস বলা হয়। এ ধরনের বোনাসকে আবার নিম্নে বর্ণিত কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করা হয়ে থাকে।

(ক) নগদ বোনাস (Cash Bouns) :

যখন তাৎক্ষণিক বোনাসের টাকা বীমাগ্রহীতাকে নগদ প্রদান করা হয়, তখন তাকে নগদ বোনাস বলে। এক্ষেত্রে বীমাকৃত অর্থের সাথে বোনাস যুক্ত করে দেয়া বা নেয়ার অপেক্ষায় থাকতে হয় না। এ ব্যবস্থায় মুনাফা যুক্ত বীমাপত্রের গ্রহীতাদের প্রতি বছর অথবা কয়েক বছর অন্তর অন্তর বোনাস হিসেবে নগদ টাকা প্রদান করা হয়। অবশ্য বীমাগ্রহীতা ইচ্ছে করলে বোনাস নগদ গ্রহণ না করে বীমাকৃত অর্থের সাথে যুক্ত করে প্রত্যাবর্তনশীল বোনাস হিসেবেও রূপান্তরিত করে নিতে পারেন।

(খ) বীমাকিস্তি হ্রাসকারী বোনাস (Bonus in reduction of premium) :

যে বোনাস বীমাকৃত অর্থের সাথেও যুক্ত করা হয় না এবং বীমাগ্রহীতাকে নগদও প্রদান করা হয় না, বরং ভবিষ্যতে প্রদেয় বীমাকিত্তি থেকে বাদ দেয়া হয় তাকে বীমাকিস্তি হ্রাসকারী বোনাস বলা হয়। ঘোষণাকৃত বোনাসেই যদি প্রাপ্য সম্পূর্ণ কিস্তির অর্থ পরিশোধিত হয়ে যায় এবং আরও উদ্বৃত্ত বোনাস থাকে তাহলে তা বীমাগ্রহীতাকে নগদ দেয়া হয় অথবা বীমাকৃত অর্থের সাথে যুক্ত করে দেয়া হয়ে থাকে।

( গ )বোনাস (Discounted Bonus) :

কখনও কখনও বীমাকারী সম্ভাব্য বোনাসের পরিমাণ পূর্বানুমান করে প্রদেয় বীমাকিস্তি থেকে উক্ত পরিমাণ অর্থ বাদ দিয়ে বাকী বীমাকিস্তি আদায় করে। পরে, যদি দেখাযায় যে প্রকৃত বোনাস পূর্বানুমিত বোনাস অপেক্ষা বেশী হয় তাহলে বাড়তি পরিমাণের বোনাসের টাকা নগদ বীমাগ্রহীতাকে বীমাকারী প্রদান করতে পারে অথবা বীমাকৃত অর্থের সাথে যুক্ত করে দিতে পারে; আর যদি, প্রকৃত বোনাস কম হয় তাহলে তা বীমাগ্রহীতার কাছ থেকে বীমাকারী নগদ নিয়ে নিতে পারে অথবা বীমাকৃত অর্থ থেকে কেটে রাখতে পারে। এ ধরনের বোনাসকে বাটাকৃত বোনাস বলা হয়।

(ঘ) প্রত্যাবর্তনশীল বোনাস (Reversionary Bonus) :

যে বোনাস প্রতি বছরই বীমাকৃত অর্থের সাথে যুক্ত হয়ে থাকে এবং বীমাকৃত অর্থ যখন যেভাবে পরিশোধ্য হয় বোনাসের অর্থও যুক্ত হয়ে তখন এবং সেভাবে পরিশোধ্য হয়ে থাকে, তাকে প্রত্যাবর্তনশীল বোনাস বলে। এ ধরনের বোনাসকে আবার নিম্নে বর্ণিত দুভাগে ভাগ করা যায়। যথা : –

(i) সরল প্রত্যাবর্তনশীল বোনাস (Simple Reversionary Bonus) :

এ ধরনের বোনাস বীমাকৃত টাকার অনুপাতে বণ্টিত হয় এবং বীমাকৃত টাকার সাথে যুক্ত হয়ে থাকে যা দাবী পরিশোধ করার সময় যুক্তভাবে পরিশোধিত হয়। উল্লেখ্য যে, প্রতিবছরই এ বোনাস মূল বীমাকৃত অর্থের অনুপাতেই বণ্টনকৃতহয়ে থাকে। এ ধরণের বোনাস আবার নিম্নলিখিত দুধরনের হতে পারে।

