নিকটতম কারণ নীতি বা মতবাদ

নিকটতম কারণ নীতি বা মতবাদ – পাঠটি “বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা” বিষয়ের “বীমার মৌলিক ও সাধারণ আধেয়সমূহ” অধ্যায়ের একটি পাঠ। সম্পত্তি বীমা তথা ক্ষতিপুরণের (বীমা) চুক্তির মাধ্যমে যে সম্পত্তি বীমাকৃত হয় তার কোন ক্ষতি হলে বীমাকারী তা পূরণ করে দেন। কিন্তু, সব ক্ষতিরই ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয় না। ক্ষতি যে কারণে সংঘটিত হয়, তা যদি বীমাকৃত হয়ে থাকে, তবেই তার জন্যে বীমাকারী ক্ষতিপূরণ প্রদান করেন। [তবে, কারণ নির্ধারণের ব্যাপারটি বেশ জটিলতার অবকাশ রাখে। যেমনঃ

নিকটতম কারণ নীতি বা মতবাদ

 

নিকটতম কারণ নীতি বা মতবাদ | বীমার মৌলিক ও সাধারণ আধেয়সমূহ | বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা

 

(১) ক্ষতিটি যদি পরস্পর সংযুক্ত কতিপয় কারণে সঙ্ঘটিত হয় এবং তার কিছু কারণ বীমাকৃত থাকে আর কিছু কারণ বীমাকৃত না থাকে এরূপ ক্ষেত্রে – বীমাকারীকে ক্ষতিপূরণ দানের ব্যাপারে নিরূপণ করতে হয়, ক্ষতির কারণ/কারণসমূহ বা বিপদ/বিপদসমূহ বীমাকৃত কিনা। যদি দেখা যায় যে, উক্ত বিপদসমূহের এক বা একাধিক বীমাকৃত হয় আর এক বা একাধিক অবীমাকৃত থাকে, তাহলে নির্ধারণ করতে হয় ক্ষতির নিকটতম কারণ কোনটি এবং সেটি বীমাকৃত কিনা। কেননা, অবিবেচনাপ্রসূত ও অপরিকল্পিতভাবে ক্ষতিপূরণ দিতে থাকলেতো বীমা কারবারই টিকবে না। এক্ষেত্রে বীমাকৃত বিপদটি যদি ক্ষতির কারণ হয়, তাহলেই ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়; অন্যথায়, নয়।

(২) যদি বিচ্ছিন্ন কয়েকটি বিপদে ক্ষতি সাধিত হয় পর্যায়ক্রমিকভাবে এবং তার কিছু বিপদ বীমাকৃত এবং কিছু অবীমাকৃত থাকে তাহলেও একই কারণে সিদ্ধান্ত গ্র করতে হয়, কোন বিপদ থেকে কতটা ক্ষতি সাধিত হয়েছে। এক্ষেত্রে, বীমাকৃত কারণে যতটা ক্ষতি সাধিত হয়, ততটাই ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। কেননা, এক্ষেত্রে বিপদগুলি বিচ্ছিন্নভাবে ঘটায় ক্ষতি আলাদাভাবে নিরূপণ করা সবপর হয় এবং উপরোক ক্ষেত্র থেকে ক্ষতিপূরণ দানের নিয়মটি ভিন্নভাবে প্রযুক্ত হয়।

(৩) এছাড়া, অনেক ক্ষেত্রেই এমন হয় যে, দৃশ্যতঃ যে কারণে ক্ষতি হয়েছে বলে মনে হয়, সেটি মূল কারণ ছিলনা – মূল কারণ ছিল অন্যটি। যেমন:- জাহাজস্থ পন্য আগুন লেগে পুড়েছে। কিন্তু, আগুন লাগতে পারে কলকব্জার দুর্ঘটনার কারণে অথবা কোন অবহেলাজনিত বা শত্রুতাজনিত অগ্নিসংযোগে। এখন মুল যে কারণে আগুন লেগেছে সেটি বীমাকৃত কিনা তা বীমাকারীকে নিরূপণ করতে হবে। আবার, হতে পারে এমন যে, দৃশ্যতঃ যে কারণে ক্ষতি হয়েছে, সেটি বীমাকৃত নেই বটে। কিন্তু, মূল যে কারণে দুর্ঘটনা বা ক্ষতি সংঘটিত হয়েছে সেটি বীমাকৃত ছিল ।]

