বিশ্বব্যাপী ইনসুরটেক খাতে বিনিয়োগ গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে। ২০১৭ সালের পর এ ধরনের বিনিয়োগ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে পরীক্ষামূলক প্রকল্পের পরিবর্তে কার্যকর বাস্তবায়ন এবং বাণিজ্যিক ফলাফল প্রদর্শনের ওপর জোর বেড়েছে। সিবি ইনসাইটসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই পরিবর্তনের চিত্র বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যা ইনসুরটেক খাতের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সাল হবে এমন একটি বছর যেখানে কেবল নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন নয়, বরং সেই প্রযুক্তির কার্যকর বাস্তবায়নই মূল প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠবে। বড় প্রতিষ্ঠিত বীমা সংস্থা—যেমন অ্যাভিভা, চাব্ব ও মেটলাইফ—নিজস্বভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সক্ষমতা তৈরি করছে। এর ফলে ইনসুরটেক স্টার্টআপগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে, কারণ তাদেরকে কেবল উদ্ভাবন নয়, বরং স্পষ্ট বাণিজ্যিক ফলাফলও প্রদর্শন করতে হবে।
বিনিয়োগকারীদের মনোভাবেও বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। আগে যেখানে পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি বা নতুন ধারণার উপর বিনিয়োগ বেশি হত, এখন অগ্রাধিকার পাচ্ছে সেই স্টার্টআপগুলো যারা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কার্যকর ফলাফল ও পরিমাপযোগ্য মুনাফা দিতে সক্ষম। বিশেষ করে এজেন্টিক এআই (agentic AI) ভিত্তিক ইনসুরটেক কোম্পানিগুলোর মধ্যে দ্রুত বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। শীর্ষ নয়টির মধ্যে সাতটি প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে।
এই প্রবণতা স্পষ্ট করে যে, বীমা কোম্পানি ও মধ্যস্থতাকারীরা এখন আর কেবল প্রযুক্তির পরীক্ষা-নিরীক্ষায় আগ্রহী নয়; তারা চায় এমন সমাধান যা দৈনন্দিন কার্যক্রমে সরাসরি প্রয়োগযোগ্য। ফলে “প্রয়োগযোগ্যতা” এখন ইনসুরটেক খাতের প্রধান সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে প্রাথমিক পর্যায়ের ইনসুরটেক কোম্পানিগুলোর জন্য অর্থায়ন সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ২০২৫ সালে চার বা তার বেশি ইনসুরটেক বিনিয়োগ করা বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ২০১৭ সালের পর সর্বনিম্নে নেমেছে। এটি নতুন স্টার্টআপগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। ২০২৫ সালের “ইনসুরটেক ৫০” তালিকার ৫০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সাতটি প্রতিষ্ঠান অক্টোবরের পর সম্মিলিতভাবে ২৯৮ মিলিয়ন ডলার তহবিল সংগ্রহ করেছে।
নিচের টেবিলে সাম্প্রতিক পরিস্থিতির সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো—
| সূচক | বর্তমান অবস্থা |
|---|---|
| বিনিয়োগ প্রবণতা | ২০১৭ সালের পর সর্বনিম্ন |
| বিনিয়োগকারীর সংখ্যা | উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে |
| এআই ব্যবহার | বাস্তব প্রয়োগে জোর |
| বড় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা | নিজস্ব এআই উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন |
| শক্তিশালী স্টার্টআপ | এখনও বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে |
| নতুন প্রতিযোগিতা | LLM-ভিত্তিক বিতরণ ব্যবস্থা ও জেনারেটিভ ইঞ্জিন অপ্টিমাইজেশন |
প্রতিবেদনটি আরও উল্লেখ করেছে, বৃহৎ ভাষা মডেল (LLM) এখন বীমা বিতরণে নতুন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করছে। এওন, প্রুডেনশিয়াল ও সিংলাইফের মতো প্রতিষ্ঠান এই ক্ষেত্রে নতুন অংশীদারিত্ব তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যারা LLM-ভিত্তিক বিতরণ কৌশল গ্রহণ করতে ব্যর্থ হবে, তারা ব্যক্তিগত ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক বীমা খাতে বাজার অংশীদারিত্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।
এছাড়া জেনারেটিভ ইঞ্জিন অপ্টিমাইজেশন প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগ ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ১৪০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি নির্দেশ করে যে, এআই-চালিত সুপারিশ ব্যবস্থায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে।
সবশেষে বলা যায়, ইনসুরটেক খাত এখন রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যেখানে শুধুমাত্র উদ্ভাবন নয়, বরং কার্যকর প্রয়োগ, মুনাফা ও বাস্তব ব্যবসায়িক ফলাফলই হবে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। যারা এই পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাওয়াতে পারবে, তারাই এই খাতে নেতৃত্ব দেবে।
