মূল্যায়নের কৌশল

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় মূল্যায়নের কৌশল যা জীবন বীমা অধ্যায়ের অর্ন্তভুক্ত।। মূল্যায়নের কৌশল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে মূল্যায়ন একটি পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ত নির্ভর বিবরণী-ভিত্তিক কার্য-ব্যবস্থা যা বেশ জটিলতাপূর্ণ ও বিশেষায়িত দক্ষতা প্রয়োগের অবকাশ রাখে। তবে, এ ব্যাপারে প্রাতিষ্ঠানিক প্রাক-আয়োজন যতটা সুষ্ঠু ও সুবিন্যস্ত হয়, ততই মূল্যায়নের কৌশল প্রত্যাশিত ও কার্যকর হয়। মূল্যায়ন যে সব পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়ে থাকে সংক্ষেপে নিম্নে বর্ণিত হলো :-

Table of Contents

মূল্যায়নের কৌশল

 

মূল্যায়নের কৌশল

 

১। প্রাতিষ্ঠানিক নীট দায় হিসেব করা (To calculate the net Liabilities of the concern) : বীমাকারী প্রথমেই প্রাতিষ্ঠানিক নাত দ নিরূপণ করবেন। কেননা,মূল্যায়নের কৌশল সম্পন্ন করতে এটি অন্যতম উপাদান বা দফা। বীমাগ্রহীতাদের বীমাদানী হলো বীমাকারীর দায়। বীমাগ্রহীতাদের প্রদত্ত বা প্রদেয় সেলামী থেকে উক্ত দায় বাদ দিলেই নীট দায় পাওয়া যায়।

তবে, মূল্যায়নের দু’টি পদ্ধতি রয়েছে। যথা : – (১) মূল্যায়নের পশ্চাদ- বিবেচনা বা অতীত পদ্ধতি (Retrospective Method of Valuation) (২) মূল্যায়নের ভবিষ্যৎ বিবেচনা বা ভবিষ্যৎ পদ্ধতি (Prospective method of Valuation)। তবে, প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে – মূল্যায়ন সঞ্চিতি হিসেবের মতই প্রায় করা হয় বটে, কিন্তু তা হিসেবে করার ক্ষেত্রে কিছু পার্থক্য স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যমান।

যেমন: – সঞ্চিতি হিসেব করা হয় নীট প্রিমিয়ামের উপর ভিত্তি করে কিন্তু, বীমা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সচ্ছলতা নিরূপণ তথা মূল্যায়ন সম্পন্ন করতে মোট প্রিমিয়ামের প্রয়োজন হয় যা শুধু মৃত্যুহার ও সুদকেই হিসেবভুক্ত করে না, বরং খরচাবলীকে অন্তর্ভুক্ত করে ধার্য্য করা হয়। নিম্নে মূল্যায়নের উক্ত পদ্ধতি দু’টি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়া হলো :-

(ক) ভবিষ্যৎ বা সম্মুখ বিবেচনা পদ্ধতি (Prospective method) : এ পদ্ধতিতে স্বভাবতঃই ভবিষ্যতে প্রাপ্য বা প্রদেয় আর্থিক বিষয় ও তথ্যাবলীর উপর নির্ভর করে হিসেব করা হয়। এ ক্ষেত্রে দায় খাতে ভবিষ্যতে প্রদেয় বীমাকৃত অর্থ বা বীমাদাবীর বর্তমান মূল্য এবং সম্পদ-সম্পত্তি খাতে ভবিষ্যতে প্রাপ্য বীমাকিস্তির বর্তমান মূল্য নির্ধারণ পূর্বক হিসেব করলে অথবা তাদের মধ্যে পার্থক্য তথা উদ্বৃত্ত বের দেখা যাবে যে, সম্পদ খাতের চেয়ে দায় খাত অধিক হবে বা সম্পদের উপর দায়ের উদ্বৃত্ত থাকবে যাকে নীট দায় (Net Liabilities) অভিহিত করা হয়।