(অ) সরল সম প্রত্যাবর্তনশীল বোনাস (Simple Uniform Reversionary Bonus) :

এ ধরনের বোনাস প্রতি বছর বীমাকৃত অর্থের উপর হাজার প্রতি নির্দিষ্ট হারে মেয়াদ অথবা বীমাকিস্তি নির্বিশেষে সকল পলিসির বেলায়ই বণ্টিত হয়ে থাকে। এ ধরনের হিসেব অনেক সময় অসঙ্গত মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এ জাতীয় বোনাসের বেলায়ই সর্বাধিক যৌক্তিক বলে পরিগণিত হয়। উপরন্ত এটি একটি সুবিধা জনক পন্থাও।

(আ) সরল অংশানুপাতিক প্রত্যাবর্তনশীল বোনাস (Simple Contributory Reversionary Bonus):

এ ক্ষেত্রে বীমাগ্রহীতার অংশ ভোগের প্রেক্ষিতে বোনাস বণ্টনের চেষ্টা নেয়া হয় যা প্রকৃতপক্ষে একটি জটিল প্রয়াস বলে পরিগণিত হয়। কেননা, অনুপাত নির্ধারণ অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। ভারত, বৃটেন এবং অন্যান্য অনেক দেশেই এখন সরল প্রত্যাবর্তনশীল বোনাস জনপ্রিয়তা লাভ করছে।

 

(ii) চক্রবৃদ্ধি প্রত্যাবর্তনশীল বোনাস (Compound Reversionary Bonus) :

এ ধরনের বোনাস প্রতি বছর বীমাকৃত অর্থের সাথে যুক্ত হয়ে থাকে বটে; কিন্তু, তা মূল বীমাকৃত অর্থের অনুপাতে বণ্টিত না হয়ে বরং বীমাকৃত টাকার সাথে পূর্ব বণ্টিত বোনাসের টাকা যুক্ত করে মোট অংকের অনুপাতে বণ্টন করা হয়। ফলে, যে বীমাপত্র অধিক সময় চালু থাকে তার বোনাসের পরিমাণ, নতুন বীমাপত্রের বোনাসের তুলনায় সঙ্গতকারণেই বেশী হয়ে থাকে। এ ধরনের বোনাস আবার দুর্ভাবে বিভক্ত করা হয়ে থাকে। যথা : –

(n) চক্রবৃদ্ধি সমপ্রত্যাবর্তনশীল বোনাস (Compund Uniform Reversionary Bonus) :

এ জাতীয় বোনাস বীমাকৃত অর্থ এবং চলতি সময় পর্যন্ত পূবর্তন বণ্টিত বোনাস যুক্ত পরিমানের উপর হাজার প্রতি নির্দিষ্ট হারে হিসেব করে বণ্টিত হয়ে থাকে।

(y) চক্রবৃদ্ধি অংশানুপাতিক প্রত্যাবর্তনশীল বোনাস Compound Contributory Reversionary Bonus) :

এ ক্ষেত্রে বীমাগ্রহীতার অংশভাগীত্বের উপর বোনাস হিসেব করা হয়ে থাকে যা প্রতি বছরই যুক্ত হতে থাকে বীমাকৃত অর্থ এবং পূর্ব বণ্টিত বোনাস-এর যুক্ত পরিমানের উপর যা প্রকৃতপক্ষেই খুব জটিল হিসেবের ব্যাপার।

(২) বিলম্বিত বোনাস (Deferred Bonus) :

তাৎক্ষণিকভাবে প্রদেয় বোনাস যেমন রয়েছে, বিলম্বে প্রদেয় বোনাসও তেমনি রয়েছে। যে বোনাসের অর্থ ভবিষ্যৎ কোন একটি সময় পর্যন্ত পরিশোধ স্থগিত রাখা হয়, তাকেই বিলম্বিত বোনাস বলা হয়।

 

বোনাসের সংজ্ঞা ও শ্রেণী বিন্যাস

 

৩। অন্যান্য বোনাসসমূহ (Other Bonuses) :