সুতরাং, বীমাকারী ক্ষতিপূরণ দানের ক্ষেত্রে অবশ্যই নিরূপণ করবেন যে, ক্ষতির কারণটি প্রত্যক্ষ বা নিকটতম কিনা। ক্ষতিপূরণ দানের ব্যাপারে নিকটতম কারণ নির্ধারণের এই যে নিয়ম বা নীতি অনুসৃত হয়, তাকেই বলা হয় “ক্ষতির নিকটতম বা অব্যবহিত কারণ নীতি বা মতবাদ। এ প্রসঙ্গে একটি প্রবিধি রয়েছে যে Sed causa proxima non-remota spectatur”- যার ইংরেজী হচ্ছে “See or look to the proximate cause and not to the remote cause.”- অর্থাৎ, দূরবর্তী কারণ নয়, নিকটতম কারণের দিকে তাকাও।

 

[ উক্ত প্রবিধিটির প্রয়োগ- ব্যাখ্যায় “Harold A. Turner & V.E. Robertson – এর “Insurance of Exports” গ্রন্থে একটি মোকদ্দমার প্রসঙ্গ উল্লেখিত হয়েছে। ঐ মোকদ্দমার বিবরনে জানা যায় যে, ১৯১৪, ১৮ সালে মহাযুদ্ধ চলাকালীন একটি জাহাজ পথিমধ্যে টর্পেডোর আঘাতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে কোনমতে গিয়ে বন্দর জেটিতে পৌঁছেছিল।

কিন্তু, জাহাজটি এতটা ক্ষতিগ্রস্ত ছিল যে, সেখানেই ডুবে যেয়ে অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারে – এই ভয়ে জাহাজটি বাইরের পোতাশ্রয়ে নিয়ে নোঙ্গর করতে নির্দেশ দেয়া হলো। সেখানে ভীড়তেই শুরু হলো প্রচণ্ড বাত্যা। ফলে, আঘাতে আঘাতে জাহাজের পেছনাংশ ভেঙ্গে গেল এবং জাহাজটি অবশেষে ডুবে গেল।

মোকদ্দমার রায়ে বলা হলো যে, জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার জন্যে যে কারণ-প্রবাহ দায়ী তা শুরু হয়েছিল টর্পেডোর আঘাত (যুদ্ধ-বিপদ /War peril) থেকে এবং তারই অনুগামী নিরবচ্ছিন্ন ঘটনা পরম্পরায় চূড়ান্ত পরিণতি ( সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হওয়া) প্রাপ্ত হয়। এর মধ্যে কোন ঘটনাচ্ছেদ ছিলনা এবং বিছন্নভাবে অন্য ঘটনার কারণে ক্ষতিগ্রপ্ত বা নিমজ্জিত হয় নি ; খারাপ আবহাওয়া ও ডুবে যাওয়া (সমুদ্র বিপদ / Marine peril) ছিল তার পরিণতি। সুতরাং, এক্ষেত্রে জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার নিকটতম কারণ ছিল টর্পেডোর আঘাত, খারাপ আবহাওয়া বা ভেঙ্গে যাওয়া অথবা ডুবে যাওয়া নয়।]