অতঃপর সংশ্লিষ্ট বীমা প্রতিষ্ঠানের এ যাবৎ সৃষ্ট সঞ্চিতি (Reserve) তথা তহবিল (Fund) এর সাথে উক্ত নীট দায়ের পার্থক্য বের করতে হবে। সেক্ষেত্রে, যদি দেখা যায় যে, তহবিল অপেক্ষা নীটদায় বা উক্ত উদ্বৃত্ত কম, বুঝা যাবে যে – লাভজনকভাবে ব্যবসায় পরিচালনা করছে আর, যদি দেখা যায় যে, তহবিল নাট দায় অপেক্ষা কম, তাহলে বুঝা যাবে প্রতিষ্ঠানটি লোকসানগ্রস্ত হচ্ছে।

উপরোক্ত বিবরণীতে দেখা যাচ্ছে যে, তহবিল ও নীট দায়ের উদ্বৃত্ত সমান। সুতরাং, এক্ষেত্রে ঘাটতিও নেই বাড়তিও নেই; অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠানটি হিসেব বর্ষটিতে লাভ বা লোকসান কোনটিই হয়নি। এরূপ ভবিষ্যৎ দৃষ্টে হিসেব করা হয় বলে এ পদ্ধতিকে ভবিষ্যৎ বিবেচনা পদ্ধতি বলা হয়।

(খ) অতীত বা পশ্চাদ-বিবেচনা পদ্ধতি (Retrospective method) : এ ক্ষেত্রে অতীত তথ্যাবলীর উপর নির্ভর করে মূল্যায়ন করা হয় বলেই এ পদ্ধতিকে অতীত বা পশ্চাদ – বিবেচনা পদ্ধতি নামে অভিহিত করা হয়। এ পদ্ধতিতে গৃহীত সমুদয় বীমাকিস্তি ও তার উপর অর্জিত সুদ এবং প্রদেয় বীমাদাবী হিসেব করে যথাক্রমে সম্পদ ও দায় বের করতে হয়।

অতঃপর তাদের মধ্যে পার্থক্য করলে সঞ্চিতি বের হবে। কিন্তু, প্রকৃত সঞ্চয়কৃত তহবিল উক্ত ধার্যকৃত (assumed) সঞ্চিতি অপেক্ষা বেশী হওয়াই প্রত্যাশিত। কেননা, তাহলেই শুধু প্রতিষ্ঠানটি লাভজনকভাবে চলছে বলে ধরা যাবে; অন্যথায়, সংশ্লিষ্ট বীমা প্রতিষ্ঠানটি তার দায় মিটাতে সক্ষম হবে না এবং তা অসচ্ছল বলে বিবেচিত হবে।

 

[এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, যখন ঘাটতি দেখা দেয়, তখন বীমাকারীকে কতিপয় শক্ত পদক্ষেপ নিতে হয়; যেমন – খরচ কমানো, লাভজনক বিনিয়োগ বেছে নেয়া, বোনাস ঘোষণা না করা এমনকি, বীমাকিস্তি বা সেলামীর হার বাড়িয়ে দেয়া ইত্যাদি। তবে, বীমাসেলামী বাড়ালে আবার কারবারে অবনতি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়।

পক্ষান্তরে, বাড়তি বা উদ্বৃত্ত (Surplus) হলে তা কিছু কিছু সঞ্চয় সৃষ্টি বা সংরক্ষণ পূর্বক বীমাগ্রহীতা ও শেয়ারগ্রহীতাদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়া যেতে পারে। সাধারণ আকস্মিক দুর্যোগ তহবিল (General Contingency Fund) লভ্যাংশ সম-রক্ষ বা সমীকরণ তহবিল (Dividend Equalisation Fund) আয়কর তহবিল ইত্যাদি খাতে উক্ত বাড়তি বা উদ্বৃত্ত সঞ্চয় করা হয়।]

২। জীবন বীমার তহবিল হিসেব করা (To calculate the life insurance fund) : জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব বা আয়-ব্যয় সংক্রান্ত হিসেব থেকেই ইহার তহবিল বের করা হয়। বীমা প্রতিষ্ঠানের আয় ব্যয় হিসেব (Revenue Account) – এর ক্রেডিট পাশের উপরেই হিসেব-কালের পূর্ববর্তী তহবিল সন্নিবিষ্ট করা হয়।

