ভিয়েতনামের আর্থিক খাত ২০২৬ সালের শুরুতে এক জটিল কিন্তু সম্ভাবনাময় বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। একদিকে সামষ্টিক অর্থনীতির ইতিবাচক অগ্রগতি মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে এনেছে, অন্যদিকে তীব্র প্রতিযোগিতা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গ্রাহক ধরে রাখা ও নতুন গ্রাহক অর্জনকে ক্রমশ কঠিন করে তুলছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিলসেনআইকিউ (NielsenIQ)-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, ভোক্তাদের আর্থিক আচরণে দৃশ্যমান পরিবর্তন এলেও বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি চ্যালেঞ্জিং।
২০২৫ সালের অস্থিরতার পর ২০২৬ সালে ভিয়েতনাম প্রায় ৮.০ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যেখানে মুদ্রাস্ফীতি সীমাবদ্ধ রয়েছে প্রায় ৩.৪ শতাংশে। এই স্থিতিশীলতা দেশটিকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের অর্থনীতির কাতারে উন্নীত করেছে, যা স্বাভাবিকভাবেই নাগরিকদের আর্থিক আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। ফলস্বরূপ, মানুষ এখন ব্যয় ও বিনিয়োগে আগের তুলনায় বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে।
তবে ঐতিহ্যগতভাবে সঞ্চয়মুখী সংস্কৃতি এখনও শক্ত অবস্থানে রয়েছে। প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ নিয়মিত সঞ্চয় করেন। এর পাশাপাশি ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রেও মনোভাব বদলাচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে বিনিয়োগ বা ভোগ্যপণ্য ক্রয়ের জন্য ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। উত্তরাঞ্চলেও এই পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট, যেখানে আগে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা বেশি ছিল। এই পরিবর্তন সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিশীলতার প্রতিফলন এবং ক্রমবর্ধমান ভোক্তা আত্মবিশ্বাসের ইঙ্গিত বহন করে।
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের দ্রুত বিস্তার এই পরিবর্তনের একটি প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। গত দুই বছরে অনলাইন সঞ্চয়ের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে। ব্যাংকগুলো মোবাইল অ্যাপ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সহজ ও দ্রুত সেবা নিশ্চিত করায় গ্রাহকেরা প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং ব্যবস্থার দিকে দ্রুত ঝুঁকছেন। ফলে ব্যাংকিং সেবার ধরনেও একটি মৌলিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
তবে বাজারের প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র। দেশে প্রায় ৫০টি ব্যাংক সক্রিয় থাকলেও একজন গ্রাহক গড়ে মাত্র তিনটি ব্যাংকের সেবা ব্যবহার করেন। এই সীমিত পছন্দের কারণে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য গ্রাহকের শীর্ষ তালিকায় স্থান করে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে বাজারটি একটি উচ্চ প্রতিযোগিতামূলক ও সংকুচিত ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে উঠছে, যেখানে টিকে থাকতে হলে ভিন্নতা প্রদর্শন অপরিহার্য।
গ্রাহকদের ব্যাংক নির্বাচনের ধরণেও বড় পরিবর্তন এসেছে। একসময় পরিচিত নাম বা প্রচলিত সুনামের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও বর্তমানে প্রায় ৭১ শতাংশ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নির্ভর করে ব্র্যান্ড ইমেজ, সেবার মান এবং প্রতিষ্ঠানটির স্বাতন্ত্র্যের ওপর। অর্থাৎ, শুধুমাত্র বড় অবকাঠামো বা পুঁজির জোরে আর গ্রাহক আকৃষ্ট করা সম্ভব নয়; বরং গ্রাহকের অভিজ্ঞতা ও সন্তুষ্টিই এখন মূল নির্ধারক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আস্থা অর্জন এখন একটি বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া। গ্রাহকেরা ব্যক্তিকেন্দ্রিক সেবা প্রত্যাশা করেন—তারা চান তাদের প্রয়োজন, আচরণ ও পছন্দ অনুযায়ী কাস্টমাইজড সমাধান। এই ব্যক্তিকরণ বা ‘পার্সোনালাইজেশন’ই এখন গ্রাহক ধরে রাখার অন্যতম প্রধান কৌশল হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে বীমা ও বিনিয়োগ খাতের তথ্যও দেখায়, উন্নত গ্রাহকসেবা সরাসরি মুনাফা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত।
এ প্রেক্ষাপটে বিপণন কৌশল, পণ্য উন্নয়ন, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং গ্রাহকসেবার প্রতিটি স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। আস্থা তৈরি এখন আর একক বিভাগের কাজ নয়; বরং এটি একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া, যা প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক উপস্থিতি ও ভাবমূর্তির সঙ্গে যুক্ত।
নিচে ভিয়েতনামের আর্থিক খাতের প্রধান সূচক ও প্রবণতাগুলো তুলে ধরা হলো—
| সূচক | বর্তমান অবস্থা | পরিবর্তনের ধারা |
|---|---|---|
| সঞ্চয় প্রবণতা | ~৮০% মানুষ সঞ্চয় করে | স্থিতিশীল |
| ঋণ গ্রহণের মানসিকতা | বৃদ্ধি পাচ্ছে | উত্তরাঞ্চলেও বিস্তার |
| অনলাইন সঞ্চয় | গত ২ বছরে দ্বিগুণ | দ্রুত সম্প্রসারণ |
| ব্যাংক সংখ্যা | ~৫০টি | তীব্র প্রতিযোগিতা |
| গ্রাহকের ব্যাংক ব্যবহার | গড়ে ৩টি | সীমিত নির্বাচন |
| সিদ্ধান্তের ভিত্তি | ৭১% ব্র্যান্ড ইমেজ | ক্রমবর্ধমান প্রভাব |
সার্বিকভাবে, ভিয়েতনামের আর্থিক খাত এখন এক রূপান্তরমুখী পর্যায়ে অবস্থান করছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুললেও প্রতিযোগিতার তীব্রতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও উদ্ভাবনী, প্রযুক্তিনির্ভর এবং গ্রাহককেন্দ্রিক হতে বাধ্য করছে। ভবিষ্যতে টিকে থাকতে হলে শুধু আর্থিক শক্তি নয়, বরং গ্রাহকের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি আস্থাভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলাই হবে সাফল্যের প্রধান চাবিকাঠি।