(অ) অন্তর্বর্তীকালীন বোনাস (Interim Bonus) : যদি কোন বীমা প্রতিষ্ঠান দু’টি মূল্যায়নের মধ্যবর্তী সময়ে কোন বোনাস ঘোষণা করে তাহলে তাকে অন্তর্বর্তীকালীন বোনাস বলা হয়। স্বাভাবিকভাবেই বোধগম্য যে, মূল্যায়নের পর উদ্বৃত্ত থেকে এ বোনাস ঘোষণা করা হয় না; বরং, তা ভবিষ্যৎ বা সম্ভাব্য উদ্বৃত্তের পূর্বানুমানের উপর নির্ভর করে এ বোনাস বণ্টিত হয়ে থাকে, সে কারণেই এ ধরনের বোনাস ঘোষণার আগে বীমাকারীকে অতীত অভিজ্ঞতার উপর দৃষ্টি রাখতে হয়। অন্যথায় বীমাকারীকে অসুবিধায় পড়তে হয়।

(ব) প্রতিশ্রুত বোনাস (Guaranteed bonus) বীমা প্রতিষ্ঠান বা বীমাকারীগণ সাধারণতঃ উদ্বৃত্ত তথা মুনাফা হলেই বোনাস ঘোষণা করে থাকেন। ক্ষতি হলে বা মুনাফা না হলে বোনাস ঘোষণা করেন না। কিন্তু, এমন কিছু বীমাপত্র রয়েছে যাতে বীমাচুক্তি করার সময়েই বোনাস প্রদানের প্রতিশ্রুতি থাকে লাভ ক্ষতি যাই হোক না কেন। এ জাতীয় বোনাসকে প্রতিশ্রুত বোনাস বলা হয়।

এ ধরনের ব্যবস্থায় প্রতি বছর নির্দিষ্ট হারে বোনাস প্রদানের অঙ্গীকার থাকে বলে আগেই জানা যায় যে, বীমাগ্রহীতা মেয়াদ পর্যন্ত বেঁচে থাকলে মোট কত টাকা পাবেন। উল্লেখ্য যে, বীমাগ্রহীতা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই মারা গেলে বীমাপত্র যত বছর চালু ছিল তার প্রতিটি বছরের প্রতিশ্রুত বোনাসসহ বীমাকৃত টাকা তার উত্তরাধিকারীকে দেয়া হয়।

(চ) টনটাইন বোনাস (Tontine Bonus) : এ ব্যবস্থায় বীমাপত্র চালু হওয়ার কয়েক বছর পর্যন্ত বোনাস প্রদান স্থগিত থাকে। উক্ত নির্দিষ্ট কয়েক বছর অতিক্রান্ত হলে এবং বীমাগ্রহীতা তদবধি বেঁচে থাকলে এ বোনাস প্রদান করা হয়। আর, বীমাগ্রহীতা উরু নির্দিষ্ট সময় শেষ না হতেই মারা গেলে তার উত্তরাধিকারী বা মনোনীত ব্যক্তি তা দাবী করতে পারেন না। এ ধরনের বোনাস ব্যবস্থা যদিও আমাদের দেশে চালু নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই এর প্রচলন বেশী।

(ড) সুদে জমাকৃত বোনাস (Accumulation at Interest Bonus) : এ ব্যবস্থায় বীমাপত্রের উপর বন্টিত বা প্রদত্ত বোনাস বীমাগ্রহীতা বীমাকারীর কাছে জমা করে রাখেন। বীমাকারী তার উপর নির্দিষ্ট হারে সুদ প্রদান করেন। রীমাগ্রহীতা যে কোন সময় উক্ত সুদযুক্ত জমাকৃত অর্থ তুলে নিতে পারেন অথবা ভবিষ্যৎ বীমাকিত্তি পরিশোধে ব্যবহার করতে পারেন।

(এ) মেয়াদী ব্যবস্থায় বোনাস ( Bonus at Endowment Option) : এ ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট সুদ প্রদানের চুক্তিতে বীমাকারীর কাছে বোনাসের টাকা জমা হতে থাকে এবং যদি জমাকৃত টাকার পরিমান বীমাকৃত অর্থের সমান হয়ে যায়, তাহলে মেয়াদ পূর্তির আগেই বীমাকৃত অর্থ পরিশোধিত হয়।

মোট কথা,দিন যতই যাচ্ছে প্রতিযোগিতার কারণে, ততই নতুন নতুন ব্যবস্থার প্রচলন হচ্ছে। তবে, মোটামুটিভাবে উপরের আলোচিত বোনাস ব্যবস্থাগুলোই মূলতঃ এ যাবৎ প্রচলিত রয়েছে।

Leave a Comment