এছাড়া, হিসেবের সময়কার বীমাকিস্তি, সুদ, প্রাপ্য ভাড়া ইত্যাদি সহ সকল আয় ক্রেডিট পাশে এবং বীমাদাবী, বৃত্তি, ব্যবস্থাপনা খরচ ইত্যাদি সহ সকল পরিশোধসমূহ ডেবিট পাশে সন্নিবিষ্ট করা হয়। ক্রেডিট ও ডেবিট পাশের পার্থক্যই স্বভাবতঃ বীমা তহবিল নির্দেশ করে।

অর্থাৎ ব্যয়ের উপর আয়ের আধিক্যই বীমা প্রতিষ্ঠানের তহবিল। এ থেকেই অনুমেয় যে, জীবনবীমার তহবিল— জীবন বীমা সঞ্চিতি এক নয়। তহবিল বলতে বীমাকারীর প্রকৃতপক্ষেই যে পরিমান অর্থ রয়েছে তা বুঝায়; পক্ষান্তরে, সঞ্চিতি বলতে বীমাকারীর নটি দায়কেই বুঝায়।

৩। বীমা তহবিলের সাথে নীট দায়ের তুলনা তথা পার্থক্য নির্দেশ করা (To compare the Net Liability with the Life Insurance Fund) : বীমা প্রতিষ্ঠানের নীট দায় ও বীমা তহবিল বের করার পর এ পর্যায়ে তাদের মধ্যে তুলনা তথা পার্থক্য বের করতে হয়। তুলনা বা পার্থক্য করার ফলাফল হিসেবে বাড়তি (Surplus) অথবা ঘাটতি (Deficiency) বেরিয়ে আসে।

যদি দায়ের চেয়ে তহবিলের আধিক্য থাকে, তাহলে তাকে বাড়তি (Surplus) বলে এবং যদি তহবিলের উপর দায়ের আধিক্য হয়, তাহলে তাকে ঘাটতি (Deficiency) বলা হয়।যেসব বিষয়ের উপর নির্ভর করে নীট দায় বের করতে হয় তা হলো :

১। বীমাগ্রহীতাদের মৃত্যুহার,

২। বীমাকিত্তি বা সেলামীর উপর ধার্য্যকৃত সুদের হার,

৩। যথার্যভাবে হিসেবভুক্ত ও পূর্বানুমিত খরচের হার এবং

৪। মুনাফায় অংশগ্রহণকারী বীমাপত্রের উপর চুক্তি মোতাবেক প্রদেয় বোনাস।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে বীমাকারী বীমা কিস্তি হিসেব করার সময় মৃত্যুহার, সুদ, খরচ ও বোনাস-এর অতীত অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে থাকেন।

কিন্তু, মৃত্যুহার, সুদ, খরচ ও বোনাস-এর ভবিষৎ বিবেচনায়ই নীটদায়ের মূল্যায়ন হওয়া উচিৎ। তা না হলে নীটদায় হিসেবে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে অধিকতর। সর্বোপরি, নীটদায় অতীতকে ইঙ্গিত করে না; বরং, ভবিষ্যৎ প্রেক্ষিতকে বুঝায়।]

পরিশেষে, প্রণিধানযোগ্য যে, বীমা আইন মোতাবেক প্রতিটি বীমা প্রতিষ্ঠানে প্রতি তিন বছর মেয়াদকালে একবার মূল্যায়ন সম্পন্ন করতে হবে। তবে, এক বছর অন্তরই সাধারণতঃ বীমা প্রতিষ্ঠানে মূল্যায়ন করা হয়। নীট দায় নিরূপণ তথা মূল্যায়ন একটি সুকঠিন প্রক্রিয়া বিধায় প্রতি বছর সম্পন্ন করা সম্ভব নয় বলেই এরূপ সংবিধি প্রনীত ও অনুসৃত হয়।

যেসব কারণে বীমা কোম্পানীসমূহ মূল্যায়নের ভবিষ্যৎ পন্থা বা প্রস্পেকটিভ পদ্ধতি পছন্দ করে নিম্নে তা উল্লেখ করা হলো : –

