ভারতে সাধারণ বীমা খাতের প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ধারায় অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে দেশটির সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোর মোট প্রত্যক্ষ প্রিমিয়াম আয় আগের বছরের একই সময়ের (মে ২০২৫) তুলনায় ৮.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে সামগ্রিক প্রিমিয়াম আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪,১৯৪ কোটি ৫৬ লাখ রুপিতে। ভারতের জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কাউন্সিলের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনশীলতা সত্ত্বেও ভোক্তাদের মাঝে ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বীমার আওতা সম্প্রসারণে সরকারের বিভিন্ন কার্যকর উদ্যোগ এই প্রবৃদ্ধিকে তরান্বিত করতে মূল ভূমিকা পালন করেছে।
মে মাসে সাধারণ বীমা খাতের এই অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে স্বাস্থ্য বীমা খাত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই বিশেষ খাতটি সমগ্র সাধারণ বীমা শিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহত্তম অংশে পরিণত হয়েছে। মে মাসে স্বতন্ত্র স্বাস্থ্য বীমা কোম্পানিগুলোর প্রিমিয়াম আয় বার্ষিক ভিত্তিতে ৩১.৭৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩,৮৪২ কোটি ৪১ লাখ রুপিতে দাঁড়িয়েছে। কোভিড-পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি, চিকিৎসা ব্যয়ের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতি, নগদবিহীন (ক্যাশলেস) চিকিৎসা ব্যয় নিষ্পত্তি সুবিধা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সহজে বীমা গ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধির কারণে স্বাস্থ্য বীমার চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
অন্য দিকে, সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোর প্রিমিয়াম আয় ৫.৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০,৩৪৫ কোটি ৯০ লাখ রুপিতে পৌঁছেছে। এতে খাতটির বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রবৃদ্ধির হারের একটি স্পষ্ট পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়েছে। প্রধান বীমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠান আইসিআইসিআই লোম্বার্ড উল্লেখযোগ্য সাফল্য প্রদর্শন করেছে। কোম্পানিটির প্রিমিয়াম আয় ১১.৫৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২,৪০৫ কোটি ৩ লাখ রুপিতে দাঁড়িয়েছে। বহুমুখী পণ্যসেবা এবং শক্তিশালী বিপণন নেটওয়ার্ক তাদের এই প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। এর বিপরীতে, ভারতের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বীমা প্রতিষ্ঠান নিউ ইন্ডিয়া অ্যাস্যুরেন্সের প্রিমিয়াম আয় মাত্র ০.০৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২,৯৪৫ কোটি ৬৪ লাখ রুপিতে পৌঁছেছে, যা সামগ্রিক বাজার সম্প্রসারণের মধ্যেও সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ওপর বেসরকারি খাতের প্রতিযোগিতামূলক চাপ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
চলতি অর্থবছরের এপ্রিল-মে সময়কালে সাধারণ বীমা খাতের মোট প্রিমিয়াম আয় ৬.৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫৯,৬১২ কোটি ৯০ লাখ রুপিতে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে স্বতন্ত্র স্বাস্থ্য বীমা কোম্পানিগুলোর আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৪.০৩ শতাংশ। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বীমা সুরক্ষার আওতা বাড়ানো, নতুন পণ্য উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণে সরকারের উদ্যোগের ফলে পুরো অর্থবছরজুড়েই এক অঙ্কের উচ্চ প্রবৃদ্ধি (হাই সিঙ্গেল-ডিজিট গ্রোথ) বজায় থাকতে পারে।
ভারতের সাধারণ বীমা বাজারে স্বাস্থ্য বীমা এখন মোটর বীমাকেও ছাড়িয়ে শীর্ষ খাতে পরিণত হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কারের ফলে বীমা সুরক্ষার পরিধি বৃদ্ধি, পূর্ববর্তী রোগের ক্ষেত্রে অপেক্ষার সময় (ওয়েটিং পিরিয়ড) কমানো এবং প্রবীণ ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য বীমা আরও সহজলভ্য হওয়ায় এ খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। তবে মোটর বীমা এখনও সাধারণ বীমা খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে রয়েছে। তৃতীয় পক্ষের দায়বদ্ধতা (থার্ড-পার্টি লাই্যাবিলিটি) বীমা বাধ্যতামূলক হওয়া এবং বাজারে যানবাহন বিক্রি বৃদ্ধি, বিশেষ করে বৈদ্যুতিক যানবাহনের (ইভি) প্রসার এই খাতকে শক্তিশালী অবস্থানে রেখেছে। এ ছাড়া অগ্নি, সামুদ্রিক ও প্রকৌশল বীমার মতো বাণিজ্যিক খাতগুলোও ঝুঁকিভিত্তিক মূল্য নির্ধারণে অধিক স্বাধীনতা পাওয়ায় ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে।
মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ণ এবং আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক উভয় পর্যায়েই বীমা গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও অনলাইন বীমা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের জন্য বীমা গ্রহণকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করে তুলেছে। তবে এই খাতের সামনে চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি, পরিণত বাজারে তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতা এবং দাবি ব্যবস্থাপনার (ক্লেম ম্যানেজমেন্ট) দক্ষতা উন্নয়নের মতো কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে, যা লাভজনকতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভারতের বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইআরডিএআই (IRDAI) গ্রাহক সুরক্ষা, অভিযোগ নিষ্পত্তি, উদ্ভাবন উৎসাহ এবং কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি অব্যাহত রেখেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অন্যান্য অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে আর্থিক সুরক্ষা জোরদার করার পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়নসহ উৎপাদনশীল খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে ভারতের এই সাধারণ বীমা খাতের প্রবৃদ্ধি আগামী বছরগুলোতেও সহায়ক হবে।
ভারতে সাধারণ বীমা খাতের প্রিমিয়াম আয়ের তুলনামূলক চিত্র
| বীমা খাতের বিবরণ / প্রতিষ্ঠানের নাম | মে ২০২৬-এ প্রিমিয়াম আয় (কোটি রুপিতে) | বার্ষিক প্রবৃদ্ধি / পরিবর্তনের হার (%) | এপ্রিল-মে ২০২৬ (চলতি অর্থবছর) প্রবৃদ্ধি |
| সমগ্র সাধারণ বীমা খাত | ২৪,১৯৪.৫৬ | +৮.৭0% | +৬.৭৫% |
| স্বতন্ত্র স্বাস্থ্য বীমা কোম্পানি | ৩,৮৪২.৪১ | +৩১.৭৪% | +৩৪.০৩% |
| সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলো | ২০,৩৪৫.৯০ | +৫.৮৫% | — |
| আইসিআইসিআই লোম্বার্ড (বেসরকারি) | ২,৪০৫.০৩ | +১১.৫৯% | — |
| নিউ ইন্ডিয়া অ্যাস্যুরেন্স (সরকারি) | ২,৯৪৫.৬৪ | +০.০৩% | — |
