হংকংয়ের প্রধান পর্যটন আকর্ষণ ও ঐতিহাসিক ল্যান্ডমার্ক ‘ভিক্টোরিয়া পিক’ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এক নজিরবিহীন প্রাকৃতিক সংকটের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিমা প্রতিষ্ঠান এইচডিআই গ্লোবাল (HDI Global)-এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এইচডিআই রিস্ক কনসাল্টিং সম্প্রতি তাদের ‘আইকনিক ল্যান্ডমার্ক সিরিজ’-এর আওতায় এই বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এবং তীব্র বৃষ্টিপাতের কারণে ভিক্টোরিয়া পিকের বর্তমান সুরক্ষা অবকাঠামো ভবিষ্যতে অকার্যকর হয়ে পড়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে। উন্নত ডাটা-ড্রাইভেন মডেলিং ব্যবহার করে বিশেষজ্ঞরা দেখিয়েছেন যে, এই পর্যটন কেন্দ্রের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন আর প্রচলিত ঐতিহাসিক সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি ও ভূমিধসের ক্রমবর্ধমান হুমকি
প্রতি বছর প্রায় ৭০ লক্ষ পর্যটক ভিক্টোরিয়া পিক ভ্রমণ করেন, যা হংকংয়ের পর্যটন খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এইচডিআই-এর প্রতিবেদনে এই অঞ্চলের উত্তর ঢালের ভূতাত্ত্বিক গঠন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। গবেষণায় প্রাপ্ত প্রধান তথ্যগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
শিলাস্তরের দুর্বলতা: ভিক্টোরিয়া পিকের উত্তর ঢাল মূলত ‘আবহাওয়াগ্রস্ত গ্রানাইট’ (Weathered Granite) শিলা দ্বারা গঠিত। এই ধরণের শিলা যখন অতিবৃষ্টির কারণে পানি দ্বারা সম্পৃক্ত হয়ে যায়, তখন তা দ্রুত অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে এবং ভয়াবহ ভূমিধসের পথ প্রশস্ত করে।
রেকর্ডভাঙা বৃষ্টিপাত: ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হংকংয়ে প্রতি ঘণ্টায় ১৫৮.১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ ধরণের চরম বৃষ্টিপাতের পুনরাবৃত্তি বিদ্যমান সুরক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা: ১৯৭০-এর দশক থেকে হংকং সরকার নিরলস প্রচেষ্টায় এই অঞ্চলে ভূমিধসের ঝুঁকি ৭৫ শতাংশের বেশি কমিয়ে আনতে সক্ষম হলেও, বর্তমান ও ভবিষ্যতের চরম আবহাওয়া এই বিদ্যমান প্রতিরক্ষা প্রাচীরগুলোকে সহজেই অতিক্রম বা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
তাপপ্রবাহ ও বাস্তুসংস্থানের ভবিষ্যৎ বিপর্যয়
প্রতিবেদনে কেবল বৃষ্টিপাত নয়, বরং ক্রমবর্ধমান ‘হিট স্ট্রেস’ বা তাপপ্রবাহ সম্পর্কেও একটি ভয়াবহ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী:
১. তাপমাত্রার ঊর্ধ্বগতি: বর্তমান নির্গমন পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে (Business as usual scenario), ২১০০ সাল নাগাদ ভিক্টোরিয়া পিকের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪১.২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। ২. বাস্তুসংস্থানিক ভারসাম্যহীনতা: অতিরিক্ত তাপের ফলে উপ-ক্রান্তীয় অঞ্চলের গাছপালা সময়ের আগেই পাতা হারিয়ে ফেলবে (Defoliation)। ঝরে পড়া এই শুকনো পাতাগুলো শুষ্ক মৌসুমে আগুনের জ্বালানি হিসেবে কাজ করবে, যা এলাকাটিতে ভয়াবহ দাবানলের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। ৩. পর্যটন ও জনস্বাস্থ্য সংকট: অসহনীয় তাপের কারণে দর্শনার্থীদের আচরণে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। পর্যটকরা তখন দিনের মধ্যভাগের পরিবর্তে কেবল শীতল সকাল বা সন্ধ্যার ওপর নির্ভর করবেন। এছাড়া খাড়া পাহাড়ি পথগুলোতে অতিরিক্ত তাপে হিট স্ট্রোকসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তীব্র আকার ধারণ করবে।
কাঠামোগত স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা কৌশল
এইচডিআই গ্লোবাল হংকং-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) মাইকেল আন মনে করেন, সম্ভাব্য এই বিপদগুলো আগেভাগে শনাক্ত করা হংকংয়ের জন্য একটি বড় সুযোগ। তাঁর মতে, বড় কোনো বিপর্যয় ঘটার আগেই যদি এই তথ্যগুলোর ভিত্তিতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সংস্কার করা যায়, তবে ভিক্টোরিয়া পিকের সহনশীলতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।
বিমা শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, হংকংয়ের ঢাল সুরক্ষা ব্যবস্থা (Slope Protection) বৈশ্বিক মানে অত্যন্ত উন্নত হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান গতি সেই নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। পিকের উত্তর ঢালের গ্রানাইট স্তরের ওপর বিশেষ নজরদারি বাড়ানো এবং অত্যাধুনিক রিয়েল-টাইম মনিটরিং সিস্টেমের উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি। নীতিনির্ধারকদের কেবল প্রকৌশলগত সমাধান নয়, বরং পরিবেশগত সুরক্ষার দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