[প্রশ্নোত্তরটির পূর্বাভাষে উল্লেখ্য যে, বীমা প্রতিষ্ঠানসমূহ প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন সাধারণতঃ দু’টি উদ্দেশ্যে করে থাকে। যথা : –

(১) বীমা প্রতিষ্ঠানের দায় পরিশোধের জন্যে পর্যাপ্ত আর্থিক সামর্থ্য বা তহবিল আছে কিনা তা দেখার জন্যে এবং

(২) প্রাতিষ্ঠানিক লাভ-ক্ষতি নির্ণয় করে যাতে ভবিষ্যতে গতিধারা বা কর্মকাণ্ডের সঠিকপরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রণ ত্বরান্বিত এবং সম্ভবপর করা যায়।

এ প্রসঙ্গে আরও উল্লেখ্য যে, মূল্যায়নের দু’টি পদ্ধতি রয়েছে। যথা : – (3) অতীত পদ্ধতি Retrospective method of valuation) এবং (২) ভবিষ্যৎ পদ্ধতি (Prospective method of valuation)।

অতীত পদ্ধতিতে অতীতে কি পরিমাণ প্রিমিয়াম পাওয়া গিয়েছে এবং ধার্য্যকৃত সুদ যুক্ত হয়ে যা হয়েছে (বীমাকারীর) তা থেকে পরিশোধিত বীমা দাবী বাদ দিয়ে যা থাকে তাই হচ্ছে ফলাফল। পক্ষান্তরে, ভবিষ্যৎ পন্থায় একই বিষয়সমূহের ভবিষ্যৎ প্রাপ্য ও প্রদেয় অর্থের পরিমাণের পার্থক্যই ফলাফল।

 

মূল্যায়নের কৌশল

 

সুতরাং, এখন প্রতিপাদ্য বিষয়ের বিশ্লেষণ ও বর্ণনা নিম্নরূপ প্রদান করা যায়। অর্থাৎ, নিম্ন বর্ণিত কারণে বীমাকারীগণ মূল্যায়নের ভবিষ্যৎ পদ্ধতিটি পছন্দ করে থাকেন:-

১। মূল্যায়নের ভবিষ্যৎ পদ্ধতিতে (In case of prospective method of Valuation) অতীত অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় রেখে বর্তমানকে নির্ভর করে ভবিষ্যতে প্রাপ্য ও প্রদেয় অর্থের যতটা সঠিক পরিমান অপরিহার্য এবং উপযোগী হতে পারে অতীত পদ্ধতিটি ঠিক ততটা উপযোগী না হওয়াটাই স্বাভাবিক।

২. ভবিষ্যৎ পদ্ধতি অনুসরণে বীমাকারী তার ভবিষ্যৎ আর্থিক প্রতিরক্ষা ও লাভালাভের বিষয়টি অধিকতর সক্রিয়তায় সংহত করার চেষ্টা করতে পারেন।

মূলতঃ উপরোক্ত কারণেই বীমাকারীগণ মূল্যায়নের ভবিষ্যৎ পদ্ধতিটি বেশী পছন্দ করে থাকেন। কেননা, তার নিজস্ব স্বার্থটি এ পন্থায় অধিকতর অর্জিত ও সংহত হওয়ার সুযোগ থাকে। তবে, প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, এতদ্‌সত্ত্বেও যে বীমাকারীর স্বার্থ আদৌ বিঘ্নিত হওয়ার অবকাশ থাকে না তা নয়। যদি এমন হয় যে, ভবিষ্যৎ মৃত্যুহার সম্পর্কে যা ধারণা করা হয়েছিল।

কোন অভাবিত কারণে তা হঠাৎ করেই বেড়ে গিয়ে বীমাকারীকে অধিক ব্যয়ের সম্মুখীন হতে হলো – তা হলেতো প্রতিকূল ফল অনিবার্য। সেক্ষেত্রেও ‘বলা থাকে এই যে – এটি তো স্বাভাবিক ফলশ্রুতি নয়। সুতরাং, সঠিক ফলাফল বিবেচনায় বলা যায় যে ভবিষ্যৎ পন্থাটিই বীমাকারীদের জন্যে অধিক সহায়ক বলে অধিক পছন্দনীয়।

Leave a Comment