মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সামরিক সংঘাতের প্রভাব সরাসরি আছড়ে পড়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিতে। এই জলপথকে ঘিরে অস্থিরতা বৃদ্ধির ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যে এক নজিরবিহীন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তেলবাহী ট্যাঙ্কারের ভাড়া বৃদ্ধি, যুদ্ধঝুঁকি বীমার আকাশচুম্বী প্রিমিয়াম এবং লজিস্টিক জটিলতায় এখন দিশেহারা বৈশ্বিক বাজার। বিশেষ করে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও ট্রানশিপমেন্ট কেন্দ্র হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) বর্তমানে বহুমুখী চাপের মুখে রয়েছে।
Table of Contents
তেলের ট্যাঙ্কার ভাড়া ও পরিবহন ব্যয়ের চিত্র
নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়ামুখী তেলবাহী ট্যাঙ্কার বা ‘ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার’ (VLCC)-এর চার্টার ভাড়া দ্রুত বাড়ছে। আন্তর্জাতিক ট্যাঙ্কার ভাড়ার সূচক ‘ওয়ার্ল্ডস্কেল’ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এই ভাড়া আগের তুলনায় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রধান কারণ হলো জাহাজ মালিকরা তাদের ক্রু এবং সম্পদের নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি নিতে নারাজ। ফলে পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপে তেল পরিবহনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতির নতুন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হরমুজ সংকটে সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর প্রভাব
| বিষয়ের বিবরণ | সংকটের আগের অবস্থা | বর্তমান সংকটের প্রভাব |
| যুদ্ধঝুঁকি বীমা প্রিমিয়াম | জাহাজের মূল্যের প্রায় ০.২৫% | ৫০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। |
| জাহাজ চলাচলের গতি | স্বাভাবিক ও নিরবচ্ছিন্ন | ১৫০+ ট্যাঙ্কার অপেক্ষমাণ ও রুট পরিবর্তন। |
| জ্বালানি রপ্তানি (হরমুজ) | বিশ্বের মোট সামুদ্রিক তেলের ১/৫ অংশ | ট্যাঙ্কার চলাচল প্রায় ৯০% কমেছে। |
| শিপিং রুট | সংক্ষিপ্ত ও সরাসরি রুট | দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল বিকল্প রুট ব্যবহার। |
| বীমা খরচ (১০০ মিলিয়ন ডলারে) | প্রতি ভ্রমণে ২,৫০,০০০ ডলার | ৩,৭৫,০০০ ডলার বা তারও বেশি। |
বীমা বাজারে অস্থিরতা ও প্রিমিয়াম বৃদ্ধি
হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের জন্য সামুদ্রিক বীমা বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। অধিকাংশ বীমা কোম্পানি এখন এই অঞ্চলকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বীমা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘মার্শ’-এর মতে, আগে যেখানে একটি ১০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের জাহাজের জন্য বীমা খরচ ছিল ২.৫ লাখ ডলার, তা এখন ৩.৭৫ লাখ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। অনেক বীমা প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে উপসাগরীয় জলসীমায় চলাচলকারী জাহাজের জন্য কভার বাতিল করেছে অথবা দাবি মেটানোর ক্ষেত্রে কঠিন শর্ত জুড়ে দিচ্ছে।
জাহাজের জট ও লজিস্টিক সংকট
রয়টার্স এবং বিভিন্ন সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৫০টির বেশি তেল ও এলএনজি ট্যাঙ্কার বর্তমানে হরমুজ প্রণালির আশপাশে নোঙর করে নিরাপদ নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে। জাহাজগুলো হয় উপসাগরে প্রবেশ করতে ভয় পাচ্ছে, অথবা প্রণালির ভেতরে থাকা জাহাজগুলো বাইরে বের হতে পারছে না। এর ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটছে। লজিস্টিক চাপ বাড়ায় জাহাজে অবস্থানরত নাবিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি ও মানসিক চাপও চরমে পৌঁছেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর বহুমুখী চাপ
আঞ্চলিক জ্বালানি এবং ট্রানশিপমেন্ট হাব হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাত এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশটির আবুধাবি থেকে ফুজাইরাহ পর্যন্ত বিস্তৃত ‘হাবশান-ফুজাইরাহ’ পাইপলাইনটি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে প্রতিদিন প্রায় ১.৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহনের সক্ষমতা রাখলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। এছাড়া দুবাইয়ের জেবেল আলি ও খোর ফাক্কান বন্দরের মতো বড় ট্রানশিপমেন্ট কেন্দ্রগুলো এখন কনটেইনার পরিবহনের বিলম্ব ও অতিরিক্ত খরচের মুখে পড়েছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি ও মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা
বিশ্বের মোট সামুদ্রিক তেল পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ এবং এলএনজির একটি বিশাল অংশ এই প্রণালি দিয়ে যায়। যদি এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য থেকে রপ্তানি হওয়া অ্যালুমিনিয়াম ও সারের বাজারেও টান পড়বে, যা কৃষি ও শিল্প উৎপাদনকে ব্যাহত করবে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় প্রশ্ন হলো—এই নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং অস্বাভাবিক বীমা ব্যয়ের সংকট কতদিন স্থায়ী হবে এবং বিশ্ব অর্থনীতি এই ধাক্কা সামলাতে কতটা প্রস্তুত।