এম.এন. মিশ্র তাই বলেছেন – “Proximate Cause means the active efficient cause that sets in motion a train of events which brings about result, without intervention of any force started and working actively from a new and Independent source” – অর্থাৎ, নিকটতম কারণ বলতে এমন সক্রিয় ও ফলপ্রদ কোন কারণকে বুঝায় যা দুর্ঘটনা প্রবাহের সূত্রপাত করে এবং নতুন ও আলাদা কোন উৎস থেকে (সৃষ্ট) সক্রিয়ভাবে শুরুকৃত ও ক্রিয়াশীল কোন শক্তির মধ্যাগম (Intervention) ছাড়াই ফলাফল বা পরিণতি আনয়ন করে।

 

নিকটতম কারণ নীতি বা মতবাদ | বীমার মৌলিক ও সাধারণ আধেয়সমূহ | বীমা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা

 

মোটকথা, নিকটতম কারণ হলো এমন একটি সক্রিয় কারণ যা প্রকৃতপক্ষে দুর্ঘটনাটি ঘটায় অথবা কারণসমূহের মধ্যে সেই কারণ যা দুর্ঘটনার তথা ক্ষতির সূত্রপাত ঘটায় এবং কোন ব্যবচ্ছেদ ছাড়াই ঘটনা পরম্পরায় ফলাফল আনয়ন ক্ষতি সংঘটিত) করে। ক্ষতি সংঘটিত হলে বীমাকারী ক্ষতিপূরণ দানের আগে অবশ্যই এই নিকটতম কারণটি নিরূপণ করে নেন। অর্থাৎ, নিকটতম কারণটি বীমাকৃত থাকলেই ক্ষতিপুরণ প্রদান করা হয়। [ক্ষতিপূরণ প্রদান করার ব্যাপারে অনুসৃত এ নীতির সংজ্ঞা দান ও তাৎপর্য ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে উক্ত আলোচনা বিশ্লেষণ করলে এ নীতির আওতা সম্পর্কে নিম্নোক্ত ধারনাগুলি পাওয়া যায়ঃ —

(ক) বীমাগ্রহীতার ইচ্ছাকৃত অসদাচরণজনিত কোন ক্ষতি বীমাকারী পূরণ করে দিতে দায়বদ্ধ হন না, কিন্তু বীমাপত্রে বিপরীত মর্মে কোন ধারা উল্লেখিত না থাকলে ক্ষতির নিকটতম তথা বীমাকৃত কোন কারণে সৃষ্ট ক্ষতি (যা সংশ্লিষ্ট কারও অসদাচরণ বা অবহেলা সৃষ্ট নয়) বীমাকারী পুরণ করে দিতে বাধ্য থাকেন।

(খ) বীমাপত্রে বিপরীত মর্মে কোন উল্লেখ না থাকলে, পণ্য বোঝাইকরণ বা এরূপ কোন কাজে বিলম্বের কারণে যদি পণ্য বা সম্পত্তির কোন ক্ষতি সাধিত হয়, তাহলে ক্ষতির নিকটতম কারণ বীমাকৃত থাকলেও বীমাকারী ক্ষতিপূরণ প্রদানে দায়বদ্ধ হন না।

(গ) বীমাপত্রে বিপরীতভাবে কোন উল্লেখ না থাকলে, সাধারণ কোন ছেড়া-টুটা, সাধারণ ছিদ্র বা ভাঙ্গা-চুরা, বীমাকৃত বিষয় বস্তুর প্রকৃতিগত বা সহজাত ত্রুটির জন্য অথবা ইঁদুর বা কাঁটাদি দ্বারা সৃষ্ট ক্ষতির নিকটতম কোন কারণ অথবা নিকটতম কারণ নয়, সামুদ্রিক বিপত্তিজনিত জাহাজের কলকব্জার এরূপ কোন ক্ষতির জন্যে বীমাকারী ক্ষতিপূরণ দানে বাধ্য থাকেন না।

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, বীমাপত্র অনুযায়ী বীমাকৃত কোন বিপত্তির কারণে সম্পত্তির ক্ষতি সাধিত হয়েছে, তা প্রমান করার দায়িত্ব বীমাকারীর।

Leave a Comment